রানী খানমঃ কথক নৃত্যকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করা ভারতের প্রথম মুসলিম নারী

Story by  atv | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 8 Months ago
কথক নৃত্যের বিশিষ্ট শিল্পী রানি খানম
কথক নৃত্যের বিশিষ্ট শিল্পী রানি খানম
মহেশ্বরী , নিউ দিল্লি:

ভারতের স্বাধীনতার পর শাস্ত্রীয় নৃত্যের প্রতি ভালোবাসাকে পেশায় রূপান্তরিত করা প্রথম মুসলিম কথক নৃত্যশিল্পীর নাম হল রানী খানম। মূলত বিহারের গোপালগঞ্জ জেলার বাসিন্দা রানী খানম ছোট থেকেই কথক নৃত্যের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। তিনি গোপনে অনুশীলন করতেন, কারণ তাঁর পরিবারে নাচ-গান সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ছিল।

তিনি শুধু নিজের নৃত্যের মাধ্যমে নারী ক্ষমতায়নের প্রচেষ্টা করেননি, বরং সমাজের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও বারবার তুলে এনেছেন। 'আওয়াজ দ্য ভয়েস'–এর এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে রানী খানম তাঁর এই সম্পূর্ণ যাত্রার বিবরণ দিয়েছেন।
 
নৃত্য পরিবেশন করেছেন রানি খানম
 
রানী খানম বড় হয়েছেন এক ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারে, যেখানে নাচ বা গানকে ভালো চোখে দেখা হতো না। সেই কারণেই তিনি ঘরে গোপনে বহু বছর ধরে সাধনা চালিয়ে গিয়েছিলেন। এমনকি ঘুঙুর, হারমোনিয়াম আর তবলা এইসব জিনিসও তাঁকে বাড়িতে লুকিয়ে রাখতে হতো যেন কেউ দেখে না ফেলে।
 
মুজাফ্ফরপুরে প্রাথমিক শিক্ষা নেওয়ার পর রানী তৃতীয় শ্রেণি থেকে দিল্লিতে পড়াশোনা করেন। নৃত্য ও সঙ্গীতের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত। তাঁর তিনজন মূল গুরু ছিলেন,বতন খান সাহেব, রেবা বিদ্যার্থীজি এবং পণ্ডিত বিরজু মহারাজ।
 
১৯৭৮ সালে বিহারে বতন খান সাহেবের কাছ থেকে নৃত্যের প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করেন রানী, এরপর দিল্লিতে রেবা বিদ্যার্থী ও পরে পণ্ডিত বিরজু মহারাজের কাছ থেকে কথকের আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ লাভ করেন। গুরু-শিষ্য পরম্পরার প্রতি রানীর শ্রদ্ধা ও সম্মান আজও অটুট।
 
নতুন দিল্লিতে ভারত মণ্ডপমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নিজের দলের সঙ্গে রানি খানম
 
বিয়ের প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে রানী বলেন, শিল্পী হওয়ার তাগিদে বিয়ের জন্য তাঁর সময় হয়নি। কুসংস্কারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তিনি নিজের পথ নিজেই বেছে নিয়েছিলেন।

পরিবার কখনও তাঁকে সরাসরি বাধা না দিলেও, রানী খানমকে সবসময়ই সামাজিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক দ্বন্দ্বের সম্মুখীন হতে হয়েছে। আজ তিনি ‘আমদ নৃত্য কেন্দ্র’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং ভারতের অন্যতম জ্যেষ্ঠ কথক নৃত্যশিল্পী। তিনি কেবল নিজেকে প্রতিষ্ঠিতই করেননি, বরং নারী ও সমাজসংক্রান্ত বিষয়েও একটি শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন।‘আমদ পারফর্মিং আর্টস সেন্টার’ একটি নিবন্ধিত বেসরকারি সংস্থা, যা ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।

ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় পরিবেশনা কলা সংস্থা হিসেবে বিবেচিত এই কেন্দ্রের মূল লক্ষ্য হলো,বিভিন্ন ক্ষমতা, পটভূমি ও সংস্কৃতির মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে শিল্পের মাধ্যমে একতা ও বৈচিত্র্যের প্রসার ঘটানো। এই প্রতিষ্ঠান ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, সঙ্গীত নাটক একাডেমি এবং আইসিসিআর (বিদেশ মন্ত্রক)-এর অন্তর্ভুক্ত তালিকাভুক্ত সংস্থা এবং কথক কেন্দ্র দ্য ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কথক ডান্স-এর সহযোগিতায় কাজ করে আসছে।
 
