স্বাধীনতার পর প্রথমবার ডিব্রুগড় থেকে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পণ্যবাহী জাহাজের পরিষেবা শুরু
ডিব্রুগড়:
স্বাধীনতার পর এই প্রথম অসমের উচ্চাঞ্চল থেকে কোনও আন্তর্জাতিক বন্দরের উদ্দেশে পণ্যবাহী জাহাজ যাত্রা করল। সোমবার ডিব্রুগড়ের বগিবিল টার্মিনাল থেকে ৫৪০ মেট্রিক টন মিথানল নিয়ে বাংলাদেশের ঢাকার উদ্দেশে রওনা হল বার্জ DLB Patkai। টাগ Kushal Konwar-এর সাহায্যে চলা এই জাহাজটির যাত্রার সূচনা করেন কেন্দ্রীয় বন্দর, জাহাজ চলাচল ও জলপথ মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল। অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যোগ দেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মা।
স্বাধীনতার পর উচ্চ অসম থেকে বিদেশি বন্দরের উদ্দেশে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এটিই প্রথম এমন উদ্যোগ। প্রায় ৭০ বছর আগে ডিব্রুগড়ের নদীবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ফের ব্রহ্মপুত্রের বুক দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উদ্দেশে পণ্য পাঠানো হল।
নামরূপে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা Assam Petro-Chemicals Ltd. (APCL)-এর তৈরি মিথানলটি বাংলাদেশের ঢাকার পানগাঁও বন্দরের উদ্দেশে যাচ্ছে। জাহাজটি ভারতে জাতীয় জলপথ-২ (NW-2) হিসেবে পরিচিত ব্রহ্মপুত্র দিয়ে প্রায় ৭৬৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছবে। এরপর Indo-Bangladesh Protocol Route (IBPR) ধরে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। বগিবিল, ডিব্রুগড় থেকে বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা পর্যন্ত মোট প্রায় ১,৩০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করবে জাহাজটি।
এই যাত্রাকে উত্তর-পূর্ব ভারতকে বিদেশের বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য ব্রহ্মপুত্রকে বাণিজ্যিক ভাবে কার্যকর পণ্য পরিবহণ করিডর হিসেবে গড়ে তোলার পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে নিয়মিত মিথানল পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সম্প্রতি বগিবিল ও ধুবড়িতে কাস্টমস এবং ইমিগ্রেশন কমপ্লেক্স তৈরি হওয়ায় এই পণ্য পরিবহণ সম্ভব হয়েছে।
অনুষ্ঠানে সর্বানন্দ সোনোয়াল বলেন, “আমাদের দাদু-ঠাকুমাদের প্রজন্ম ডিব্রুগড় ঘাটে স্টিমারের বাঁশির শব্দ শুনে বড় হয়েছেন। ৭০ বছর ধরে সেই বাঁশি নীরব ছিল, জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আজ ফের ডিব্রুগড় থেকে বিশ্বের উদ্দেশে একটি জাহাজ রওনা হল। নদী কখনও আমাদের ব্যর্থ করেনি। কয়েক দশক ধরে যা অনুপস্থিত ছিল, তা হল তাকে পুনরুজ্জীবিত করার সদিচ্ছা।”
অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এই দিনটিকে রাজ্যের জন্য গর্বের বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “অসমের নিজস্ব নদীপথে অসমের নামরূপে তৈরি পণ্য এবার আন্তর্জাতিক বাজারে যাচ্ছে। উত্তর-পূর্ব আর ভারতের প্রান্তিক অঞ্চল নয়, এটি এখন পূর্বের দিকে ভারতের প্রবেশদ্বার।”
সোনোয়াল বলেন, এই যাত্রা কোনও শেষ নয়, বরং একটি নতুন শুরুর সূচনা। তাঁর কথায়, “এটাই প্রথম যাত্রা, শেষ নয়। অসমের তরুণদের বলব, এই নদীকে সামনে রেখে স্বপ্ন দেখুন। বিশ্ব আর দূরে নয়, নদীর স্রোতের দিকেই রয়েছে।”
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ‘ভারতের চা-রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত ডিব্রুগড় তার পুরনো নদীবন্দর-গৌরব ফিরে পাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন সোনোয়াল। তাঁর বক্তব্য, বিশ্বমানের পরিকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি ডিব্রুগড়ের ঐতিহ্যও ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। তাঁর কথায়, “১৯৫৬ সালে যে স্টিমারের বাঁশির শব্দ থেমে গিয়েছিল, আজ তা আবার শোনা যাচ্ছে।”
