ভেনেজুয়েলায় ধ্বংসস্তূপের নিচে ৬ দিন! তিন বছরের শিশুর অলৌকিক প্রত্যাবর্তনে নতুন আশার আলো, তবু গভীর মানবিক সংকট
কারাকাস:
মৃত্যুর স্তূপের মাঝেও কখনও কখনও জীবন অবিশ্বাস্যভাবে ফিরে আসে। ভেনেজুয়েলার ভয়াবহ যুগ্ম ভূমিকম্পের ছয় দিন পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তিন বছরের শিশু ক্লিয়েবার মোরানকে জীবিত উদ্ধার করেছে জর্ডানের আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল। এই অলৌকিক উদ্ধার শুধু একটি শিশুর প্রাণ বাঁচায়নি, হাজার হাজার নিখোঁজ মানুষের পরিবারের মধ্যেও নতুন করে আশার আলো জ্বালিয়েছে।
উদ্ধারকারী দল জানায়, তাপ-সংবেদনশীল (থার্মাল ইমেজিং) প্রযুক্তির সাহায্যে ধ্বংসস্তূপের নিচে শিশুটির অবস্থান শনাক্ত করা হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কংক্রিট ও ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে তাকে জীবিত বের করা হয়। উদ্ধার হওয়ার পর ঘটনাস্থলেই প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দ্রুত কারাকাসের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, শিশুটির শারীরিক অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল।
ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের প্রেসিডেন্ট জর্জ রদ্রিগেজ বলেন, এই উদ্ধার প্রমাণ করে যে সময় পেরিয়ে গেলেও ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত মানুষের সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না। তিনি উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
গত সপ্তাহে মাত্র এক মিনিটেরও কম ব্যবধানে ৭.২ এবং ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প ভেনেজুয়েলাকে কাঁপিয়ে দেয়। উপকূলীয় লা গুয়াইরা অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা ১,৯০০ ছাড়িয়েছে, আহত হয়েছেন ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ এবং হাজার হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ। প্রায় ৫৯ হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে, ভূমিকম্পের পর এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে স্বাস্থ্য সংকট। ক্ষতিগ্রস্ত ৩৮টি হাসপাতালের অনেকগুলোই আংশিক বা সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে। নিরাপদ পানি, খাদ্য ও চিকিৎসাসেবার ঘাটতির পাশাপাশি হাম, ডেঙ্গু, ডিপথেরিয়া ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
শিশুদের পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছে ইউনিসেফ। সংস্থাটির হিসেবে প্রায় ৬ লাখ ৮০ হাজার শিশু এখন জরুরি মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তায় রয়েছে। ইতোমধ্যে ইউনিসেফ ৪৭ টন জরুরি ত্রাণসামগ্রী ভেনেজুয়েলায় পাঠিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জরুরি স্বাস্থ্য কিট, নিরাপদ প্রসবসেবা, নবজাতকের চিকিৎসা সামগ্রী এবং সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের উপকরণ।
বর্তমানে জর্ডান, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকোসহ বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল প্রশিক্ষিত অনুসন্ধানী কুকুর, থার্মাল সেন্সর, ড্রোন এবং ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের পর প্রথম ৭২ ঘণ্টাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধরা হলেও, ক্লিয়েবার মোরানের মতো অলৌকিক উদ্ধার দেখিয়ে দিল—আশা কখনও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না।