দেবকিশোর চক্রবর্তী
সোশ্যাল মিডিয়ায় লাগাতার কটাক্ষ ও ব্যক্তিগত আক্রমণের জেরে বড় সিদ্ধান্ত নিলেন জনপ্রিয় গায়িকা ইমন চক্রবর্তী। ফেসবুক লাইভে এসে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি আর সোশ্যাল মিডিয়ায় থাকতে চান না। মানসিকভাবে ভেঙে পড়া শিল্পীর অভিযোগ, তাঁর প্রয়াত মাকে নিয়েও অশালীন মন্তব্য করা হয়েছে—যা তিনি কোনওভাবেই মেনে নিতে পারছেন না।
সম্প্রতি রাজ্য সরকারের একটি অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করা নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েন ইমন। সেই ঘটনার পর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে লক্ষ্য করে সমালোচনা, ব্যঙ্গ এবং কটাক্ষের ঝড় ওঠে। তবে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল মোড় নেয়, যখন তাঁর মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে করা একটি পোস্টে কুরুচিকর মন্তব্য করা হয়।
ফেসবুক লাইভে আবেগপ্রবণ ইমন জানান, “আমি একজন সঙ্গীতশিল্পী। আমি বিভিন্ন ধরনের গান গাই—রবীন্দ্রসঙ্গীত থেকে শুরু করে প্লেব্যাক, বিভিন্ন ভাষার গান। আমাকে যে গান গাইতে বলা হয়েছে, আমি পেশাদারিত্বের জায়গা থেকে তা গেয়েছি। এতে আপত্তির কী আছে বুঝতে পারছি না।”
তিনি আরও বলেন, তাঁর পরিবারের কোনও আপত্তি নেই তাঁর কাজ নিয়ে, অথচ অচেনা মানুষজন সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে আক্রমণ করছেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে তাঁর মাকে নিয়ে কুরুচিকর মন্তব্য থেকে। “আমার মায়ের মৃত্যুদিনে এমন মন্তব্য করা হয়েছে, যা আমাকে সারারাত ঘুমোতে দেয়নি। আমি অসুস্থ বোধ করছি,”—বলেন ইমন।
লাইভে হাতজোড় করে তিনি আবেদন জানান, ব্যক্তিগত পরিসরে যেন কেউ আঘাত না করেন। “আমার কী পরব, কী খাব, কার সঙ্গে মিশব—এসব নিয়ে কারও বলার অধিকার নেই। আমার মাকে টেনে নামানো হয়েছে, এটুকু আমি নিতে পারছি না,”—কণ্ঠে স্পষ্ট ক্ষোভ তাঁর।
এই ঘটনার পরই তিনি সিদ্ধান্ত নেন সোশ্যাল মিডিয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার। একইসঙ্গে তিনি জানিয়ে দেন, কেউ যদি তাঁর গান না শুনতে চান, তাতেও তাঁর আপত্তি নেই।বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া ইমনের এই ঘোষণার পর বিনোদন জগত থেকে শুরু করে সাধারণ নেটিজেনদের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে।
টলিউডের একাংশের শিল্পীরা ইমনের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের মতে, মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিশেষ করে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কুরুচিকর মন্তব্য, কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একাধিক শিল্পী সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন, “সমালোচনা হোক কাজ নিয়ে, মানুষকে নয়।”
অন্যদিকে, কিছু নেটিজেনের বক্তব্য, জনসমক্ষে থাকা ব্যক্তিত্বদের সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়ই। যদিও তারাও স্বীকার করেছেন, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে মন্তব্য করা সীমা ছাড়িয়ে যায়।মনোবিদদের একাংশ এই ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। তাঁদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ার নেতিবাচকতা ক্রমশ শিল্পী ও জনমানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলছে। নিয়ন্ত্রণহীন ট্রোলিং অনেক ক্ষেত্রেই উদ্বেগ, অনিদ্রা এবং মানসিক ক্লান্তির কারণ হয়ে উঠছে।
সাধারণ মানুষের মধ্যেও সহানুভূতির সুর শোনা গিয়েছে। অনেকেই মন্তব্য করেছেন, “শিল্পীরা মানুষ, তাঁদেরও ব্যক্তিগত অনুভূতি আছে,” এবং “সমালোচনা ও অসম্মানের মধ্যে পার্থক্য থাকা উচিত।”সব মিলিয়ে, ইমন চক্রবর্তীর এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি ব্যক্তিগত পদক্ষেপ নয়, বরং সোশ্যাল মিডিয়ায় শালীনতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।