কিংশুক চট্টোপাধ্যায়
ইরানের রাজপথে আবারও অশান্তির পদধ্বনি। দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে, আর তার বিস্তার শাসকগোষ্ঠীর কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর দমননীতি যতই কঠোর হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে শাসনের অন্দরে একমত হওয়ার অভাব রয়েছে, কেউ চাইছে লোহার হাত, কেউ আবার জনরোষকে সামাল দিতে চাইছে সংযম ও সমঝোতার পথে।
এই উত্তাল পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কতদূর গড়াবে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত হওয়ার পর এমন এক সংকটময় মুহূর্তে এই গণআন্দোলন শাসনব্যবস্থার সহনশীলতা ও স্থিতিশীলতাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিতে পারে, যখন তার ভিত আগেই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
বর্তমান আন্দোলনের সূচনা হয়েছে রিয়ালের দামের তীব্র পতনকে কেন্দ্র করে (বর্তমানে ১ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে প্রায় ১৪.৫ লক্ষ রিয়াল)। পাশাপাশি কিছু নির্দিষ্ট পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের জন্য যে বিশেষ বা অগ্রাধিকারমূলক বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার চালু ছিল, যা বাজারদরের তুলনায় অনেক কম, সেখানে সামান্য রদবদলও ক্ষোভ উসকে দিয়েছে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, এই বিশেষ সুবিধাগুলি নিয়মিতভাবে কেবল হাতে গোনা কয়েকজনেরই উপকারে আসে, প্রায়শই দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে।
তেহরানের রাজপথে অস্থিরতার এক দৃশ্য
নিত্যপ্রয়োজনীয় বহু পণ্যের আমদানির ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল ইরানের অর্থনীতি ১৯৭৯ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত; আর ২০১০ সাল থেকে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সন্দেহের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। ২০১৫–১৮ সালে জেসিপিওএ (JCPOA)-র আওতায় সাময়িক স্বস্তি মিললেও, ইরানের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষ চরম দুর্দশার মধ্যেই পড়ে থাকে। এর ফলশ্রুতিতে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দ্বিঅঙ্কের মুদ্রাস্ফীতি দেশটিতে নিত্যসঙ্গী, যার ফলে রিয়ালের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে।
এই আন্দোলনের সূচনা ঘটে যখন তেহরানের বাজারের ব্যবসায়ীরা, দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজারের প্রতিনিধি ‘বাজারি’রা, রিয়ালের অব্যাহত অবমূল্যায়নের প্রতিবাদে ধর্মঘটের ডাক দেন। খুব দ্রুতই তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন প্রাদেশিক কেন্দ্রগুলির (ইসফাহান, শিরাজ, কাজভিন প্রভৃতি) বাজারিরা। এরপর ৩১টি প্রদেশের মধ্যে ২৩টি প্রদেশের ৭৫টিরও বেশি শহর ও জনপদ থেকে বিপুল সংখ্যক ইরানি এই আন্দোলনে শামিল হন, যার অগ্রভাগে রয়েছে দেশের তরুণ প্রজন্ম।
গত দুই দশকে এই নিয়ে চতুর্থবার ইরানে শাসক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামল মানুষ। প্রথম বড়সড় গণঅসন্তোষ দেখা দেয় ২০০৯ সালে, যখন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ এক অত্যন্ত বিতর্কিত নির্বাচনে জয়ী হন। সে সময় শহুরে ইরানের বিস্তীর্ণ অংশ, বিশেষত তেহরান, এন্তেখাব-এ গুমশুদেহ (হারিয়ে যাওয়া নির্বাচন)-এর প্রতিবাদে ফেটে পড়ে, যা কঠোর হাতে দমন করা হয়। দ্বিতীয় দফার আন্দোলন শুরু হয় ২০১৭–১৮ সালের শীতে, প্রেসিডেন্ট রুহানির দ্বিতীয় মেয়াদে লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি ও দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক দুর্দশার বিরুদ্ধে। নির্মম দমনের ফলে প্রাণ হারান ১,৫০০-রও বেশি মানুষ।
তেহরানের রাজপথে অস্থিরতার এক দৃশ্য
