স্বাস্থ্যসেবাকে মানবসেবার রূপ দিয়েছেন মুসরেফা হোসেন, শিক্ষা, উদ্যোগ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Aparna Das • 1 h ago
মুসরেফা হোসেন
মুসরেফা হোসেন
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ

বাংলায় নারী উদ্যোক্তাদের সাফল্যের কথা উঠলে সাধারণত ফ্যাশন, হস্তশিল্প বা ক্ষুদ্র ব্যবসার উদাহরণই বেশি শোনা যায়। কিন্তু এমনও একজন মুসলিম নারী রয়েছেন, যিনি স্বাস্থ্য পরিষেবার মতো জটিল ও চ্যালেঞ্জিং ক্ষেত্রে নিজের দক্ষতা, দূরদৃষ্টি এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে এক অনন্য পরিচয় গড়ে তুলেছেন। তিনি মুসরেফা হোসেন, কলকাতার GD Hospital & Diabetes Institute-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য (Founder-Member) এবং প্রধান নির্বাহী আধিকারিক (CEO)। 
 
কলকাতায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা মুসরেফা হোসেনের শিক্ষাজীবন শুরু হয় La Martiniere for Girls-এ। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ছিল প্রবল। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ইংল্যান্ডে পাড়ি দেন। University of Sheffield থেকে Biomaterial Science and Tissue Engineering-এ স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি নিজের বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন। এরপর বিশ্বের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান University of Cambridge-এ Bioscience Enterprise-এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন এবং ক্যামব্রিজ কমনওয়েলথ স্কলার হিসেবেও স্বীকৃতি লাভ করেন। 
 
 
বিদেশে উচ্চশিক্ষা শেষে তিনি সহজেই আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মজীবন গড়ে তুলতে পারতেন। কিন্তু তিনি দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। সেই লক্ষ্য নিয়েই ২০১০ সালে তিনি GD Hospital & Diabetes Institute-এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং হাসপাতালটিকে পূর্ব ভারতের অন্যতম আধুনিক ডায়াবেটিস ও বহুমুখী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পরিণত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন।
 
মুসরেফা হোসেনের নেতৃত্বে হাসপাতালটি শুধু চিকিৎসা পরিষেবার মানই উন্নত করেনি, রোগীকেন্দ্রিক পরিষেবা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দক্ষ চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বয়ে একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি একাধিক জাতীয় স্বীকৃতিও অর্জন করেছে। 
 
তবে একজন উদ্যোক্তা হিসেবে তাঁর সাফল্যের সবচেয়ে বড় দিক হলো সামাজিক দায়বদ্ধতা। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, উন্নত চিকিৎসা শুধু শহরের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। তাই তাঁর উদ্যোগে মুর্শিদাবাদসহ গ্রামীণ এলাকায় বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, চক্ষু শিবির, ডায়াবেটিস সচেতনতা কর্মসূচি এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিষেবার বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগও তাঁর সমাজসেবামূলক কাজের অন্যতম দৃষ্টান্ত। 
 
 
বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস উপলক্ষে তাঁর নেতৃত্বে কলকাতাজুড়ে সচেতনতা অভিযান, মোবাইল স্ক্রিনিং ইউনিট এবং জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। এই উদ্যোগের মাধ্যমে বহু মানুষ বিনামূল্যে ডায়াবেটিস পরীক্ষা করানোর সুযোগ পান এবং রোগ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা লাভ করেন। 
 
ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি তাঁর কাজ বিভিন্ন মহলেও স্বীকৃতি পেয়েছে। Economic Times তাঁকে "Best Entrepreneur in Healthcare" সম্মানে ভূষিত করেছে। এছাড়া Times Business Award-এ "Most Enterprising CEO in the Healthcare Industry" এবং স্বাস্থ্যক্ষেত্রে কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার জন্য একাধিক সম্মান লাভ করেছেন।
 
মুসরেফা হোসেনের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটাই, উদ্যোক্তা হওয়া মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা নয়; সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক শিক্ষা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং মানবিক মূল্যবোধকে একসূত্রে গেঁথে তিনি দেখিয়েছেন, একজন মুসলিম নারীও দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নেতৃত্ব দিয়ে হাজার হাজার মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেন।
 
 
আজকের প্রজন্মের কাছে মুসরেফা হোসেন কেবল একজন সফল সিইও নন; তিনি এমন এক নারী, যিনি প্রমাণ করেছেন, জ্ঞান, দূরদৃষ্টি এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা একসঙ্গে থাকলে উদ্যোক্তা হওয়া মানেই মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার শক্তি অর্জন করা। তাঁর এই পথচলা নিঃসন্দেহে পশ্চিমবঙ্গের তরুণ-তরুণী, বিশেষ করে মুসলিম নারীদের জন্য এক উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা।