অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ: পূর্বভারতে মোদির রাজনৈতিক অভিযাত্রার নতুন অধ্যায়, বাংলায় কি গেরুয়া সরকারের সূচনা?
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই একটি বিশেষ রাজনৈতিক প্রতীকী বাক্য ঘুরে বেড়াচ্ছিল—“অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ”। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পূর্বভারতের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে বিজেপির রাজনৈতিক বিস্তারকে বোঝাতে এই স্লোগান সামনে এনেছিলেন। ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে ‘অঙ্গ’ (বিহার ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল), ‘বঙ্গ’ (পশ্চিমবঙ্গ) এবং ‘কলিঙ্গ’ (ওড়িশা) শুধু ভৌগোলিক পরিচয় নয়, বরং পূর্ব ভারতের রাজনৈতিক শক্তির মানচিত্রও বহন করে। বহুদিন ধরেই বিজেপির লক্ষ্য ছিল এই পূর্বাঞ্চলকে নিজেদের শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত করা। ওড়িশায় ক্রমবর্ধমান সাফল্য, বিহারে শক্তিশালী উপস্থিতি এবং বাংলায় দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন সেই রাজনৈতিক প্রকল্পকে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
আজ বাংলার ২৯৪ আসনের বিধানসভা নির্বাচনের গণনায় যে প্রবণতা সামনে এসেছে, তা নিছক একটি নির্বাচনী ফল নয়—এটি পূর্বভারতের ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যাওয়ার সম্ভাব্য বার্তা। প্রাথমিক ট্রেন্ডে বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জাদুকরী সংখ্যা ১৪৮-এর অনেকটাই ওপরে থেকে আরামদায়ক লিড ধরে রেখেছে। অন্যদিকে, টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে। যদি এই প্রবণতা শেষ পর্যন্ত বজায় থাকে, তবে বাংলায় প্রথমবার বিজেপি সরকার গঠনের সম্ভাবনা শুধু বাস্তবই হবে না, বরং “অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ” স্লোগান পূর্বভারতের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের প্রতীক হয়ে উঠবে।
এই নির্বাচন ছিল একাধিক কারণে ঐতিহাসিক। বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR)-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকার নজিরবিহীন পুনর্বিন্যাসের পর এটাই ছিল প্রথম বড় ভোটযুদ্ধ। ফলে ভোটের আগে থেকেই রাজনৈতিক উত্তাপ ছিল তুঙ্গে। দুই দফায় ২৩ ও ২৯ এপ্রিল ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়, যদিও ফলতা-সহ কয়েকটি কেন্দ্রে পুনর্নির্বাচন পরিস্থিতিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। বাংলার ভোট এবার কেবল শাসক বনাম বিরোধীর লড়াই ছিল না; এটি ছিল রাজনৈতিক আধিপত্য, সাংগঠনিক দক্ষতা, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, সামাজিক সমীকরণ এবং জনগণের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার এক সর্বাত্মক সংঘর্ষ।

২০১১ সালে বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলায় ‘পরিবর্তন’-এর মুখ হয়েছিলেন। কিন্তু ২০২৬-এ সেই পরিবর্তনের প্রতীক নিজেই পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জের মুখে। শুভেন্দু অধিকারী—যিনি একসময় তৃণমূলের গুরুত্বপূর্ণ মুখ ছিলেন—এবার বিজেপির প্রধান সেনাপতি হিসেবে উঠে এসে মমতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছেন। নন্দীগ্রামের পর ভবানীপুরেও শুভেন্দুর আগ্রাসী অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে বিজেপি এবার শুধু আসন বাড়াতে নয়, সরাসরি ক্ষমতা দখলের লক্ষ্য নিয়েই ময়দানে নেমেছে।
উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল, সীমান্তবর্তী জেলা, এমনকি দক্ষিণবঙ্গের বহু গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে বিজেপির এগিয়ে থাকা স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বাংলার ভোট-মানচিত্রে বড়সড় রদবদল ঘটছে। শহরাঞ্চলে সংগঠনের বিস্তার, গ্রামাঞ্চলে মেরুকরণ, কেন্দ্রীয় প্রকল্পের প্রচার এবং বিরোধী ভোটের একমুখী স্রোত বিজেপিকে শক্ত ভিত দিয়েছে। ২০২১ সালে ৭৭ আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা দলটি ২০২৬-এ সেই ভিত্তিকে সরকার গঠনের উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারলে তা হবে পূর্বভারতে বিজেপির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্যগুলির একটি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, “অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ” ছিল কেবল নির্বাচনী স্লোগান নয়—এটি ছিল পূর্বভারতকে কেন্দ্র করে বিজেপির দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। বিহারে প্রভাব, ওড়িশায় সম্প্রসারণ এবং বাংলায় তৃণমূলের ঘাঁটি ভাঙা—এই তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই পূর্বাঞ্চলে গেরুয়া করিডর গড়ার স্বপ্ন দেখা হয়েছে। বাংলায় যদি সরকার পরিবর্তন ঘটে, তবে তা জাতীয় রাজনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলবে। কারণ পশ্চিমবঙ্গ শুধু একটি রাজ্য নয়; এটি সাংস্কৃতিক, কৌশলগত এবং রাজনৈতিকভাবে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল।অন্যদিকে, কংগ্রেস ও বামফ্রন্টের দুর্বল উপস্থিতি আরও স্পষ্ট করেছে যে বাংলার রাজনীতি এখন কার্যত দ্বিমুখী—তৃণমূল বনাম বিজেপি। একসময়ের বাম দুর্গ এখন ইতিহাস, কংগ্রেস প্রান্তিক, আর মূল লড়াইয়ে আঞ্চলিক শক্তির মুখোমুখি সর্বভারতীয় শক্তি। এই পরিবর্তন বাংলার রাজনৈতিক চরিত্রেরও পুনর্নির্মাণ করছে।

তবে গণতন্ত্রে শেষ কথা বলে চূড়ান্ত ফলাফল। বাংলার বহু আসনে শেষ রাউন্ড পর্যন্ত নাটকীয় উলটফেরার নজির রয়েছে। তাই বিজেপির বর্তমান অগ্রগতি যতই তাৎপর্যপূর্ণ হোক, সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক সতর্কতা জরুরি।তারপরও আজকের সামগ্রিক প্রবণতা একটি বড় বার্তা দিচ্ছে—বাংলা সম্ভবত নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে। যদি বিজেপি শেষ পর্যন্ত সরকার গঠন করে, তবে তা শুধু তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনের অবসান নয়; এটি হবে নরেন্দ্র মোদির “অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ” স্লোগানের বাস্তব রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা।
পূর্বভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে তখন এক নতুন সমীকরণ তৈরি হবে, যেখানে বঙ্গ আর আলাদা দ্বীপ নয়—বরং বৃহত্তর গেরুয়া কৌশলের কেন্দ্রীয় স্তম্ভ। বাংলার মানুষ শেষ পর্যন্ত কী রায় দেন, তা চূড়ান্ত ফলেই স্পষ্ট হবে। তবে আজকের ভোটগণনা অন্তত এটুকু বলছে—পরিবর্তনের হাওয়া এবার শুধু স্লোগানে সীমাবদ্ধ নয়, তা ইতিহাসও লিখতে পারে।