এরপর সবচেয়ে তীব্র গণআন্দোলন ঘটে মাহসা জিনা আমিনির হেফাজতে মৃত্যুর পর, যাকে বাধ্যতামূলক হিজাব আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তথাকথিত ‘হিজাব আন্দোলন’ ১৪০টিরও বেশি শহর ও জনপদে ছড়িয়ে পড়ে; প্রাণহানি তুলনামূলক কম (৫৫১) হলেও গ্রেপ্তার হন ১৯,০০০-এরও বেশি মানুষ। ১৯৭৯ সালের পর এই আন্দোলনেই সামাজিক স্তরের সবচেয়ে ব্যাপক সমাবেশ দেখা যায়।
বর্তমান আন্দোলনও যেন সেই রকমই এক বিস্তৃত সামাজিক জোটের ফসল, যেন ২০২২–২৩ সালের অসমাপ্ত অধ্যায় ফের শুরু হয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে শাসনব্যবস্থা যে দুর্বল হয়ে পড়েছে, সেই সুযোগটাই যেন কাজে লাগাতে চাইছে বিক্ষুব্ধ জনতা। ২০২৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর শুরু হওয়া এই আন্দোলনে লেখা ছাপা হওয়া পর্যন্ত প্রায় চল্লিশ জনের মৃত্যু হয়েছে। সংখ্যা কম হলেও এক দিক থেকে এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে অশনি সংকেত।
আগের তিনটি আন্দোলনের কোনোটির ক্ষেত্রেই এমনটি দেখা যায়নি, এবার আন্দোলনের সূচনা করেছেন বাজারিরা, যারা ঐতিহাসিকভাবে শিয়া উলামাদের শক্ত ভিত। এই দুই শক্তির সামাজিক জোটই ছিল ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবে উলামাদের রাজনৈতিক ক্ষমতায় আরোহণের প্রধান ভিত্তি। অতীতে ব্যক্তিগতভাবে কিছু ব্যবসায়ী বিক্ষোভে অংশ নিলেও, বাজারি শ্রেণি হিসেবে তাঁরা সাধারণত ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন থেকে দূরে থেকেছেন।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, আধুনিক ইরানের ইতিহাসে যখনই বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে, ১৮৯২ সালের তামাক আন্দোলন, ১৯০৬ সালের মাশরুতে বিপ্লব, ১৯৫২ সালের তেল জাতীয়করণ সংকট কিংবা ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লব, প্রতিবারই বাজারিরা বিরোধী শক্তির পাশে দাঁড়িয়ে পরিবর্তনের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন। এ কারণে মনে করা হয়, ২০০৯, ২০১৭–১৮ ও ২০২২–২৩ সালের আন্দোলনে বাজারিদের অনুপস্থিতিই সেগুলোর দমন সহজ করে দিয়েছিল।
তেহরানের রাজপথে অস্থিরতার এক দৃশ্য
সম্ভবত এই ইতিহাস মাথায় রেখেই তেহরানে একদিকে রাতে তরুণদের ওপর কঠোর দমন নামিয়ে আনা হচ্ছে, অন্যদিকে সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বাজারিদের অর্থনৈতিক ক্ষোভ প্রশমিত করতে অগ্রাধিকারমূলক বিনিময় হার বাতিল ও সর্বস্তরে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন। উদ্দেশ্য একটাই, বাজারিদের যেন সেই আরও র্যাডিকাল, শাসন উৎখাতের দাবি তোলা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে জোট বাঁধতে না দেওয়া যায়।
কিন্তু এতে যে সফলতা আসবেই, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ২০১৭–১৮ সালের আন্দোলনে প্রথমবার জনগণের ক্ষোভ সরাসরি সুপ্রিম লিডার আলি খামেনেয়ির দিকে ঘুরে যায়; রাজপথে শোনা যায়, “মার্গ বা দিকতাতুর” (স্বৈরশাসকের মৃত্যু)। ২০২২–২৩ সালে তরুণ ও নারীদের কণ্ঠে “জান, জিন্দেগি, আজাদি” (নারী, জীবন, স্বাধীনতা)-র সঙ্গে সেই একই স্লোগান প্রতিধ্বনিত হয়। এবারও বাজারিদের আন্দোলনে নামার প্রথম দিন থেকেই “মার্গ বা দিকতাতুর”-এর সঙ্গে “আজাদি”-র দাবি শোনা যাচ্ছে, যা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের ইঙ্গিত।
নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত অর্থনীতি বাজারিদেরও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে; শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাঁদের অসন্তোষ ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। উলামা ও শাসনের এই ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের যদি দ্রুত নিজেদের পক্ষে টানা না যায়, তবে বিরোধী শক্তির সঙ্গে তাঁরা একত্রিত হলে তার পরিণতি হতে পারে অত্যন্ত গুরুতর।
(কিংশুক চ্যাটার্জী ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।)