শতানন্দ ভট্টাচার্য / হাইলাকান্দি
“মনে যদি প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর লক্ষ্য অর্জনের দুর্দান্ত আকাঙ্ক্ষা থাকে, তবে কোনো শারীরিক প্রতিবন্ধকতাই সফলতার পথে বাধা হতে পারে না।” — এই কথাটিই বাস্তবে প্রমাণ করেছে দক্ষিণ অসমের বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দির ছাত্র মহিনুল ইসলাম মজুমদার।সদ্য ঘোষিত মাধ্যমিক পরীক্ষায় শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে জয় করে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করা মহিনুল এখন সকলের নজর কেড়েছে।হাইলাকান্দি শহরের নিকটবর্তী নারায়ণপুর চতুর্থ খণ্ড গ্রামের বাসিন্দা মহিনুল, হাইলাকান্দির স্প্যারোস সিনিয়র সেকেন্ডারি স্কুল থেকে এবার মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিল।
হাঁটা তো দূরের কথা, দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতাও নেই এই ছাত্রটির। একটি ট্রাইসাইকেলই তার যাতায়াতের একমাত্র ভরসা। দুই পা সম্পূর্ণ শক্তিহীন, পাশাপাশি হাতের শক্তিও ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।তবুও এই কঠিন বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও দৃঢ় মনোবলে মহিনুল নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে।উল্লেখযোগ্য যে, মহিনুল স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রফি নামের এক বিরল রোগে আক্রান্ত। এটি একটি জিনগত স্নায়বিক অবক্ষয়জনিত রোগ, যা মেরুদণ্ডের মোটর নিউরন ধ্বংস করে পেশিতে গুরুতর দুর্বলতা সৃষ্টি করে।
শারীরিক কষ্টের মাঝেও মাধ্যমিক পরীক্ষায় মহিনুল ৩৫৪ নম্বর পেয়ে সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছে। মাত্র ৬ নম্বরের জন্য প্রথম বিভাগ থেকে বঞ্চিত হলেও, কম্পিউটার বিষয়ে ৮৮ নম্বর পেয়ে লেটার মার্ক অর্জন করেছে।ভবিষ্যতে আরও ভালো ফল করার লক্ষ্য নিয়ে মহিনুল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ইতিমধ্যেই সে হাইলাকান্দির একটি বেসরকারি সিনিয়র সেকেন্ডারি স্কুলে কলা বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছে।অসম সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তা হয়ে সমাজ ও দেশের সেবা করার মহৎ স্বপ্ন বুকে লালন করছে মহিনুল।
মহিনুল ইসলাম মজুমদারকে সংবর্ধনা জানানোর এক দৃশ্য
জীবনের এই সাফল্যের মুহূর্তে মহিনুল তার পিতা-মাতা, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং তাকে সহযোগিতা করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।পুত্রের এই সাফল্যে শিক্ষক পিতা আব্দুল মুনিম মজুমদার এবং গৃহিণী মাতা শাহনাজ বেগম মজুমদারও অত্যন্ত আনন্দিত।আবেগঘন কণ্ঠে পিতা বলেন, বিশেষভাবে সক্ষম হওয়ার পরও জীবনে কিছু করে দেখানোর প্রবল ইচ্ছাশক্তিই আজ মহিনুলকে পড়াশোনায় এগিয়ে নিয়ে গেছে।অন্যদিকে, মহিনুলের এই অনুপ্রেরণাদায়ক সাফল্যে নিখিল ভারত দিব্যাংগ সংঘের হাইলাকান্দি শাখা ‘সক্ষম’-এর পক্ষ থেকে তাকে বিশেষভাবে সংবর্ধনা জানানো হয়।
সংস্থার দুই কর্মকর্তা শংকর চৌধুরী ও গোবিন্দ চন্দ্র নাথ মহিনুলের বাড়িতে উপস্থিত হয়ে ছাত্রটির পাশাপাশি তাঁর পিতাকেও অভিনন্দন জানান।এই প্রসঙ্গে শংকর চৌধুরী বলেন, “প্রথম নজরে নম্বরের দিক থেকে ফলাফলটি হয়তো খুব বেশি চোখে পড়ার মতো নয়, কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে যেভাবে সে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে, তা সত্যিই অতুলনীয় ও প্রশংসনীয়।”তিনি আশা প্রকাশ করেন, মহিনুলের এই জীবনসংগ্রাম ও প্রচেষ্টা আগামী দিনে অন্য ছাত্রছাত্রীদের কাছেও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।