ভারতীয় নৌবাহিনী থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাথলেটিকস, পারভেজ খানের অনুপ্রেরণাদায়ক যাত্রা

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 2 Months ago
পারভেজ খান
পারভেজ খান
 
ড. ফিরদৌস খান

হরিয়ানার মেওয়াট অঞ্চলের পারভেজ খান প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে অদম্য প্রতিভা সাফল্যের দ্বার খুলে দিতে পারে। রাজ্যের সবচেয়ে অনুন্নত এলাকার একটি ছোট গ্রাম থেকে উঠে এসে তিনি নিজের জায়গা করে নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে। তাঁর সাফল্য শুধু তাঁর পরিবার বা জেলার নয়, গোটা দেশের গর্ব বাড়িয়ে দিয়েছে।
 
২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর নুহ জেলার চাহলকা গ্রামে জন্মগ্রহণকারী পারভেজ একটি সাধারণ পরিবারে বড় হয়েছেন। তাঁর বাবা নফিস আহমেদ একজন কৃষক এবং মা হামসিরা গৃহিণী। অল্প কৃষিজমি ও পরিবারের দারিদ্র্যের কারণে জীবন চালানোই ছিল কঠিন। বাবা-মা কেউই শিক্ষিত ছিলেন না। তবুও শিক্ষার অভাব ও অর্থনৈতিক বাধা সত্ত্বেও পারভেজ খেলাধুলার মাধ্যমে নিজের পরিচয় ও লক্ষ্য খুঁজে পান। ছোটবেলাতেই অ্যাথলেটিকসে সুনাম অর্জন করেন এবং মেওয়াটের তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠেন। এখন অনেক অভিভাবক চান তাঁদের সন্তানও তাঁর পথ অনুসরণ করুক।
 
জাতীয় গেমসে তার স্বর্ণপদক প্রদর্শন করছেন পারভেজ খান
 
২০২৩ সালের আগস্টে পারভেজ যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্পোর্টস স্কলারশিপ পান।বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র অ্যাসোসিয়েটের আমন্ত্রণপত্রে উল্লেখ করা হয় যে তাঁর অসাধারণ অ্যাথলেটিক পারফরম্যান্সের ভিত্তিতেই তাঁকে বেছে নেওয়া হয়েছে। চার বছরের পড়াশোনার সব খরচই এই স্কলারশিপ বহন করছে। পরিবারে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়, আর পারভেজ ফ্লোরিডায় নতুন যাত্রা শুরু করতে রওনা হন।
নুহর ইয়াসিন মেও স্কুল থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা সম্পন্ন করে তিনি বর্তমানে আর্টসে ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি কঠোর অ্যাথলেটিকস প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। পারভেজ বলেন, এই স্কলারশিপ তাঁর জীবনে আনন্দ ও গর্ব দুটোই এনে দিয়েছে এবং তিনি নিজের খেলাধুলার দক্ষতা আরও শাণিত করতে চান।
 
গ্রামের মানুষের কাছে তাঁর সাফল্য যেন স্বপ্নপূরণের মতো। একটি গরিব পরিবার থেকে উঠে আসা, টাকা বা প্রভাব কিছুই নেই, এমন একজন ছেলের আমেরিকার বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া একসময় অকল্পনীয় ছিল। কিন্তু পরিশ্রম, প্রতিভা এবং মনোবল দিয়ে পারভেজ সেই অসম্ভবকেও সম্ভব করেছেন। তাঁর সাফল্য শুধু গ্রামে নয়, গোটা অঞ্চলে অসংখ্য মানুষকে অনুপ্রেরণা দিচ্ছে।
 
২০২৪ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানায় অনুষ্ঠিত এসইসি আউটডোর ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে পারভেজ ১৫০০ মিটার দৌড়ে সোনা জয় করেন। সময় লাগে ৩ মিনিট ৪২.৭৩ সেকেন্ড। ধীরগতিতে শুরু করলেও শেষ ধাপে অসাধারণ স্প্রিন্টে তিনি প্রথম হন। 
 