আজ পর্যন্ত আমদ এনজিও-র অনুপ্রেরণামূলক উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবেশনা, প্রশিক্ষণ, উৎসব, আলোচনা ও কর্মশালার মাধ্যমে ২০ লক্ষেরও বেশি মানুষের জীবনকে স্পর্শ করেছে। এই সংস্থাটি পরিবেশন শিল্প ক্ষেত্রের তরুণ-তরুণী, প্রতিভাবান শিল্পী, অসহায় মানুষ, কন্যা শিশু ও নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
 
প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পীর সঙ্গে রানি খানম
 
আমদ এমন একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিচালনা করে যা দক্ষ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণ-তরুণীদের জন্য নৃত্য ও সংগীতের পেশাদার প্রশিক্ষণ প্রদান করে। আর্থিকভাবে দুর্বল পটভূমি থেকে আসা কিছু দরিদ্র তরুণ শিল্পীকেও আমদ সেন্টার পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে। আমদের নৃত্য পরিবেশনা ভারতীয় পরিবেশন কলার জগতে অন্যতম সৃজনশীল ও অনন্য উদ্যোগ। তাদের আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ‘সুফি’ নৃত্য পরিবেশনা, হুইলচেয়ারে শারীরিকভাবে সক্ষম শিল্পীদের দ্বারা পরিবেশিত ‘ডান্সিং হুইলস’ এবং নৃত্য পরিবেশনায় ‘পরম্পরাগত কথক ও সৃজনশীল’ শৈলীর মিশ্রণ দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ, শক্তিশালী ও অভিভূত করে তোলে।
 
নৃত্য পরিবেশনায় মুসলিম মহিলাদের অন্তর্ভুক্তি ও তাদের অধিকারের পৃষ্ঠপোষকতা আজও অব্যাহত রয়েছে। নৃত্যের এই অনন্য শৈলীর জন্য এসব অনুষ্ঠান সারা বিশ্বে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। আমদ সেন্টারের শিল্পীরা ব্রিটেন, স্পেন, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া এবং আলজেরিয়ার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নৃত্য উৎসবে অংশগ্রহণ করেছে।
 
ভারতীয় নৃত্যের হারিয়ে যাওয়া দিক ও সৌন্দর্যকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং প্রতিভাবান তরুণ শিল্পীদের একটি মঞ্চ দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে বিগত এক দশক ধরে আমদ সাফল্যের সঙ্গে উৎসব আয়োজন করে আসছে। আমদ সেন্টারটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ভারতের অন্যতম শীর্ষ কথক নৃত্যপ্রচারক গুরু রানী খানম।
 
রানি খানমের বিদেশে নৃত্য পরিবেশনের এক স্মরণীয় মুহূর্ত
 
ইসলামিক কবিতা ও সুফি কবিদের রচনার ওপর নৃত্য পরিবেশনকারী একমাত্র ভারতীয় মুসলিম শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী হলেন রানী খানম। তিনি মহিলাদের অধিকার, এইচআইভি/এইডস, লিঙ্গ সমতা, অক্ষমতা ইত্যাদি বিষয়েও নৃত্য পরিবেশন করেছেন। রানী খানম এবং তার দল নিয়মিতভাবে সম্মানজনক আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নৃত্য উৎসবে অংশগ্রহণ করে আসছে।
 
মালয়েশিয়ার রাজা-রানী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে কুয়ালালামপুরে তার মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা এবং লন্ডনের ‘সালাম’ আন্তর্জাতিক ইসলামিক আর্ট ফেস্টিভ্যালে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সুফি সংগীতজ্ঞ, গায়ক এবং নৃত্যশিল্পীদের সঙ্গে তার পরিবেশনা সকলকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছে। একইভাবে, লন্ডনে তার দল বিশ্বের বিখ্যাত সুফি সংগীতজ্ঞ ও শিল্পীদের সঙ্গে ‘সালাম’ আন্তর্জাতিক ইসলামিক আর্ট ফেস্টিভ্যালে অংশগ্রহণ করেছে।
 
তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উৎসবের মধ্যে আছে,নমস্তে ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়ার এশিয়া ট্র্যাডিশনাল সং অ্যান্ড ডান্স ফেস্টিভাল, নেদারল্যান্ডসের ট্রপিক্যাল ডান্স ফেস্টিভাল, নিউ ইয়র্কের ইরেজিং বর্ডারস ইত্যাদি। এই দলটি কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা প্রভৃতি দেশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছে। রানী তুরস্ক, কায়রো, বসনিয়া এবং মরক্কোর সুফি সংগীতজ্ঞদের সাথেও সহযোগিতা করেছেন।

