গৃহহিংসা ও অপরাধের শিকার নারীর ন্যায়ের জন্য পাঞ্জাবে শাহী ইমাম মৌলানা উসমান লুধিয়ানভীর বৃহৎ অভিযান

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 1 d ago
শাহী ইমাম মৌলানা উসমান লুধিয়ানভী
শাহী ইমাম মৌলানা উসমান লুধিয়ানভী
 
নয়া দিল্লি 

পঞ্জাবে নারীদের বিরুদ্ধে গৃহহিংসা ও নানা ধরনের অপরাধ যেভাবে বেড়ে চলেছে, তা আজ গোটা সমাজের সামনে এক গভীর মানবিক সংকট হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এই অন্ধকার বাস্তবতার মধ্যে ন্যায় ও সাহসের বার্তা নিয়ে সামনে এসেছেন পঞ্জাবের শাহী ইমাম মৌলানা উসমান লুধিয়ানভী। সামাজিক নীরবতা ভেঙে নারীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায় নিশ্চিত করতে তিনি রাজ্যজুড়ে এক বৃহৎ সচেতনতা ও প্রতিবাদ অভিযানের ঘোষণা করেছেন, যা সমাজ, ধর্ম ও রাজনীতির সীমারেখা ছাড়িয়ে মানুষের বিবেককে নাড়া দিতে চায়।
 
পঞ্জাবের শাহী ইমাম মৌলানা উসমান লুধিয়ানভীর এই অভিযান শীঘ্রই তাঁর নিজ শহর লুধিয়ানা থেকে শুরু হবে। নিজের পরিকল্পনা প্রকাশ করে মৌলানা উসমান লুধিয়ানভী বলেন, “সমাজে ক্রমাগতভাবে গৃহহিংসার ঘটনা বাড়ছে এবং নারীরা পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনদের হাতেই সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।”
 
একটি ভিডিও বার্তায় শাহী ইমাম বলেন, তিনি চান এই বিষয়টি রাজনৈতিক ও ধর্মীয়, উভয় আলোচনার অংশ হয়ে উঠুক।
 
এক অনুষ্ঠানে ভাষণ দিচ্ছেন শাহী ইমাম মৌলানা উসমান লুধিয়ানভী
 
তিনি বলেন, “নারীরা তাঁদের নিজের ঘরের মধ্যেই সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধের মুখোমুখি হচ্ছেন এবং এই প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। বহু সময়ে ভুক্তভোগীদের সমাজ তো বটেই, এমনকি তাঁদের নিজের পরিবারও নীরব থাকতে বাধ্য করে এবং কোনও পদক্ষেপ নিতে দেয় না।”
 
তিনি জানান, তাঁর অভিযানের লক্ষ্য হলো সমাজের এই নীরবতা ভাঙা এবং নারীদের সহায়তা করা, যাতে এই ধরনের অপরাধের জন্য দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করা যায়।
 
মৌলানা উসমান লুধিয়ানভী স্পষ্ট করে বলেন, “পুলিশ ও প্রশাসনের সহযোগিতায় এই অভিযান চালানো হবে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ, স্কুল ও কলেজের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক, সামাজিক সংগঠন এবং রাজনৈতিক দলগুলিও এতে যুক্ত থাকবে।”
 
ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (NCRB)-র সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পঞ্জাবে নারীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের সংখ্যা ৭ শতাংশ কমেছে। তবে মৌলানা জানান, পরিস্থিতি এখনও গুরুতরই রয়েছে।
 
২০২১ সালে পঞ্জাবে নারীদের বিরুদ্ধে ৫,৬৬২টি অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল, যা ২০২৩ সালে কমে ৫,২৫৮টিতে দাঁড়িয়েছে। রাজ্যে নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধের হার ছিল ৩৫.৯ শতাংশ, যা জাতীয় গড় ৬৬.২ শতাংশের তুলনায় কম। তবুও তিনি বলেন, “এটিকে সন্তোষজনক বলা যায় না। প্রতি ১ লক্ষ মহিলা জনসংখ্যার বিপরীতে নথিভুক্ত অপরাধের সংখ্যার ভিত্তিতেই অপরাধের হার নির্ধারণ করা হয়।”
 
সম্প্রতি জলন্ধরে এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যা করার ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে বলে শাহী ইমাম উল্লেখ করেন।
 
মৌলানা উসমান লুধিয়ানভী বলেন, অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা পঞ্চায়েতের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে অভিযুক্তদের সঙ্গে আপস করতে বাধ্য করে এবং অপরাধীদের রক্ষা করে। তিনি বলেন, “এই অভিযান নিশ্চিত করবে যাতে এমন ঘটনা না ঘটে এবং আইন ভুক্তভোগীদের ন্যায় দিতে পারে।”
 
পঞ্জাবের শাহী ইমাম মৌলানা উসমান লুধিয়ানভী পুলিশের সঙ্গে প্রস্তাব ভাগ করার একটি দৃশ্য
 
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ আধিকারিকদের উপস্থিতিতে মৌলানা উসমান লুধিয়ানভী ২০২৬ সালের অভিযানের কথা ঘোষণা করছেন। ভিডিওতে তিনি বলেন, “ধর্ম, জাতি ও রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে যাওয়াই বর্তমান সময়ের প্রয়োজন, যাতে মানুষ নারীর সুরক্ষা ও মর্যাদার জন্য একত্রিত হতে পারে। এই অভিযান লুধিয়ানা থেকে শুরু হবে এবং পরে সমগ্র পঞ্জাবে ছড়িয়ে পড়বে।”
 
মৌলানা স্পষ্ট করেন, এই অভিযানে গৃহহিংসা, নারীদের ওপর নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো বিষয়গুলিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। তিনি বলেন, “মা, বোন ও কন্যারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এই বিষয়টিকে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় রঙ দিয়ে উপেক্ষা করা উচিত নয়। সমাজের সব স্তরের মানুষকে একত্রিত হয়ে এই অপরাধের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে হবে।”
 
তিনি আরও বলেন, স্কুল ও কলেজের মাধ্যমে যুবসমাজকে সংবেদনশীল ও সক্রিয় করে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর।
 
এছাড়াও ধর্মভিত্তিক ঘৃণা রুখতে এবং তা ছড়ানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও তিনি ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, “ধর্ম শুধু বিশ্বাসের বিষয় নয়, ভাল চরিত্র গঠনেরও বিষয়।” তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, কিছু মানুষ ধর্মের অপব্যবহার করে ঘৃণা, হিংসা ও বিভাজন ছড়াচ্ছে, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিশু ও নারীদের ওপর।
 
ধর্মের নামে সংঘটিত গণহত্যা ও হিংসাত্মক ঘটনাগুলিকে দেশজুড়ে ভয়াবহ উদ্বেগের বিষয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি স্কুল ও কলেজের যুবক-যুবতীদের সঙ্গে মানবতার মূল্যবোধ, সহনশীলতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা নিয়ে আলোচনা করে সচেতনতা তৈরির পরিকল্পনা করেছেন।
 
মৌলানা উসমান লুধিয়ানভী একজন সক্রিয় ধর্মীয় নেতা হিসেবে পরিচিত, যিনি শুধু গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়ে মত প্রকাশই করেন না, বরং মানুষের সহায়তার জন্য বাস্তব উদ্যোগও গ্রহণ করে থাকেন।
 
বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে তাঁর বক্তব্য অতীতে সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছিল। সাম্প্রতিককালে পঞ্জাবে বন্যার সময় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ত্রাণ ও সাহায্য কার্যক্রমের আয়োজনও করেছিলেন তিনি।