ট্রেনিং- এর সময় পারভেজ খানের একটি ছবি
 
তবে এটি ছিল না তাঁর ব্যক্তিগত সেরা সময়, এক মাস আগে ক্যালিফোর্নিয়ায় তিনি করেছিলেন ৩ মিনিট ৩৮.৭৬ সেকেন্ড। একই প্রতিযোগিতায় তিনি ৮০০ মিটারে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। ১৫০০ মিটারের দৌড়ে তাঁর শেষ ধাপের স্প্রিন্টের ভিডিও ভাইরাল হয়ে যায়। শিল্পপতি আনন্দ মাহিন্দ্রাও এক্স-এ ভিডিওটি শেয়ার করে তাঁর আবেগ, সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যতে ভারতীয় অ্যাথলেটিকসের তারকা হওয়ার শুভকামনা জানান।
 
এর আগে, ২০২৪ সালের জুনে পারভেজ পঞ্চকুলায় অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া ও হরিয়ানা অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন আয়োজিত প্রতিযোগিতায় ১৫০০ মিটারে সোনা জয় করেন। সময় লাগে ৩ মিনিট ৪২.৯৫ সেকেন্ড। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে তিনি মাঙ্গালুরুতে অনুষ্ঠিত ৮১তম অল ইন্ডিয়া ইন্টার-ইউনিভার্সিটি অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে ৮০০ মিটারে ১ মিনিট ৫২.৪২ সেকেন্ড সময় নিয়ে সোনা এবং ১৫০০ মিটারে ব্রোঞ্জ জয় করেন। ২০২১ সালে ওয়ারাঙ্গলে ওপেন ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি ১৫০০ মিটারে সোনা পান।
 
পারভেজের অ্যাথলেটিকস যাত্রা শুরু হয় ভারতীয় নৌবাহিনীতে যোগদানের প্রস্তুতি নেওয়ার সময়। শারীরিক অনুশীলন থেকেই দৌড়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ জন্মায় এবং পরে তিনি সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করেন এই খেলায়।শৃঙ্খলা, কঠোর পরিশ্রম এবং দৃঢ়তা তাঁকে এক এলিট অ্যাথলেটে পরিণত করেছে। বর্তমানে তিনি গর্বের সঙ্গে ভারতীয় নৌবাহিনীতে কর্মরত এবং পাশাপাশি প্রতিযোগিতায়ও উজ্জ্বল সাফল্য অর্জন করে চলেছেন।
 
পারভেজ খান তাঁর মায়ের সঙ্গে
 
তাঁর চাচা খালিদ বলেন, “পারভেজ কখনোই ট্রেনিংয়ে কার্পণ্য করে না। পরিশ্রম আর ইতিবাচক চিন্তাই তার শক্তি। সে কখনো পিছনে তাকায় না, সবসময় সামনে এগিয়ে চলে। আমাদের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হল, একদিন সে ভারতের হয়ে অলিম্পিকে পদক জিতুক।”
 
পারভেজের ছোট ভাই রোহিত খানও খেলাধুলার পথে হাঁটছে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর গুরুগ্রামে অনুষ্ঠিত হরিয়ানার স্পোর্টস মহাকুম্ভে সে ৬৫ কেজি ওজনশ্রেণিতে মোট ২৩০ কেজি তুলে ব্রোঞ্জ জয় করে।
 
মেওয়াটের দারিদ্র্যপীড়িত এক গ্রাম থেকে আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিকস ট্র্যাকে পৌঁছানো, পারভেজ খানের জীবন প্রকৃতই অধ্যবসায় ও আকাঙ্ক্ষার বিস্ময়কর যাত্রা। তিনি আজ সেই সব মানুষের আশা, যারা দারিদ্র্য ও বাধা পেরিয়ে স্বপ্ন দেখতে সাহস করে। পারভেজ শুধু সম্ভাবনাময় অ্যাথলেট নন, দৃঢ় সংকল্প মানুষকে কোথায় পৌঁছে দিতে পারে তার জীবন্ত প্রমাণ।
 
(লেখক: কবি, গল্পকার ও সাংবাদিক)