আওয়াজ দ্য ভয়েস
দক্ষিণ ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্য দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিভা, অধ্যবসায় ও সাফল্যের এক উজ্জ্বল নিদর্শন। হায়দ্রাবাদের নাম উচ্চারিত হলেই চারমিনার, সুস্বাদু বিরিয়ানি এবং সমৃদ্ধ ঐতিহ্য-সংস্কৃতির ছবি মনে ভেসে ওঠে। তবে এই ঐতিহাসিক শহরের অলিগলিতে আজ নীরবে গড়ে উঠছে এক নতুন ইতিহাস, যার কেন্দ্রে রয়েছেন মুসলিম নারীরা। তাঁরা পুরোনো সামাজিক রীতিনীতি ও প্রচলিত ধারণার সীমা অতিক্রম করে সাফল্যের নতুন সংজ্ঞা রচনা করছেন। শুধু পরিবার সামলানোতেই নিজেদের সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁরা দেশের অসংখ্য নারীর কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছেন। ‘আওয়াজ দ্য ভয়েস’-এর বিশেষ প্রতিবেদন ‘পরওয়াজ’-এর এই পর্বে তুলে ধরা হয়েছে তেলেঙ্গানার এমন দশজন সাহসী ও সফল নারীর কাহিনি, যাঁরা নিষ্ঠা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছেন। হস্ততাঁত ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ থেকে শুরু করে খাদ্যসংস্কৃতি, চিকিৎসা, ফ্যাশন এবং শিক্ষাক্ষেত্র, বিভিন্ন অঙ্গনে তাঁদের অসাধারণ অবদান আজ সমাজে পরিবর্তনের নতুন বার্তা বহন করছে।
হায়দ্রাবাদ বরাবরই পরিবর্তন ও নবজাগরণের এক অনন্য শহর। এর ঐতিহাসিক স্থাপত্য, জনাকীর্ণ বাজার এবং খ্যাতিমান খাদ্যসংস্কৃতির অন্তরালে এমন কিছু নারী রয়েছেন, যারা নীরবে ঐতিহ্য রক্ষা করছেন, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে জীবন্ত রাখছেন এবং লক্ষ্যনিষ্ঠ উদ্যোগ গড়ে তুলছেন। তাঁদের গল্পের বিস্তার হস্ততাঁত ও হেরিটেজ ওয়াক থেকে শুরু করে মিষ্টান্ন, ডেনিম, শ্রেণিকক্ষ এবং কাউন্সেলিং স্টুডিও পর্যন্ত। পথচলা ভিন্ন হলেও অধ্যবসায় ও দৃঢ় সংকল্পে তাঁরা একসূত্রে গাঁথা। নিজেদের কাজের মাধ্যমে তাঁরা নেতৃত্বের ধারণাকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছেন।
জিনাত পানাহ
জিনাত পানাহ
জিনাত পানাহ ভারতীয় বস্ত্রশিল্পের প্রতি নিজের ভালোবাসাকে দেশের হস্ততাঁত ঐতিহ্য সংরক্ষণের এক মিশনে পরিণত করেছেন। টেক্সটাইল পুনরুজ্জীবন আন্দোলনের পথিকৃৎ সুরাইয়া হাসান আলির অনুপ্রেরণায় তিনি কারিগরদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে ইকাত, কলমকারি, পোচমপল্লী এবং নারায়ণপেট বয়নশৈলীকে আধুনিক ক্রেতাদের উপযোগী করে নতুনভাবে উপস্থাপন করছেন। টেকসই পদ্ধতি ও নৈতিক উদ্যোক্তা মনোভাবের মাধ্যমে তিনি নিশ্চিত করছেন যে প্রাচীন শিল্পরূপগুলো প্রাসঙ্গিক থেকে যাচ্ছে এবং সেই সঙ্গে যেসব সম্প্রদায় এই ঐতিহ্যকে জীবিত রেখেছে, তাদের জীবিকাও সুরক্ষিত হচ্ছে।
আসরা আঞ্জুম
আসরা আঞ্জুম
হায়দ্রাবাদের খাদ্যসংস্কৃতিতে আসরা আঞ্জুম ‘ডাকনি সুইট ট্রিটস’-এর মাধ্যমে এক বিস্মৃত রাজকীয় ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন। ১৯৯৪ সাল থেকে তিনি বাদাম কি জালি, গিল-এ-ফিরদাউস এবং জাউজি হালওয়ার মতো নিজাম আমলের জটিল ও বিরল মিষ্টান্ন সংরক্ষণ করে আসছেন, যেসব রেসিপি একসময় শুধুমাত্র রাজপ্রাসাদের রান্নাঘরেই সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমানে তাঁর মেয়ে নায়না খুন্দমেরির সঙ্গে তিনি এই ভোজ্য ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে স্মরণীয় অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করে চলেছেন।
