মোবাইলের পর্দা থেকে মাঠে ফিরুক শৈশব, বইয়ের পাতায় ফিরুক মন—আগামী প্রজন্মের জন্য কঠিন পথে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 1 d ago
মোবাইলের পর্দা থেকে মাঠে ফিরুক শৈশব, বইয়ের পাতায় ফিরুক মন—আগামী প্রজন্মের জন্য কঠিন পথে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী
মোবাইলের পর্দা থেকে মাঠে ফিরুক শৈশব, বইয়ের পাতায় ফিরুক মন—আগামী প্রজন্মের জন্য কঠিন পথে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী 

একটা সময় ছিল, স্কুল ছুটির পর পাড়ার মাঠে ছুটত শিশুরা। বিকেল নামলেই গলির মোড়ে জমত আড্ডা, মাঠে চলত ফুটবল-কাবাডি, বাড়ির পড়ার টেবিলে বই খুলে বসত পড়ুয়ারা। এখন সেই ছবিটা অনেকটাই বদলে গিয়েছে। মাঠের জায়গা নিয়েছে মোবাইলের স্ক্রিন, গল্প করার জায়গায় এসেছে চ্যাট, আর অবসরের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে রিল, গেম ও সামাজিক মাধ্যম।
 
প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। পড়াশোনা থেকে তথ্য অনুসন্ধান—সব ক্ষেত্রেই স্মার্টফোন এখন গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। কিন্তু প্রয়োজনের প্রযুক্তি যখন অভ্যাসের সীমা পেরিয়ে নির্ভরতায় পরিণত হয়, তখনই তৈরি হয় উদ্বেগ। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের প্রভাব নিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে।
 
এই প্রেক্ষাপটেই পড়ুয়াদের মোবাইল ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণের বার্তা দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে এমন একটি ভাবনা, যার কেন্দ্রে রয়েছে আজকের পড়ুয়া এবং আগামী দিনের সমাজ।৫ সেপ্টেম্বর নিউ টাউনে শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী গুজরাটের উদাহরণ তুলে ধরে জানান, সেখানে প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলে পড়ুয়াদের মোবাইল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও এমন কঠোর সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। পাশাপাশি পড়ুয়াদের রাত জেগে মোবাইল ব্যবহারের অভ্যাস নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি।
 
তবে বিষয়টিকে শুধুমাত্র ‘মোবাইল নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত’ হিসেবে দেখলে এর সামাজিক গুরুত্ব অনেকটাই ছোট করে দেখা হবে। আসল প্রশ্ন হল—আমাদের সন্তানদের শৈশব আমরা কোথায় দেখতে চাই? একটি ছোট স্ক্রিনের মধ্যে, নাকি বই, মাঠ, বন্ধু, শিক্ষক ও বাস্তব পৃথিবীর মধ্যে?এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হয়তো এই উদ্যোগের গুরুত্ব।
 
বর্তমানে প্রযুক্তি ছাড়া শিক্ষা ভাবাও কঠিন। অনলাইন ক্লাস, ডিজিটাল বই, তথ্য অনুসন্ধান কিংবা বিভিন্ন শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম পড়ুয়াদের জ্ঞানের পরিধি বাড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছে। ফলে মোবাইল নিজে কোনও সমস্যা নয়। সমস্যা তখনই, যখন পড়াশোনার প্রয়োজনীয় কয়েক মিনিটের ব্যবহার ঘণ্টার পর ঘণ্টার বিনোদনে পরিণত হয়।
একজন পড়ুয়া যখন রাত পর্যন্ত মোবাইলে ব্যস্ত থাকে, তখন তার ঘুমের সময় কমে যায়। পরদিন ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। ধীরে ধীরে বই পড়ার অভ্যাস, খেলাধুলা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগও কমতে পারে। ফলে প্রশ্নটা কেবল শিক্ষার নয়—এটি একটি প্রজন্মের জীবনযাপনের প্রশ্ন।
 
এই জায়গায় স্কুলে মোবাইল ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণের ভাবনাটি ইতিবাচক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্কুল কেবল পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার জায়গা নয়। স্কুল হচ্ছে শিশুর সামাজিক হয়ে ওঠার জায়গা। শিক্ষককে সামনে বসে প্রশ্ন করা, বন্ধুর সঙ্গে মতের অমিল মেটানো, মাঠে দল বেঁধে খেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া—এসবও শিক্ষারই অংশ।
 
রাজ্যে স্কুলে মোবাইল নিয়ন্ত্রণের আলোচনা অবশ্য নতুন নয়। চলতি বছরের জুলাইয়ে পশ্চিমবঙ্গ উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ স্কুল চলাকালীন পড়ুয়াদের মোবাইল আনা ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি করেছে। ক্লাস, পরীক্ষা, অ্যাসেম্বলি এবং শিক্ষামূলক কার্যক্রমের সময় মোবাইল ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে।
 
