বাবর আলি: ৯ বছর বয়সে স্কুল তৈরি করে আজ বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ প্রধান শিক্ষক, যাকে শিক্ষাজগতের ‘আইডল’ বলা হয়
Story by Tarun Nandi | Posted by Aparna Das • 8 h ago
বাবর আলি: ৯ বছর বয়সে স্কুল তৈরি করে আজ বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ প্রধান শিক্ষক, যাকে শিক্ষাজগতের ‘আইডল’ বলা হয়
তরুণ নন্দী / কলকাতা
এলাকার সমবয়সিরা একসঙ্গে খেলতে যাচ্ছে, অথচ তারা সবাই স্কুলে যায় না কেন? এই প্রশ্নটা একসময় ঘুরপাক খেত ৯ বছর বয়সি পঞ্চম শ্রেণীতে পড়া বাবর আলীর মনে। সে দেখত তার বন্ধুরা পড়া ফাঁকি দিয়ে শৈশবেই নেমে পড়েছিল নানা কাজে। কেউ কাগজ কুড়ায়, কেউ মাঠে চাষাবাদ করে, তো কেউ আবার রাজমিস্ত্রির সহযোগিতা করে পরিবারের হাল ধরতে নেমে পড়েছে। চারপাশে স্পষ্ট দারিদ্র্যের প্রগাঢ় ছায়া উপলব্ধি করে সেসময় কেঁদে উঠেছিল শিশু বাবরের মন। আর এই রুক্ষ বাস্তবতার মাঝেই বাবর স্বপ্ন দেখেছিল অন্যরকম এক পৃথিবীর।
নিজের সীমাবদ্ধতাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে হাতে তুলে নিয়েছিল চক আর ভাঙা বোর্ড। অতটুকু বয়সেই বাবর বুঝেছিলেন, চরম অন্ধকার থেকে মুক্তির একমাত্র চাবিকাঠি হতে পারে শিক্ষা। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। ছোট বয়সেই পাড়ার বন্ধুদের জন্য বাড়ির উঠোনে এককোণে গাছতলাতেই শুরু করে দিয়েছিলেন স্কুল। নাম দেওয়া হল আনন্দ শিক্ষা নিকেতন। মুর্শিদাবাদের বেলডাঙ্গার বাসিন্দা সেই বাবর আলিই তারপর হয়ে উঠেছেন বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ প্রধান শিক্ষক। যিনি আজও প্রেরণা জুগিয়ে চলেছেন হাজার হাজার ছেলেমেয়ের
শৈশবাবস্তাই বাবর আলি অন্য শিশুদের পাঠ দেওয়ার একটি দৃশ্য
জানা যায়, ২০০২ সালে সমবয়সিরা স্কুল না গিয়ে অনেক সময় খেলায় মত্ত থাকত। কিম্বা পরিবারের সঙ্গে যেত কাজের সন্ধানে। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে কিছু শিশুকে দেখে থমকে দাঁড়ায় বাবর আলি। মনে অনেক প্রশ্ন নিয়েই তাদের জিজ্ঞেস করে, আমি যদি তোমাদের পড়াই, তোমরা কি পড়তে চাও? সেই নিষ্পাপ শিশুদের সকলেই বলেছিল হ্যাঁ আমরা পড়তে চাই। এরপরই বাবর আলি চিরতরে বদলে দিল মুর্শিদাবাদের শিক্ষার ইতিহাসটা।
নিজের এক কামরার বাড়ির সামনে একটা পেয়ারা গাছের নিচে মাত্র আটজন কচিকাঁচাকে নিয়ে শুরু হলো বাবরের সান্ধ্যকালীন ক্লাস। ক্লাসের পরিকাঠামো না থাকায় সেসময় মেঘ ডাকলে ক্লাস বাতিল হতো। অন্ধকার নামার আগেই শেষ করতে হতো পড়াশুনোর পাঠ। ব্ল্যাকবোর্ড বলতে ছিল একটা পোড়ামাটির টালি। নিজের স্কুলের শিক্ষিকার কাছ থেকে লুকিয়ে চেয়ে আনা ভাঙা চকের টুকরো দিয়ে শুরু হয়েছিল যে লড়াই, মাত্র ১৬ বছর বয়সেই তা বিবিসি-র দরবারে স্বীকৃতি পায়। বাবর ভূষিত হন বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে।