ফাতিমা হুসনা
ইতিহাসও এক অনন্য রক্ষক পেয়েছে ফাতিমা হুসনার মধ্যে। পুরুষ-প্রধান একটি পেশায় নানা সামাজিক ধারণাকে অতিক্রম করে তিনি হায়দ্রাবাদের অল্পসংখ্যক নারী হেরিটেজ ট্যুর গাইডদের অন্যতম হয়ে উঠেছেন। ডেকান আর্কাইভস এবং তাজ ফালাকনুমা প্যালেসের সঙ্গে কাজের মাধ্যমে তিনি নিজামদের ইতিহাস, স্থাপত্যের বিস্ময় এবং খাদ্যসংস্কৃতির গল্পকে জীবন্ত করে তোলেন। তাঁর কাজ প্রমাণ করে যে ইতিহাস সংরক্ষণ শুধু গবেষণার বিষয় নয়, এটি গল্প বলার শিল্পও।
মালিহা বেগ
মালিহা বেগের জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হয় শিক্ষাক্ষেত্রে সফল কর্মজীবনের পর। বানজারা হিলসের একটি ক্লাউড কিচেন থেকে পরিচালিত তাঁর উদ্যোগ পূর্বপুরুষদের হায়দ্রাবাদি ও মুঘলাই ঐতিহ্যের রেসিপিগুলোকে নতুন করে জনপ্রিয় করেছে। তাঁর কাঠের আগুনে রান্না করা বিরিয়ানি, হালিম এবং কাবাব স্বাদে ও স্মৃতিতে ভরপুর। তিনি মনে করিয়ে দেন, অনেক সময় সেরা খাবার জন্ম নেয় বড় রেস্তোরাঁয় নয়, বরং ভালোবাসা ও স্মৃতিতে ভরা ঘরোয়া রান্নাঘরে।
মোনা আহমেদ
মিষ্টান্ন জগতেও উদ্যোক্তার এক অনন্য গল্প লিখেছেন মোনা আহমেদ ও তাঁর বোন আরশিয়া আহমেদ আইয়ুব। পরিবার ও বন্ধুদের জন্য বেকিং দিয়ে শুরু হওয়া তাঁদের পথচলা আজ ‘ডেজার্ট ফ্যাক্টরি’-কে হায়দ্রাবাদের অন্যতম জনপ্রিয় বিলাসবহুল ডেজার্ট ব্র্যান্ডে পরিণত করেছে। তাঁদের সৃষ্টিগুলোতে যেমন রয়েছে অভিনবত্ব ও সৌন্দর্যের মেলবন্ধন, তেমনি তাঁদের যাত্রা বোনত্ব, সৃজনশীলতা এবং মানের প্রতি অটল প্রতিশ্রুতির শক্তিকেও তুলে ধরে।
নাহিদ মুকিতুল্লা
ফ্যাশনের জগতে নাহিদ মুকিতুল্লা এমন এক সম্ভাবনা খুঁজে পান, যেখানে অন্যরা বাজারের ভিড় দেখেছিলেন। ভাইদের সঙ্গে মিলে ‘আর্বানো’ প্রতিষ্ঠা করে তিনি ডেনিমকে সাধারণ পোশাকের সীমা ছাড়িয়ে এক আকাঙ্ক্ষিত লাইফস্টাইল প্রতীকে পরিণত করেছেন। উদ্যোক্তা-সুলভ দূরদৃষ্টি এবং স্বামী সামির মাসারাথের সমর্থনে নাহিদ ভারতের অন্যতম শীর্ষ অনলাইন ফ্যাশন ব্র্যান্ড গড়ে তুলেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্টাইলেরও বিকাশ হওয়া উচিত।
রুবিনা মাজিদ
শিক্ষাক্ষেত্রে এক শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন রুবিনা মাজিদ। এমবিএ ডিগ্রিধারী রুবিনা শিক্ষকতাকেই নিজের প্রকৃত আহ্বান হিসেবে আবিষ্কার করেন এবং হায়দ্রাবাদে ফিরে এসে হুসাইনি আলমে ‘ Our School 12th Avenue’ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর বিদ্যালয়ে এমন শিশুদের জায়গা রয়েছে, যাদের প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থা প্রায়ই উপেক্ষা করে, গড়পড়তা শিক্ষার্থী, পড়াশোনায় পিছিয়ে থাকা শিশু এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা। অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ও শিক্ষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, প্রকৃত সাফল্য শুধু মেধাতালিকা তৈরি নয়, মানবিক মানুষ গড়ে তোলায় নিহিত।