ফলে মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যকে সেই নিয়ন্ত্রণের পরিধি আরও বাড়ানোর একটি ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা যেতে পারে। তবে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা ইতিমধ্যেই কার্যকর হয়েছে—এমন কোনও চূড়ান্ত সরকারি নির্দেশ এখনও প্রকাশ্যে এসেছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।এই উদ্যোগের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—মোবাইলের বিকল্প কী হবে? শুধু ফোন কেড়ে নিয়ে যদি শিশুকে আবার চার দেওয়ালের মধ্যে বসিয়ে রাখা হয়, তাহলে উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। তার বদলে ফিরিয়ে দিতে হবে মাঠ। ফিরিয়ে দিতে হবে বই। বাড়াতে হবে বিজ্ঞানচর্চা, ছবি আঁকা, গান, নাটক, বিতর্ক, শরীরচর্চা এবং সৃজনশীলতার সুযোগ।
 
শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে খেলাধুলার গুরুত্বের কথাও তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী। খো-খো, হা-ডু-ডু-সহ বিভিন্ন খেলাকে স্কুলের পরিসরে আরও উৎসাহ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা সামনে এসেছে।এখানেই এই ভাবনার সবচেয়ে সুন্দর দিকটি রয়েছে। একটি শিশুকে মোবাইল থেকে দূরে রাখা মানে তাকে প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করা নয়; বরং তাকে বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করা।
 
মাঠে খেলতে গিয়ে একটি শিশু শেখে সহযোগিতা। দলগত খেলায় শেখে নেতৃত্ব। হেরে গিয়ে শেখে ব্যর্থতাকে মেনে নিয়ে আবার চেষ্টা করতে। বই পড়ে বাড়ে কল্পনাশক্তি। শিক্ষকের সঙ্গে আলোচনায় বাড়ে যুক্তিবোধ। আর বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটালে তৈরি হয় সম্পর্কের উষ্ণতা। এই শিক্ষাগুলির কোনওটিই একটি স্ক্রিন একা দিতে পারে না।
 
তাই এই সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে ভাবলে বিষয়টি আরও বড় হয়ে ওঠে। আজকের পড়ুয়ারাই আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, প্রশাসক, শিল্পী, উদ্যোক্তা এবং সমাজের নেতৃত্ব দেবে। তাদের মনোযোগ, চিন্তাশক্তি, শারীরিক সক্ষমতা ও সামাজিক দক্ষতা যত শক্তিশালী হবে, আগামী সমাজও তত বেশি সুস্থ ও মানবিক হওয়ার সম্ভাবনা রাখবে।
 
অবশ্যই এর দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। স্কুলে নিয়ম তৈরি হলেও বাড়িতে অভিভাবকদের সচেতনতা equally জরুরি। বাবা-মা নিজেরাই যদি সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে সন্তানের কাছে শুধুমাত্র ‘মোবাইল ব্যবহার করো না’ বলা খুব একটা কার্যকর হবে না। প্রয়োজন পরিবারের ভিতরেই একটি সুস্থ ডিজিটাল অভ্যাস তৈরি করা।একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি ভবিষ্যতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রযুক্তিকে পুরোপুরি দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে ব্যবহার করার শিক্ষা দেওয়া। কখন ফোন প্রয়োজন, কখন সেটি সরিয়ে রাখতে হবে—এই বোধটিই আগামী প্রজন্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হতে পারে।
 
শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য তাই একটি বৃহত্তর সামাজিক আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে। আজকের শিশুর হাতে স্মার্টফোন থাকবে, কিন্তু সেই ফোন যেন তার শৈশব কেড়ে না নেয়। ইন্টারনেট থাকবে, কিন্তু বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক যেন হারিয়ে না যায়। ডিজিটাল শিক্ষা থাকবে, কিন্তু বইয়ের গন্ধ যেন অচেনা না হয়ে যায়।হয়তো আজকের দিনে মোবাইল ব্যবহারে কিছু কঠিন নিয়ম অনেকের কাছে অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। কিন্তু আগামী দিনের দিকে তাকালে এই কঠোরতাই যদি শিশুদের আরও মনোযোগী, সুস্থ, সৃজনশীল ও সামাজিক করে তোলে, তাহলে তার সুফল শুধু একটি প্রজন্ম নয়—পুরো সমাজ পাবে।
 
কারণ, আগামী প্রজন্মকে শুধু প্রযুক্তিবান্ধব করলেই হবে না; তাদের মানবিক, চিন্তাশীল, সুস্থ ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে।আর সেই পথের শুরুটা হয়তো খুব ছোট একটি সিদ্ধান্ত থেকেই—কিছুটা কম স্ক্রিন, কিছুটা বেশি বই; কিছুটা কম রিল, কিছুটা বেশি মাঠ; কিছুটা কম ভার্চুয়াল জীবন, আর অনেকটা বেশি বাস্তব শৈশব।