নাবালিকার প্রসব হলেই স্বামীর জেল! পার পাবেন না পুরোহিত-কাজিও, কড়া বার্তা রাজ্যের

Story by  Debkishor Chakraborty | Posted by  Sudip sharma chowdhury • 4 h ago
প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি
প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি
 
দেবকিশোর চক্রবর্তী 

নাবালিকা বিয়ে রুখতে এবার আরও কঠোর রাজ্য সরকার। শুধু নাবালিকার বিয়ে দেওয়া নয়, সেই বিয়ের পর অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সন্তান প্রসবের ঘটনা সামনে এলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও কড়া আইনি পদক্ষেপের বার্তা দেওয়া হয়েছে। নাবালিকার স্বামী থেকে শুরু করে বিয়ের আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি, এমনকি আইন না মেনে বিয়ে সম্পন্ন করা পুরোহিত বা কাজিও তদন্তের আওতায় আসতে পারেন। ফলে সামাজিক রীতি বা পারিবারিক সম্মতির আড়ালে নাবালিকা বিয়ে দেওয়ার দিন কার্যত শেষ—এমনই বার্তা প্রশাসনের।
 
সোমবার নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, নাবালিকা বিয়ে এবং সন্তানের প্রসবের ঘটনায় সরকার কঠোর অবস্থান নেবে। আইন থাকলেও তা মানা হচ্ছে না—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এবার সেই আইনের বাস্তব প্রয়োগেই জোর দিতে চাইছে প্রশাসন। সরকারি তথ্য ও সাম্প্রতিক রিপোর্টে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের সন্তান প্রসবের ঘটনা সামনে আসায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
 
স্বাস্থ্য দফতরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত রাজ্যে প্রায় ৬০ হাজার নাবালিকা সন্তানের জন্ম দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংখ্যাটি সামনে আসতেই প্রশ্ন উঠছে, এত অল্প বয়সে কীভাবে তারা মাতৃত্বের মুখোমুখি হচ্ছে? এর পিছনে কতগুলি ঘটনা নাবালিকা বিয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, আর কতগুলি অন্য কারণে ঘটেছে—তা পৃথকভাবে খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
 
তবে প্রশাসনের কাছে বিষয়টি নিছক পরিসংখ্যান নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি মেয়ের শৈশব, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ। অল্প বয়সে বিয়ে এবং মাতৃত্বের ফলে একটি কিশোরীকে যে শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয়, তা নিয়ে চিকিৎসক এবং শিশু অধিকার কর্মীদের মধ্যেও দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে।
 
প্রশাসনিক মহলের প্রতিক্রিয়া, নাবালিকা বিয়ে বন্ধ করতে শুধু সচেতনতা প্রচার করলেই হবে না, আইন ভাঙলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নজিরও তৈরি করতে হবে। কারণ একটি ঘটনায় ব্যবস্থা না নিলে অন্যত্র একই ধরনের প্রবণতা উৎসাহ পেতে পারে। তাই অভিযোগ পাওয়া মাত্র বয়সের প্রমাণ, বিয়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং পরবর্তী পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
 
আইনজীবীদের একাংশের মতে, নাবালিকা বিয়ের ক্ষেত্রে শুধু বরকে দায়ী করলেই বিষয়টি শেষ হয় না। বিয়ে আয়োজন, সহায়তা বা সম্পন্ন করার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা যদি আইনভঙ্গের পর্যায়ে পড়ে, তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধেও প্রযোজ্য আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বয়সের নথি যাচাই না করে বিয়ে দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তে আসতেই পারে।
এই জায়গাতেই সামনে আসছে পুরোহিত ও কাজিদের ভূমিকার প্রশ্ন। কোনও মেয়ের প্রকৃত বয়স জানা সত্ত্বেও আইন অমান্য করে বিয়ে সম্পন্ন করা হয়েছে কি না, তা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। প্রশাসনের বার্তা, “নাবালিকার বিয়ে করিয়ে দিয়ে পরে দায় এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।”শিশু অধিকার কর্মীদের প্রতিক্রিয়াতেও উঠে এসেছে একই কথা। তাঁদের মতে, নাবালিকা বিয়ে বন্ধ করার লড়াইকে শুধু পুলিশের অভিযান হিসেবে দেখলে চলবে না। স্কুল, পরিবার, পঞ্চায়েত, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং স্থানীয় প্রশাসন—প্রত্যেক স্তরে নজরদারি বাড়াতে হবে। কোনও কিশোরী হঠাৎ স্কুলছুট হলে কিংবা তার বিয়ের তোড়জোড় শুরু হলে দ্রুত হস্তক্ষেপ করতে পারলেই অনেক ঘটনা আটকানো সম্ভব।
 
অন্যদিকে চিকিৎসক মহলের বক্তব্য, অল্প বয়সে গর্ভধারণ একজন কিশোরীর জন্য বাড়তি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে নাবালিকা বিয়ে প্রতিরোধ মানে শুধু একটি বেআইনি বিয়ে আটকানো নয়, একই সঙ্গে একজন কিশোরীর স্বাস্থ্য ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।প্রতিবেদনে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য হিসেবে যে কঠোর অবস্থানের কথা উঠে এসেছে, তার মূল সুর—আইন ভাঙলে দ্রুত ব্যবস্থা। তিনি স্পষ্ট করেছেন, যে পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা দ্রুতই নেওয়া হবে। প্রশাসনের এই অবস্থানকে ইতিবাচক বলেই মনে করছেন শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা বহু মানুষ। তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি যদি আইন প্রয়োগও কঠোর হয়, তাহলে নাবালিকা বিয়ের প্রবণতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
 
আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সি মেয়ের বিয়ে আইনত নিষিদ্ধ। আবার অপ্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশের ফৌজদারি ও শিশু সুরক্ষা আইনের কঠোর বিধান রয়েছে। ফলে “পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে হয়েছে”—এই যুক্তি দেখিয়ে আইনি দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, শুধুমাত্র শাস্তি দিয়ে সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান সম্ভব নয়। দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, স্কুলছুট হওয়া এবং পরিবারের ভুল ধারণা—এই কারণগুলিও নাবালিকা বিয়ের পিছনে কাজ করে। তাই কঠোর আইনের পাশাপাশি কিশোরীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং পরিবারগুলির মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর কাজও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
 
সব মিলিয়ে রাজ্য সরকারের নতুন বার্তা স্পষ্ট—নাবালিকার বিয়ে আর কোনওভাবেই “পারিবারিক ব্যাপার” বলে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। নাবালিকার প্রসবের ঘটনা সামনে এলে ঘটনার পেছনের কারণ খতিয়ে দেখা হবে, আর আইন ভাঙার প্রমাণ মিললে স্বামী থেকে শুরু করে বিয়ের সঙ্গে যুক্ত অন্য ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
 
একটি কিশোরীর হাতে বই থাকার কথা, বিয়ের মালা নয়; তার চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন থাকার কথা, মাতৃত্বের চাপ নয়। সেই শৈশব এবং ভবিষ্যৎ রক্ষা করাই এখন প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


শেহতীয়া খবৰ