সিনেমার সুপারস্টার থেকে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জার, তামিলনাড়ুতে থালাপথি বিজয়ের ঝড়ো উত্থান
নয়াদিল্লি
“থালাপথি” (তামিল ভাষায় যার অর্থ ‘কমান্ডার’) নামে জনপ্রিয় বিজয় তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে এক শক্তিশালী রাজনৈতিক উপস্থিতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। তাঁর দল 'তামিলাগা ভেত্ত্রি কাজাগম' (TVK) ১০০টিরও বেশি আসনে এগিয়ে রয়েছে বলে খবর। এই দ্রুত উত্থান রাজ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও নাটকীয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
৫১ বছর বয়সে এসে বিজয় এমন এক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। দীর্ঘদিনের সফল চলচ্চিত্রজীবনের শীর্ষ মুহূর্তেই তিনি অভিনয় ছেড়ে পূর্ণসময়ের জন্য রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন। তামিলনাড়ুতে অভিনেতাদের রাজনীতিতে আসার ইতিহাস থাকলেও, নিজের ক্যারিয়ারের চূড়ায় থেকে এত স্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে প্রবেশের ঘটনা খুবই বিরল।
জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর হিসেবে জন্ম নেওয়া এই অভিনেতার পারিবারিক পটভূমিও তাঁর চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করেছে বলে মনে করা হয়। তাঁর বাবা এস. এ. চন্দ্রশেখর একজন সমাজসচেতন চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং মা শোভা চন্দ্রশেখর গায়িকা ও লেখিকা। বাবার বামঘেঁষা মতাদর্শ তাঁর প্রাথমিক মানসিক গঠনে ভূমিকা রেখেছে বলে অনেকে মনে করেন।
বর্তমান নির্বাচনী প্রবণতা যদি ফলাফলে পরিণত হয়, তাহলে বিজয় তামিলনাড়ুর সেই ঐতিহ্যকেই এগিয়ে নিয়ে যাবেন যেখানে চলচ্চিত্র জগতের তারকারা জননেতায় পরিণত হন। এম. জি. রামচন্দ্রন এবং জে. জয়ললিতার মতো ব্যক্তিত্বদের সেই উত্তরাধিকারের সঙ্গে তাঁর নামও যুক্ত হতে পারে। তবে কমল হাসানের তুলনায়, যাঁর রাজনৈতিক সাফল্য এখনও সীমিত, বিজয়ের পদক্ষেপ অনেক বেশি পরিকল্পিত এবং কৌশলগত বলে মনে হচ্ছে।
২০২৪ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে 'তামিলাগা ভেত্ত্রি কাজাগম' প্রতিষ্ঠা করেন। দলটিকে তিনি মুখ্যমন্ত্রী এম. কে. স্টালিনের নেতৃত্বাধীন 'দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাজাগম' (DMK)-এর বিরুদ্ধে একটি আদর্শগত বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেছেন। অন্য অনেক নতুন দলের মতো জোটের ওপর নির্ভর না করে, তিনি স্বাধীনভাবে নির্বাচনে লড়ার পথ বেছে নিয়েছেন এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যের মধ্যে নতুন বিকল্প তৈরি করার চেষ্টা করেছেন।
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে সম্ভাব্য জোট নিয়ে নানা জল্পনা থাকলেও, বিজয় এখনো তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেননি এবং কৌশলগত নীরবতা বজায় রেখেছেন।
রাজনীতিতে তাঁর এই উত্থানের পেছনে রয়েছে তিন দশকেরও বেশি সময়ের এক সমৃদ্ধ চলচ্চিত্রজীবন। প্রধান অভিনেতা হিসেবে তিনি ৬৯টি ছবিতে অভিনয় করেছেন এবং দেশের অন্যতম উচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত তারকা। তাঁর চলচ্চিত্র শুধু তামিলনাড়ুতেই নয়, আন্তর্জাতিক স্তরেও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, বিশেষত OTT প্ল্যাটফর্মের বিস্তারের ফলে সেই জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে।
হিন্দি ভাষার দর্শকরাও তাঁর পরিচিতি পেয়েছেন ডাব করা ছবি যেমন 'মাস্টার' (Master), 'সরকার' (Sarkar), 'বিস্ট' (Beast) এবং 'হলিডে' (Holiday)-এর মাধ্যমে।
১৯৮৪ সালে 'ভেত্রি' (Vetri) ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে তাঁর অভিনয়জীবন শুরু হয়। এরপর মাত্র ১৮ বছর বয়সে 'নালাইয়া থীর্পু' (Naalaiya Theerpu) ছবিতে প্রথমবার প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন। ধারাবাহিকভাবে বহু সফল ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি তামিল চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ও জনপ্রিয় তারকা হয়ে ওঠেন।
লয়োলা কলেজে পড়াশোনা করার সময় তিনি ভিজ্যুয়াল কমিউনিকেশন নিয়ে পড়ছিলেন, কিন্তু অভিনয়ে পুরোপুরি মনোনিবেশ করার জন্য পড়াশোনা ছেড়ে দেন। এই সিদ্ধান্তই পরবর্তীতে তাঁর বিশাল সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করে।
বর্তমানে তিনি এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। তাঁর যাত্রাপথে সিনেমার প্রভাব ও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার এক সুস্পষ্ট সমন্বয় দেখা যায়। তিনি ক্ষমতায় আসুন বা না আসুন, তাঁর আবির্ভাব ইতিমধ্যেই তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে একটি নতুন দিক নির্দেশ করছে।