চার দিনের ‘সাধনা’, খুদে হাতে মৃন্ময়ী দশভুজা! চাঁচলের ১১ বছরের ত্রিদিবের ‘শিল্পের জাদু’-তে মুগ্ধ পরিবার সহ গোটা এলাকা
তরুণ নন্দী / কলকাতা
পড়ে ক্লাস সিক্সে, পড়াশুনোর পাশাপাশি মাটির প্রতি প্রবল টান ১১ বছরের ত্রিদিব-এর। কুমোরটোলি শিল্পীদের কাজ দেখার পর থেকে আগ্রহ বাড়তে থাকে। এরপর ইউটিউবের ভিডিও থেকে কৌশল শিখে চার দিনেই কল্পনা মিশিয়ে নিজের হাতে গড়ে ফেলেছে প্রায় তিন ফুটের দুর্গাপ্রতিমা। চাঁচলের বামুনপাড়ার ষষ্ঠ শ্রেণির পড়ুয়া ত্রিদিব সুরের প্রতিভা দেখে মুগ্ধ স্কুলের শিক্ষক থেকে প্রতিবেশীরা।
মা দুর্গার আগমনের অপেক্ষায় এখন প্রহর গুনছে প্রতিটি বাঙালী। ঠিক উৎসবের এই আবহে মালদার চাঁচলের বামুনপাড়ায় নজর কেড়েছে ১১ বছরের এই খুদে শিল্পী। বয়সের তুলনায় তার কল্পনা আর সৃষ্টির জগৎ হয়ে উঠেছে অনেকটাই বড়। ছোট্ট দুটো হাতেই শিল্পের ছোঁয়ায় মাটির দলা থেকে ত্রিদিব গড়ে তুলেছে দশভুজা দুর্গার প্রতিমা। আর সেই প্রতিমাকে ঘিরেই এখন আনন্দে মেতেছে এলাকাবাসী থেকে গোটা সুর পরিবার।
ত্রিদিব সুর গড়ে তুলেছে দশভুজা দুর্গার প্রতিমা
চাঁচলের খুদে শিল্পীর নাম ত্রিদিব সুর। পড়ে সিদ্ধেশ্বরী ইনস্টিটিউশনের ষষ্ঠ শ্রেণিতে। বাবা পরিমল সুর পেশায় একজন সাধারণ ব্যবসায়ী, আর মা গৃহবধূ। জানা গেল, পরিবারের কেউই মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত কোনদিনই ছিলনা। কোনও প্রথাগত প্রশিক্ষণ ছাড়াই মাটির প্রতি অদ্ভুত এক টানে ত্রিদিবকে পা ফেলেছে সৃষ্টির জগতে। মাটিকাদা নিয়ে খেলতে খেলতেই শিল্পের প্রতি গভীর ভালোবাসা তৈরি হয়েছে তার।
ত্রিদিবের এই শিল্পভাবনার পরিসরটা একটু অন্যরকম। আগ্রহ করে কুমোরটোলিতে গিয়ে প্রতিমাশিল্পীদের কাজ একমনে দেখেছে সে। দেখেছে মৃৎশিল্পীরা কীভাবে মাটির তাল থেকে কোন কৌশলে ধীরে ধীরে ফুটিয়ে তোলে দেবীর অবয়ব। কীভাবে তৈরি হয় দেবীর হাত, মুখ কিংবা অলংকার। সবকিছুই শেখার বিষয় হয়ে উঠছে তার শিশুমনে।
আবার কখনও ইউটিউবের বিভিন্ন মুর্তি তৈরির ভিডিও দেখে রপ্ত করেছে প্রতিমা গড়ার কৌশল। নিজের চেষ্টায় বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তিও তৈরি করেছে বলে জানিয়েছে পরিবার। তবে এবছরই তাদের ছেলে প্রথম দুর্গাপ্রতিমা তৈরির কাজে হাত দিয়েছে। আর প্রথম প্রচেষ্টাতেই তার সৃষ্টি যেন গোটা এলাকায় সাড়া ফেলে দিয়েছে। প্রায় তিন ফুট উচ্চতার দুর্গা প্রতিমা তৈরি করতে সময় লেগেছে মাত্র চার দিন।
ত্রিদিব সুর গড়ে তুলেছে দশভুজা দুর্গার প্রতিমা
ছোট্ট হাতে গড়া সেই প্রতিমায় রয়েছে তার নিজস্ব ভাবনা। প্রতিমা সাজিয়ে তোলার ক্ষেত্রেও সে রীতিমত দেখিয়েছে নিজের শিল্পীসত্তার পরিচয়। লাল শাড়ি, মাথায় সাদা মুকুট, মৃন্ময়ী মাকে নিজের কল্পনায় সাজিয়ে তুলেছে সে। এমনকী দেবীর ত্রিশূল তৈরিতেও রয়েছে অভিনবত্ব। ব্যবহার করেছে নারকেল পাতার কাঠি। সীমিত উপকরণ থেকে নিজের কল্পনা মিশিয়ে ত্রিদিবের যে কাজের বিশেষত্ব দেখিয়েছে তাতে সকলেই অভিভূত।
পরিবারের তরফে জানানো হয়েছে, মহাষষ্ঠীর দিন থেকে নিয়ম মেনে বাড়িতেই পুজো হবে ত্রিদিবের হাতে তৈরি দুর্গাপ্রতিমায়। ফলে এবারের দুর্গোৎসব সুর পরিবারের কাছে এবারের পুজো যেন ছেলের প্রতিভাকে কাছ থেকে দেখার এক আবেগঘন মুহূর্ত। ছেলের এই প্রতিভার জন্য গর্ব অনুভব করছেন বাবা পরিমল সুর।
ত্রিদিব সুর গড়ে তুলেছে দশভুজা দুর্গার প্রতিমা
পরিমলবাবু বলেন, “শৈশবে আমারও প্রতিমা বানানোর প্রতি আগ্রহ ছিল। কিন্তু নানা কারণে শখ পূরণ করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু ছেলে যখন প্রতিমা তৈরির দিকে আগ্রহ দেখিয়েছে, তখন ওকে সবরকমভাবে সহযোগিতা করছি।” বাবার অপূর্ণ থেকে যাওয়া শখ যেন নতুন করে প্রাণ পেয়েছে ছেলের হাত ধরে। ত্রিদিবের শিল্পকর্মে আজ সেই স্বপ্নেরই কিছুটা প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। বলা ভালো একটু একটু করে, পরিবারের উৎসাহে খুদে শিল্পীর আগ্রহকে যেন প্রেরণা জোগাচ্ছে।
ত্রিদিবের পিসি নুপুর সুরও ভাগ করে নিয়েছেন ছোটবেলার স্মৃতি। তিনি স্মৃতি আঁকড়ে বলেন, “ছোট থেকেই শান্ত ও লাজুক প্রকৃতির ছেলে ত্রিদিব। একমনে মাটিকাদা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে ভালোবাসত। সেই থেকেই একটু একটু করে মূর্তি বানানোর আগ্রহ তৈরি হয়েছে তার।” ১১ বছরের ছেলেটির শিল্পভাবনা দেখে প্রতিবেশীরা মুগ্ধ হয়ে বলছেন, ত্রিদিবের স্বপ্নের উচ্চতা কতটা, তা বলে দেবে আগামী দিন। তাঁরা মনে করেন, সঠিক দিশা খুঁজে পেলেই এই ছেলেই প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পাবেই।