শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
ভোর হতেই হাতে ঝাঁটা, বালতি আর বাসনের শব্দে দিন শুরু হত তাঁর। কখনও অন্যের বাড়িতে রান্না, কখনও কাপড় কাচা, কখনও আবার মেঝে মোছা, এই ছিল জীবনের নিয়মিত লড়াই। সেই মানুষটিই আজ পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় জনপ্রতিনিধি। আউশগ্রামের নতুন বিধায়ক কালিতা মাঝির জীবনকাহিনি এখন রাজ্যের অন্যতম আলোচিত অনুপ্রেরণার গল্প।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই কালিতা মাঝিকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের আড্ডায়। কারণ, তাঁর উত্থানের গল্পটা কোনও প্রচলিত রাজনৈতিক পরিবারের নয়; বরং সমাজের একেবারে প্রান্তিক স্তর থেকে উঠে আসা এক সংগ্রামী নারীর গল্প।
পূর্ব বর্ধমান জেলার আউশগ্রামের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম কালিতার। ছোটবেলা থেকেই সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। পড়াশোনা বেশিদূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাননি। অল্প বয়স থেকেই সংসারের হাল ধরতে অন্যের বাড়িতে কাজ শুরু করতে হয়। সকালে এক বাড়ি, দুপুরে আরেক বাড়ি, দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করেই চলত সংসার।
স্থানীয়দের কথায়, কালিতা মাঝি শুধু গৃহকর্মী ছিলেন না; মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর স্বভাব। গ্রামের কারও অসুস্থতা, কারও রেশন সমস্যা বা কোনও মহিলার উপর অত্যাচারের ঘটনা, সব ক্ষেত্রেই তাঁকে এগিয়ে আসতে দেখা যেত। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়া।
রাজনীতিতে তাঁর পথ মোটেও সহজ ছিল না। আর্থিক সীমাবদ্ধতা তো ছিলই, তার সঙ্গে ছিল সামাজিক কটাক্ষও। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, “গৃহকর্মী আবার রাজনীতি করবে?” কিন্তু সেই সব ব্যঙ্গ-বিদ্রুপকে উপেক্ষা করেই নিজের কাজ চালিয়ে গিয়েছেন কালিতা। দিনের বেলা বাড়ির কাজ, আর বাকি সময় মানুষের সমস্যা নিয়ে আন্দোলন, এইভাবেই ধীরে ধীরে মানুষের আস্থা অর্জন করেন তিনি।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আউশগ্রাম কেন্দ্র থেকে প্রার্থী করা হয় কালিতা মাঝিকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ প্রথমে বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিলেও প্রচারে নেমে সম্পূর্ণ অন্য ছবি দেখা যায়। সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্কই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় শক্তি। বাড়ি বাড়ি ঘুরে প্রচারের সময় তিনি কোনও বড় প্রতিশ্রুতি দেননি; বরং বলেছেন নিজের জীবনের কথা, সংগ্রামের কথা এবং এলাকার মানুষের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি।
ভোটের ফল প্রকাশের দিন দেখা যায়, সব জল্পনাকে পিছনে ফেলে জয়ী হয়েছেন কালিতা মাঝি। ফল ঘোষণার পর তাঁর বাড়ির সামনে ভিড় জমায় এলাকার মানুষ। অনেকেই বলেন, এই জয় শুধু একজন প্রার্থীর নয়; সমাজের পিছিয়ে পড়া অসংখ্য নারীর জয়।
কিন্তু জয়ের পরও বদলায়নি কালিতার জীবনযাপন। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিধায়ক হওয়ার পরদিনও তিনি বাড়ির রান্না করছেন, কাপড় কাচছেন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। এই সরলতাই আরও বেশি করে মানুষের মন জয় করেছে।
কালিতা মাঝি
কালিতা মাঝির এই উত্থান শুধু রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি সামাজিক বাস্তবতারও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি। বাংলার গ্রামাঞ্চলে এখনও বহু নারী দারিদ্র্য, অবহেলা এবং সামাজিক বাধার বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। তাঁদের কাছে কালিতা এখন এক নতুন প্রতীক, যে প্রতীক বলে, সংগ্রাম থাকলেও স্বপ্ন থেমে থাকে না।
রাজনৈতিক মহলের অনেকেই মনে করছেন, কালিতা মাঝির জয় আগামী দিনে বাংলার রাজনীতিতে নতুন বার্তা দেবে। কারণ তাঁর সাফল্য প্রমাণ করেছে, বড় পরিচয় বা অর্থবল নয়, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ও দীর্ঘদিনের সামাজিক কাজও একজন মানুষকে নেতৃত্বের জায়গায় পৌঁছে দিতে পারে।
আউশগ্রামের সাধারণ মানুষ এখন তাঁদের “কালিতা দি”-কে বিধায়ক হিসেবে দেখছেন। কিন্তু তাঁদের কাছে তিনি এখনও সেই পরিচিত মানুষ, যিনি দরজায় কড়া নেড়ে খোঁজ নিতেন, “কী সমস্যা হয়েছে?” আর সম্ভবত সেখানেই লুকিয়ে রয়েছে তাঁর সাফল্যের আসল রহস্য।