কলকাতা:
বদলে যাচ্ছে সীমান্ত নিরাপত্তার চেহারা। শুধু কাঁটাতারের বেড়া বা মানব টহল নয়, এবার প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির মাধ্যমে সীমান্তকে প্রায় দুর্ভেদ্য করে তোলার পথে এগোচ্ছে ভারত। ড্রোনের মাধ্যমে অস্ত্র, মাদক ও বিস্ফোরক পাচারের ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলায় দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি অত্যাধুনিক অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা এবং ‘স্মার্ট বর্ডার গ্রিড’ দ্রুত মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জানিয়েছেন, সীমান্ত সুরক্ষায় আত্মনির্ভর ভারতের সক্ষমতার প্রতিফলন ঘটিয়ে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এই ব্যবস্থা দেশের নিরাপত্তাকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করে তুলবে। বিশেষ করে পাঞ্জাব, জম্মু ও কাশ্মীর এবং অন্যান্য সংবেদনশীল সীমান্ত এলাকায় এই প্রযুক্তি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্থাপন করা হবে।
ড্রোন এখন নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্তে ড্রোনের ব্যবহার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তদন্তকারী সংস্থাগুলির তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান সীমান্ত দিয়ে একাধিকবার ড্রোনের মাধ্যমে একে-৪৭ রাইফেল, পিস্তল, বিস্ফোরক, মাদকদ্রব্য এবং জাল মুদ্রা পাচারের চেষ্টা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে রাতের অন্ধকারে জিপিএস-নিয়ন্ত্রিত ড্রোন ব্যবহার করে সীমান্তের নির্দিষ্ট স্থানে অস্ত্র ফেলে যাওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের যুদ্ধ ও সীমান্ত সংঘাত ক্রমশ "হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার"-এর দিকে এগোচ্ছে, যেখানে প্রচলিত অনুপ্রবেশের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর হামলা ও নজরদারি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
কীভাবে কাজ করবে অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা?
নতুন ব্যবস্থায় থাকবে উন্নতমানের রাডার, রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি সেন্সর, ইলেকট্রো-অপটিক্যাল ক্যামেরা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শনাক্তকরণ প্রযুক্তি। সন্দেহজনক ড্রোন শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটির গতিপথ বিশ্লেষণ করে প্রয়োজন হলে যোগাযোগ ব্যবস্থা জ্যাম করে দেওয়া হবে বা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সেটিকে নিরাপদে নামিয়ে আনা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি শুধু সীমান্তেই নয়, ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিমানবন্দর, প্রতিরক্ষা ঘাঁটি এবং কৌশলগত অবকাঠামোর নিরাপত্তাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
গড়ে উঠছে চার-স্তরের নিরাপত্তা বলয় ।কেন্দ্রীয় সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী সীমান্তজুড়ে একটি ‘৪-স্তরের নিরাপত্তা বলয়’ তৈরি করা হচ্ছে। এর অন্তর্ভুক্ত থাকবে—
প্রথম স্তর: কাঁটাতারের বেড়া, ফ্লাডলাইট ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতা।
দ্বিতীয় স্তর: স্মার্ট সেন্সর, গ্রাউন্ড সার্ভেইলেন্স রাডার ও গতিবিধি শনাক্তকারী যন্ত্র।
তৃতীয় স্তর: অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা, এআই-ভিত্তিক বিশ্লেষণ ও ডিজিটাল নজরদারি নেটওয়ার্ক।
চতুর্থ স্তর: সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল, গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ এবং সমন্বিত কমান্ড কন্ট্রোল ব্যবস্থা।
‘স্মার্ট বর্ডার’-এর পথে ভারত
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, ‘স্মার্ট বর্ডার গ্রিড’ প্রকল্পের মাধ্যমে সীমান্তের বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে একটি একীভূত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা হবে। ফলে সীমান্তের যে কোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপ রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের বহু দেশ ইতোমধ্যেই প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত ব্যবস্থাপনার দিকে ঝুঁকেছে। ভারতও সেই পথেই এগোচ্ছে। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি স্থানীয় জনসম্পৃক্ততা, গোয়েন্দা সমন্বয় এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দক্ষতাই শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ধারণ করবে।
সীমান্ত সুরক্ষা এখন আর শুধু প্রহরার বিষয় নয়; এটি প্রযুক্তি, কৌশল এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সমন্বিত লড়াই। আর সেই লড়াইয়ে আত্মনির্ভর প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করেই নতুন নিরাপত্তা অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছে ভারত।