দেবকিশোর চক্রবর্তী
বিদায়বেলাতেও উত্তরপূর্ব ভারতের প্রসঙ্গ টেনে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার উপর জোর দিলেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর বিদায়ী ভাষণে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটি কৌশলগত সেতু হিসেবে তুলে ধরতে গিয়ে তিনি ‘সেভেন সিস্টার্স’— অর্থাৎ ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে অতীতের মতোই নতুন করে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিদায়ী ভাষণে ইউনূস বলেন, “আমাদের খোলা সমুদ্র কেবল ভৌগোলিক সীমারেখা নয়— এটি বাংলাদেশের জন্য বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার খোলা দরজা। নেপাল, ভুটান এবং সেভেন সিস্টার্স্কে নিয়ে এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।” তিনি ইঙ্গিত দেন, বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সমুদ্রপথ ও আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা গেলে বাংলাদেশ প্রতিবেশী স্থলবেষ্টিত অঞ্চলগুলির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যদ্বার হয়ে উঠতে পারে।
উত্তরপূর্ব ভারত নিয়ে ইউনূসের মন্তব্য এই প্রথম নয়। গত বছরের মার্চে চিন সফরকালে বিনিয়োগ আহ্বান জানাতে গিয়ে তিনি বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন। সেই সময় তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্যে বিশেষ ভূমিকা নিতে পারে। তাঁর সেই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ভারতে কূটনৈতিক স্তরে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
যদিও ভারত সরকার আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়নি, তবু পরবর্তী সময়ে আঞ্চলিক বৈঠকে বিষয়টি পরোক্ষে উত্থাপিত হয়। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বিমস্টেক শীর্ষ সম্মেলনের পার্শ্ববৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-র সঙ্গে ইউনূসের বৈঠক হয়। পরে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক জানায়, ওই বৈঠকে ‘বাক্সংযম’-এর পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল এবং এমন মন্তব্য এড়িয়ে চলার কথা বলা হয় যা পারস্পরিক সম্পর্কের পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে। যদিও নির্দিষ্ট প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়নি।
এর পরেও ইউনূস উত্তরপূর্ব ভারতকে ঘিরে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সমন্বয়ের পক্ষে মত প্রকাশ অব্যাহত রাখেন। গত বছরের মে মাসে নেপালের পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার ইন্দিরা রানা বাংলাদেশ সফরে গেলে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকেও এই প্রসঙ্গ ওঠে। সেখানে ইউনূস বলেন, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান এবং ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলিকে নিয়ে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে সংশ্লিষ্ট দেশ ও অঞ্চলগুলি আরও বেশি উপকৃত হতে পারে। পৃথক উদ্যোগের বদলে যৌথ আঞ্চলিক কাঠামোর ওপর তিনি জোর দেন।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ইউনূসের বক্তব্য মূলত আঞ্চলিক যোগাযোগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করেই। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের ব্যবহার, সড়ক ও রেল যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতার মতো বিষয়গুলি এতে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। অন্য দিকে, কূটনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল সংক্রান্ত যে কোনও মন্তব্যই সতর্কতার সঙ্গে দেখা হয়।
বিদায়ী ভাষণে ইউনূস তাঁর সরকারের সময়কালে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং আঞ্চলিক অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগকারী সেতু হয়ে উঠতে পারে, যদি পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা জোরদার হয়।
তবে তাঁর সাম্প্রতিক মন্তব্য নতুন করে নয়াদিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে কী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে। আপাতত স্পষ্ট, বিদায়বেলাতেও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সমন্বয়ের প্রশ্নে নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি মুহাম্মদ ইউনূস।