সুফিবাদের বিষয়ে রানী খানমের আধ্যাত্মিক উপলব্ধি গভীরভাবে ব্যক্তিগত। তার মতে, সুফিবাদ হলো ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র আধ্যাত্মিক রূপ এবং এটি সনাতন ধর্মের মতোই একটি জীবনধারণের পদ্ধতি। কথক হচ্ছে ভারতের ২০০০ বছরের সংস্কৃতিকে জীবন্ত করে তোলা একটি ধ্রুপদী নৃত্যরূপ।
 
রানী “সুফি কথক” শব্দটি মানেন না, তিনি বলেন যে সুফিবাদ কোনো নৃত্য নয়, বরং এটি আত্মার এক অভিব্যক্তি। তিনি কথকে ইসলামিক ধারণা যুক্ত করে এক নতুন শব্দভাণ্ডার সৃষ্টি করেছেন। রানীর পরিবার চিশতিয়া সুফি পরম্পরার অনুসারী। সুফি মেহফিল, কাওয়ালি এবং সামা-ই-মেহফিলের মতো ধারাকে তিনি নিবিড়ভাবে পালন করে আসছেন, যেখানে সংগীত ও নৃত্যের মাধ্যমে ঈশ্বরের সঙ্গে একতা অনুভব করা হয়। রানী খানম সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকেও প্রশংসা পেয়েছেন।
 
আমদ নৃত্য কেন্দ্রের রানি খানমের শিষ্যদের কথক নৃত্য পরিবেশন
 
রাষ্ট্রপতি, উপ-রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, দিল্লি ও অরুণাচলের মুখ্যমন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গ ও অরুণাচল প্রদেশের রাজ্যপাল সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি তার নৃত্য পরিচালনার প্রশংসা করেছেন এবং তাকে উৎসাহিত করেছেন।
তিনি ঐতিহ্যবাহী, সমসাময়িক ও বিষয়ভিত্তিক নানা প্রসঙ্গ নিয়ে ২০০-রও বেশি নৃত্য পরিবেশনা পরিচালনা করেছেন। ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক শিল্প সমালোচকেরা তাকে ধারাবাহিকভাবে নিজের প্রজন্মের অন্যতম সৃজনশীল এবং অভিব্যক্তিপূর্ণ কথক শিল্পী হিসেবে বিবেচনা করেন। ভারতীয় সাংস্কৃতিক সম্পর্ক পরিষদে তিনি “আউটস্ট্যান্ডিং” শ্রেণীতে তালিকাভুক্ত, এবং দিল্লি দূরদর্শন তাকে “শীর্ষস্থানীয়” শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে।
 
রানী খানম তাঁর ব্যতিক্রমী কর্মের জন্য বহু সম্মানজনক পুরস্কার অর্জন করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে মহিলা কৃতিত্ব পুরস্কার (২০২২), জাতীয় একতা পুরস্কার (২০১৭), ল’অরিয়েল ফেমিনা উইমেন অ্যাওয়ার্ড (২০১৪), এবং জাতীয় মহিলা উৎকর্ষ পুরস্কার (২০১২)। ২০০৬ সালে তিনি নিউ ইয়র্কের এশিয়ান কালচারাল কাউন্সিল থেকে বিশ্ব নৃত্য ও ইসলাম ফেলোশিপ লাভ করেন এবং ১৯৯১ সালে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে সিনিয়র ফেলোশিপ ও ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন থেকে অসাধারণ কথক নৃত্যশিল্পী পুরস্কার পান।
 
রানীর জন্য কথক নৃত্য কেবল একটি পরিবেশন শিল্প নয়, বরং এক গভীর আধ্যাত্মিক যাত্রা। এটি আত্মা ও ঐশ্বরিকতার মধ্যে চিরন্তন নৃত্যের প্রকাশ, যা অন্তর্গত ভক্তিকে জীবন্ত করে তোলে। তাঁর নৃত্যের মাধ্যমে তিনি ধ্রুপদী ঐতিহ্য ও সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা, আধ্যাত্মিক গভীরতা ও সৃষ্টিশীল উদ্ভাবন, এবং ভারতের বহুধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মধ্যে এক সেতুবন্ধন নির্মাণ করেছেন।
 
রানী খানমের উত্তরাধিকার কেবল তাঁর নৃত্য-ভঙ্গিমায় নয়, বরং তাঁর শক্তিশালী বার্তাতেও নিহিত। তিনি বিশ্বাস করেন, শিল্প এমন এক শক্তি যা সব প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে পারে, প্রচলিত নিয়মকানুনকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে এবং সৌহার্দ্য, সচেতনতা ও ঐক্যের মাধ্যম হতে পারে।