তরুণ নন্দী, কলকাতাঃ
নেপালে ঘুরতে গিয়েছিলাম। যাওয়ার পথে গাড়ি চলতে চলতেই চালক দেখতে পায় পাহাড়ের উপর থেকে ধোঁয়ার মতো কিছু একটা নিচে নামছে। আমরা তাই দেখলাম। ওমন দৃশ্য দেখেই চালকের সন্দেহ হওয়ায় চালক গাড়ি পাহাড়ে উপরে তুলে দেয়। গাড়ি আর সামনের না এগিয়ে অন্য পথ ধরে। আর তাতেই রক্ষা পেয়ে যান তাঁরা। সব বিপদ কাটিয়ে রবিবার বাড়ি ফিরেই নেপালে বেড়াতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ননা করলেন উৎকন্ঠা নিয়ে। বলা যেতে পারে নেপালের গাড়ি চালকের উপস্থিত বুদ্ধির জোরে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলেন উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাছারিপাড়ার বাসিন্দা অনুকূল পোদ্দার ও তাঁর স্ত্রী রেবা রায় পোদ্দার। বাড়ি ফিরে রেবা দেবী বললেন, ঈশ্বরের অশেষ কৃপা তিনি আমাদের পদে পদে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছেন।
পোদ্দার দম্পতির কথা থেকে এটুকু স্পষ্ট হল, বিপদের শুরুটা হয়েছিল গত বুধবার। নেপালে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধাক্কায় চারদিক লন্ডভন্ড, সেই ছবি নেটদুনিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই চিন্তা বাড়ে পরিবারে। সেই মুহূর্ত থেকেই পুরোপুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় অনুকূলবাবু ও রেবাদেবীর সঙ্গে। চরম উৎকন্ঠা নিয়ে কয়েক দিন পার হয়ে যায় পরিবারের সদস্যদের। নিখোঁজ দম্পতির খোঁজ পেতে প্রশাসনের দরজায় দরজায় ঘুরেছিলেন আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা। অবশেষে উৎকণ্ঠা কাটিয়ে পরিবারের কাছে ফোন আসে নেপাল থেকে।
পোদ্দার দম্পতি পরিবারকে জানান, আমরা ভালো আছি, বিপদ কেটে গিয়েছে। তারপর থেকে বাড়ি ফেরা নিয়ে বাড়ছিল উদ্বেগের পারদ। রবিবার সকালে পুলিশি পাহারায় বসিরহাটের কাছারিপাড়ার বাড়িতে এসে পৌঁছান পোদ্দার দম্পতি। তাঁদের দেখে তখন গোটা এলাকায় আনন্দের জোয়ার। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন পরিবার থেকে প্রতিবেশীরা। কিন্তু কী ঘটেছিল সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তে? সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে এখনও শিউরে উঠছেন অনুকূলবাবু।
তিনি জানান, পর্যটকদের নিয়ে তাঁদের গাড়িটি পাহাড়ি পথ ধরে এগোচ্ছিল। হঠাৎই চালকের চোখে পড়ে দূরের পাহাড়ের ওপর থেকে ধোঁয়ার মতো কী যেন হুড়মুড় করে নেমে আসছে। অভিজ্ঞ চালকের এক মুহূর্তও সময় লাগেনি বুঝতে আসলে কী ঘটতে চলেছে। সামনে ওই দৃশ্য দেখে এক মুহূর্ত দেরি না করে সকলকে বাঁচাতে চালক গাড়িটিকে পেছনের দিকে ঘুরিয়ে পাহাড়ের নিরাপদ ওপরের অংশে তুলে দেন। এরপর গাড়ি আর সামনে এগোয়নি। পরে অন্য পথ ধরে গাড়ি হোটেলে পৌঁছে যায়। আর এতেই প্রাণ বেঁচে যায় অনুকূলবাবু, তাঁর স্ত্রীসহ গাড়িতে থাকা ২২ জন পর্যটকের। অনুকূলবাবু বলেন, গাড়িতে করে আর কিছুটা এগিয়ে গেলে কিংবা একদিন আগে রওনা দিলে হয়তো আমরা আর ফিরতে পারতাম না। ঈশ্বরের অশেষ আশীর্বাদ আমাদের সঙ্গে ছিল। আমাদের গাড়ি চালকের এই অসাধারণ তৎপরতাই আমাদের এযাত্রা বাঁচিয়ে দিল।
একইভাবে গা শিউরে ওঠা অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন তাঁর স্ত্রী রেবা রায় পোদ্দারও। চোখে তখনও রয়েছে উদ্বেগ। সব কাটিয়ে তিনি বলেন, এবাবে বেঁচে ফেরা আসলে শুধুই ঠাকুরের অসীম করুণা। তিনি চলার পথে পদে পদে আমাদের রক্ষা করেছেন। ড্রাইভার যদি ওই মুহূর্তে গাড়ি না ফেরাতেন, তবে আজকের এই চিত্রটা অন্যরকম হতে পারত। উৎকণ্ঠা দিনগুলো কাটিয়ে অবশেষে এই দম্পতি ঘরে ফিরলেন বটে, তবে নেপালে বেড়াতে যাওয়ার ভয়াল স্মৃতির দাগ হয়তো চিরকাল থেকে যাবে এই পরিবারে।