সাহের আলি
মানসিক সুস্থতার ক্ষেত্রেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এসেছেন সাহের আলি। ‘টোটাম’স স্টুডিও’-র মাধ্যমে এই সমন্বিত মনোবিজ্ঞানী মনোবিজ্ঞান ও আর্ট থেরাপিকে একত্রিত করেছেন। রং, মাটি ও শিল্পচর্চার মাধ্যমে তিনি মানুষকে শোক, মানসিক চাপ এবং ট্রমা মোকাবিলায় সাহায্য করেন। তাঁর বহুমাত্রিক পদ্ধতি মানুষকে নিরাপদ পরিসরে আত্মপ্রকাশ ও মানসিক পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেয়।
জিনাত বেগম
এরপর রয়েছেন জিনাত বেগম, যার জীবনগাথা দৃঢ়তার এক অনন্য উদাহরণ। গৃহিণী থেকে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পেছনে ছিল ব্যক্তিগত ও আর্থিক সংকট, যা তাঁর পরিবারের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছিল। আজ তাঁর উদ্যোগ ‘মালাবার পরোটা ৯৯’ বহু মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করছে এবং প্রতিদিন হাজার হাজার গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ব্যবসায়িক সাফল্য নয়; বরং এমন একটি বৃদ্ধাশ্রম গড়ে তোলা, যেখানে অবহেলিত বাবা-মায়েরা আশ্রয় ও মর্যাদা পাবেন।
আমাল আয়ুব
সবশেষে রয়েছেন আমাল আয়ুব, যিনি ‘ব্রাইডালবাগ.কো’-এর মাধ্যমে উদযাপনকে এক নিমগ্ন অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করেছেন। ইভেন্ট ডিজাইনে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজের অন্তর্দৃষ্টি, গবেষণা এবং নিখুঁত পরিকল্পনার মাধ্যমে হায়দ্রাবাদের অন্যতম জনপ্রিয় বিলাসবহুল বিবাহ-আয়োজন সংস্থা গড়ে তুলেছেন। ঘরোয়া অনুষ্ঠান থেকে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন, সব ক্ষেত্রেই তিনি এমন স্মৃতি সৃষ্টি করেন, যা উৎসব শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন মনে থাকে।
একসঙ্গে এই নারীরা আধুনিক হায়দ্রাবাদের বহুমাত্রিক পরিচয়কে তুলে ধরেন। তাঁরা হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য সংরক্ষণ করছেন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন, সম্প্রদায়কে শক্তিশালী করছেন এবং সাফল্যের প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে লিখছেন। তাঁদের গল্প মনে করিয়ে দেয়, উদ্যোক্তার সাফল্য সবসময় মুনাফা বা বিস্তারের মাপকাঠিতে বিচার করা যায় না।
কখনও তা লুকিয়ে থাকে একটি পুরোনো রেসিপি সংরক্ষণে, কখনও বিস্মৃতপ্রায় হস্তশিল্পকে নতুন জীবন দেওয়ায়, কখনও সংগ্রামী এক শিশুকে শিক্ষার আলো দেখানোয়, কখনও আহত মনকে সুস্থতার পথ খুঁজে পেতে সাহায্য করায়, আবার কখনও নিশ্চিত করায় যে কোনও ঐতিহ্য বা উত্তরাধিকার যেন হারিয়ে না যায়।এই নারীদের সম্মান জানানোর মধ্য দিয়ে আমরা এমন এক হায়দ্রাবাদকেও উদযাপন করি, যে শহর তার ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধা জানিয়ে একই সঙ্গে সাহসিকতার সঙ্গে ভবিষ্যতের পথ নির্মাণ করে চলেছে