বিশ্বকাপ এলেই জেগে ওঠে ‘এক টুকরো ব্রাজিল’, বাবা-ছেলের স্বপ্নে গড়া জলপাইগুড়ির ব্রাজিল হাউস

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Aparna Das • 20 h ago
বিশ্বকাপ এলেই জেগে ওঠে ‘এক টুকরো ব্রাজিল’, বাবা-ছেলের স্বপ্নে গড়া জলপাইগুড়ির ব্রাজিল হাউস
বিশ্বকাপ এলেই জেগে ওঠে ‘এক টুকরো ব্রাজিল’, বাবা-ছেলের স্বপ্নে গড়া জলপাইগুড়ির ব্রাজিল হাউস
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ

বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই আবেগ, উন্মাদনা আর প্রিয় দলের প্রতি অগাধ ভালোবাসার প্রকাশ। বাংলার ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এই আবেগ নতুন কিছু নয়। তবে সেই আবেগ যখন একটি বাড়ির দেওয়াল, রঙ, আলো আর পারিবারিক সম্পর্কের সঙ্গে মিশে যায়, তখন তা হয়ে ওঠে এক অনন্য গল্প। জলপাইগুড়ি শহরের মাসকালাইবাড়ি সংলগ্ন একটি বাড়ির গল্পও ঠিক তেমনই। স্থানীয়দের কাছে যার পরিচয়, ‘ব্রাজিল হাউস’।
 
কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপ ঘিরে যখন সারা পৃথিবী ফুটবল জ্বরে কাঁপছে, তখন তার রেশ এসে পৌঁছেছে উত্তরবঙ্গের এই ছোট্ট পাড়াতেও। দূর থেকে চোখে পড়ে হলুদ-সবুজ রঙে মোড়া বাড়িটি। মনে হয় যেন জলপাইগুড়ির বুকেই দাঁড়িয়ে আছে ব্রাজিলের এক টুকরো অংশ। বিশ্বকাপ এলেই এই বাড়ি হয়ে ওঠে স্থানীয়দের কৌতূহল ও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
 
ব্রাজিল হাউস
 
এই বাড়ির মালিক রঞ্জন পাল। ছোটবেলা থেকেই তিনি ব্রাজিল ফুটবল দলের অন্ধভক্ত। তাঁর কাছে ফুটবল শুধুমাত্র একটি খেলা নয়, এটি জীবনের এক আবেগ, এক অনুভূতি। ব্রাজিলের খেলা মানেই তাঁর কাছে উৎসব। সেই ভালোবাসার প্রকাশ ঘটাতেই তিনি ২০১১ সালে নিজের বাড়িকে ব্রাজিলের পতাকার হলুদ ও সবুজ রঙে সাজিয়ে তোলেন। তারপর থেকে প্রতি বিশ্বকাপেই নতুন করে সেজে ওঠে ‘ব্রাজিল হাউস’।
 
তবে এই গল্পের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অধ্যায় লুকিয়ে আছে তাঁর ছেলে রিজুকে ঘিরে। বিশেষভাবে সক্ষম রিজু মাঠে নেমে ফুটবল খেলতে পারে না। কিন্তু ফুটবলের প্রতি তার ভালোবাসা কোনও অংশে কম নয়। টেলিভিশনের সামনে বসে প্রিয় দলের খেলা দেখা, খেলোয়াড়দের চিনে রাখা, গোল হলে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠা, এসবই তার জীবনের অন্যতম বড় আনন্দ। ছেলের সেই আনন্দকে আরও রঙিন করে তুলতেই রঞ্জনবাবু একদিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নিজের বাড়িটাকেই ব্রাজিলের রঙে রাঙিয়ে দেবেন।
 
ছেলে রিজু ফোনে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখতে মগ্ন
 
সেই সিদ্ধান্তই আজ জলপাইগুড়ির অন্যতম পরিচিত আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। বিশ্বকাপ এলেই বাড়ির চারপাশে উড়তে থাকে ব্রাজিলের অসংখ্য পতাকা। লাগানো হয় রঙিন আলোর মালা। ফুটবলের প্রতীক, ব্যানার, পোস্টার ও বিভিন্ন সাজসজ্জায় উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকাজুড়ে। বাড়ির সামনে দাঁড়ালেই বোঝা যায়, এটি শুধুমাত্র একটি বাড়ি নয়, এটি এক পরিবারের স্বপ্ন, ভালোবাসা এবং আবেগের বহিঃপ্রকাশ।
 
রঞ্জনবাবুর স্ত্রীও এই উদ্যোগের সমান অংশীদার। পরিবারের তিন সদস্য মিলে প্রতি বিশ্বকাপের আগে নতুন করে বাড়ি সাজানোর পরিকল্পনা করেন। আর সেই প্রস্তুতি দেখতে দেখতে আনন্দে মেতে ওঠে পাড়ার মানুষও।
 
শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নন, আশেপাশের এলাকা থেকে বহু মানুষ বিশেষভাবে এই বাড়ি দেখতে আসেন। কেউ ছবি তোলেন, কেউ ভিডিও করেন, আবার কেউ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বাড়িটির সৌন্দর্য উপভোগ করেন। পথচলতি মানুষও একবার না তাকিয়ে পারেন না। শিশু থেকে প্রবীণ, ৮ থেকে ৮০, সকলেই মুগ্ধ হন এই বাড়ির গল্প শুনে।
 
সস্ত্রীক রঞ্জন পাল ও রঞ্জনবাবুর স্ত্রী
 
বিশ্বকাপের সময় ‘ব্রাজিল হাউস’ যেন হয়ে ওঠে এক মিলনমেলা। প্রতিবেশীরা একসঙ্গে খেলা দেখেন, প্রিয় দলের জয়-পরাজয় নিয়ে আলোচনা করেন। ফুটবলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এক অন্যরকম সামাজিক বন্ধন। এখানে দলগত সমর্থনের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে মানুষের মধ্যে সম্পর্ক এবং আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার সংস্কৃতি।
 
আধুনিক জীবনের ব্যস্ততার মধ্যে যেখানে মানুষ ক্রমশ একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, সেখানে এই বাড়ি মনে করিয়ে দেয়, ভালোবাসা ও আবেগ এখনও মানুষকে একসূত্রে বাঁধতে পারে। বিশেষভাবে সক্ষম সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য এক বাবার উদ্যোগ আজ একটি পাড়ার গর্ব, একটি শহরের পরিচয় হয়ে উঠেছে।
 

জলপাইগুড়ির ‘ব্রাজিল হাউস’ তাই শুধু ফুটবলপ্রেমের প্রতীক নয়। এটি বাবা-ছেলের গভীর সম্পর্কের গল্প, একটি পরিবারের স্বপ্নের গল্প এবং মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিশ্বকাপ এলেই হলুদ-সবুজ রঙে সেজে ওঠা বাড়িটি যেন নতুন করে বলে যায়, ভালোবাসার কোনও সীমানা নেই। আর সেই ভালোবাসাই কখনও কখনও একটি সাধারণ বাড়িকে পরিণত করে হাজার মানুষের অনুপ্রেরণার ঠিকানায়।


শেহতীয়া খবৰ