একসময় পূর্ব ভারতের অন্যতম ব্যস্ত নদীবন্দর ছিল ডিব্রুগড়। ১৮৫৬ সালেই কলকাতা থেকে সরকারি স্টিমার ডিব্রুগড়ে পৌঁছত। ১৮৮২ সালে ডিব্রুগড় স্টিমার ঘাট থেকে ডিব্রু-সদিয়া রেল পরিষেবা শুরু হয়। ১৯১৩ সালের মধ্যে ব্রহ্মপুত্র দিয়ে প্রতিদিন ডিব্রুগড় পর্যন্ত স্টিমার চলাচল করত। চা, কাঠ এবং যাত্রী পরিবহণে এই জলপথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর সেই যোগাযোগ ব্যবস্থা বড় ধাক্কা খায়। অসমের পণ্য কলকাতায় পৌঁছতে পূর্ব পাকিস্তানের ভূখণ্ডের উপর দিয়ে যেতে হত। ১৯৫০ সালের ভূমিকম্পে ডিব্রুগড়ের কাছে নদীর গতিপথ ও তলদেশেও পরিবর্তন আসে। ১৯৫৪ সালে ডিব্রুগড় ঘাট থেকে নিয়মিত পণ্য বুকিং বন্ধ হয়ে যায় এবং ১৯৫৬ সালের ১৫ অক্টোবর ঘাটটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ততদিনে চা পরিবহণের বড় অংশ রেলপথে চলে গিয়েছিল। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর আন্তঃসীমান্ত নদীপথে বাণিজ্যও বন্ধ হয়ে যায়।
১৯৭২ সালে ভারত ও বাংলাদেশ নদীপথে বাণিজ্য সংক্রান্ত একটি প্রোটোকল স্বাক্ষর করে। এরপর ১৯৮৮ সালে সাদিয়া থেকে ধুবড়ি পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের ৮৯১ কিলোমিটার অংশকে National Waterway-2 ঘোষণা করা হয়। তবে এই জলপথে নিয়মিত পণ্য পরিবহণ শুরু হতে আরও বহু বছর সময় লাগে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে পান্ডু থেকে ধুবড়ি পর্যন্ত সিমেন্ট পরিবহণের মাধ্যমে নিয়মিত কার্গো পরিষেবার সূচনা হয়।
সোনোয়াল বলেন, কয়েক দশক ধরে ডিব্রুগড়ের সেই গৌরব ম্লান হয়ে গিয়েছিল। তাঁর কথায়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ডিব্রুগড়কে তার “প্রাপ্য মর্যাদা” ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বগিবিল টার্মিনাল, কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন কমপ্লেক্স এবং ‘জলবাহক’ প্রকল্পের অধীনে নির্দিষ্ট সময়সূচির কার্গো পরিষেবার মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক শহরে আধুনিক ও বিশ্বমানের পরিকাঠামো গড়ে উঠছে বলে জানান তিনি।
গত কয়েক বছরে এই জলপথে্র ব্যবহার ও বেড়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ হয়ে টাটা স্টিলের বার্জ পান্ডুতে পৌঁছেছিল। ২০২৩ সালে বারাণসী থেকে বাংলাদেশ হয়ে ডিব্রুগড় পর্যন্ত যাত্রা করেছিল নদী পর্যটন জাহাজ MV Ganga Vilas। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে বগিবিল যাত্রী ও কার্গো টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় এবং ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা চালু হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে চালু হয় ‘Jalvahak’ কার্গো ইনসেনটিভ প্রকল্প।
কেন্দ্রীয় বন্দর, জাহাজ চলাচল ও জলপথ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের জাতীয় জলপথে পণ্য পরিবহণ ২০১৩-১৪ অর্থবর্ষের ১ কোটি ৮০ লক্ষ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ২১ কোটি ৮০ লক্ষ মেট্রিক টনে পৌঁছেছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের জলপথ উন্নয়নে ৬,৮০০ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় জলপথ-২-এর উন্নয়ন, পান্ডুতে জাহাজ মেরামত কেন্দ্র এবং পান্ডু বন্দরের সঙ্গে শেষ-মাইল যোগাযোগ ব্যবস্থা।
সোনোয়ালের বক্তব্য, “নদীপথে প্রতি টন পণ্য পরিবহণের অর্থ হল কম জ্বালানি খরচ এবং মহাসড়কে কম ট্রাক চলাচল।” ভারত বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান এবং মায়ানমারের সঙ্গে আঞ্চলিক জলপথ যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
এই ঐতিহাসিক পণ্যবাহী যাত্রার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে Inland Waterways Authority of India (IWAI), Assam Petro-Chemicals, Cochin Bunkers Pvt. Ltd. এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন অংশীদার সংস্থা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অসমের মন্ত্রিসভার সদস্য চরণ বড়ো, বিমল বরা এবং সুশান্ত বরগোহাঁই। ছিলেন রাজ্যসভার সাংসদ তেরাশ গোয়ালা। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন এলাকার বিধায়করা, তাঁদের মধ্যে ছিলেন ডিব্রুগড় বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক প্রশান্ত ফুকন এবং খোয়াং বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক চক্রধর গগৈ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন IWAI-এর চিফ ইঞ্জিনিয়ার এ কে বনসল এবং Assam Petro-Chemicals (APCL)-এর চেয়ারম্যান বিকুল চন্দ্র ডেকা-সহ APCL, IWAI এবং অসম সরকারের বিভিন্ন দফতরের আধিকারিকরা।