বাবর আলি তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একটি ছবি
শুরুতে পড়ুয়াদের খাতা জোগাতে রদ্দিওয়ালার কাছ থেকে পুরোনো কাগজ কিনে আনতেন তিনি। ছোট ছোট পড়ুয়ারা যাতে রোজ আসে তাই নিজের হাতখরচের পয়সায় মিষ্টি কিনে খাওয়াতেন। পড়ুয়াদের অভিভাবকেরা শিক্ষার মূল্য বুঝতেন না, তাই দিনের পর দিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার মূল্য বোঝাতে হয়েছে এই খুদে শিক্ষক বাবর আলীকে। ওইটুকু বয়সেই তিনি বুঝেছিলেন, এই সংক্ষিপ্ত মানব জীবনে তাকে অবশ্যই অসাধারণ কিছু করতে হবে।
বাবর আলির নিজের বিষয়ে বলতে গিয়ে জানালেন, স্কুল তৈরির একেবারে শুরুর দিনগুলোর কথা। তিনি বলেন, যে স্কুলে পড়তাম সেথান থেকে চক আনতাম আমার স্কুলের জন্য। কারণ, পড়ানোর জন্য চক তো লাগবেই। নিজের স্কুল থেকে চক আনা নিয়ে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। কিন্তু চক কেন নিচ্ছি তা জানার পর শিক্ষক-শিক্ষিকারা আমায় এক বাক্স চক উপহার দিয়েছিলেন।
বাবর আলি
সেই পেয়ারা তলার পাঠশালা আজ বিরাট রূপ নিয়েছে 'আনন্দ শিক্ষা নিকেতন'-এ। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সেখানে কয়েশো পড়ুয়া আলোর দিশা পাচ্ছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, প্রথম ব্যাচের যে আটজন ছাত্রকে বাবর পড়িয়েছিলেন আজ তাঁরাই স্নাতক হয়ে অবৈতনিক শিক্ষক হিসেবে কাঁধ মিলিয়েছেন বাবরের স্বপ্নপূরণ করতে।
বাবরের এই হার-না-মানা জেদকে কুর্নিশ জানিয়েছে গোটা বিশ্ব। ২০০৯ সালে BBC তাঁকে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনের আমন্ত্রণে শান্তিনিকেতনে বক্তৃতা দেওয়া থেকে শুরু করে আমির খানের 'সত্যমেব জয়তে'র মঞ্চ, কিংবা এনডিটিভির 'ইন্ডিয়ান অফ দ্য ইয়ার', সর্বত্রই আজ মুখরিত বাবরের নাম।
সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, কর্ণাটক সরকার ও এনসিইআরটি-র পাঠ্যবইতে স্থান পেয়েছে তাঁর জীবনসংগ্রাম। বাবর আলির উদ্যোগে গত দুই দশকে ৭০০০-এরও বেশি শিক্ষার্থীর জীবনে পরিবর্তন এসেছে বলে প্রতিষ্ঠানটির দাবি।
ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পাশ করে বর্তমানে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর করা বাবর আজও স্বামী বিবেকানন্দের বাণীকে জীবনের মূলমন্ত্র করে পথ চলছেন। বলা ভালো, বাবর আলি বর্তমানে শিক্ষাজগতের আইডল। তিনি প্রমাণ করেছেন, প্রবল ইচ্ছেশক্তি থাকলে শূন্য থেকেও এক অনন্য আলোর সাম্রাজ্য গড়ে তোলা যায়।