অদম্য সাহস ও প্রগতির প্রতীক: ড. বেনজির তাম্বোলির অনন্য জীবনসংগ্রাম

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 5 h ago
ড. বেনজির তাম্বোলি
ড. বেনজির তাম্বোলি
 
সমীর ডি শেখ 

ভারতীয় সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে সমান অধিকারের নিশ্চয়তা দিয়েছে। সমান সুযোগ, ন্যায়বিচার এবং আইনি সুরক্ষার এই আদর্শকে বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যেই কাজ করে চলেছেন ড. বেনজির তাম্বোলি। সমাজের পিছিয়ে পড়া ও প্রান্তিক মানুষের কল্যাণে, বিশেষ করে মুসলিম নারীদের অধিকার রক্ষায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিরলস সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর জীবন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনের এক দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিচ্ছবি।
 
প্রগতিশীল চিন্তাধারায় গড়ে ওঠা এক পরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠা বেনজির ছোটবেলা থেকেই স্বাধীনতা, সমতা এবং মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা পেয়েছেন। তাঁর পরিবার মুসলিম সত্যশোধক মণ্ডলের প্রতিষ্ঠাতা হামিদ দলওয়াই-এর আদর্শে প্রভাবিত ছিল এবং তাঁর বাবা ইলাহী মোমিনও দলওয়াইয়ের সঙ্গে কাজ করতেন। ফলে শৈশব থেকেই সমাজ সংস্কার ও যুক্তিবাদী চিন্তার পরিবেশ তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে।
 
ড. বেনজির তাম্বোলি
 
বিবাহিত জীবনে বেনজিরকে বহু প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। শ্বশুরবাড়ির পরিবেশ ছিল অনেক বেশি রক্ষণশীল ও ধর্মীয়ভাবে গোঁড়া, যা তাঁর প্রগতিশীল ও মুক্তচিন্তার পারিবারিক শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। এই আদর্শগত পার্থক্য থেকেই নানা জটিলতার সৃষ্টি হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে।
 
এই সময়টা তাঁর জীবনের অত্যন্ত কঠিন অধ্যায় ছিল। কিন্তু বেনজির হার মানেননি। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে নিজের পায়ে দাঁড়াবেন। তিনি স্মরণ করে বলেন, “ছোটবেলা থেকেই নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার ওপর আমার বিশ্বাস ছিল এবং বাবার কাছ থেকে পাওয়া লড়াই করার মানসিকতাও ছিল... যা-ই ঘটুক না কেন, ভয় পেলে চলবে না, কোনো না কোনো পথ বের করতেই হবে, লড়াই চালিয়ে যেতে হবে, এই মনোভাব নিয়েই আমি সব সমস্যার মোকাবিলা করেছি।”
 
বিবাহবিচ্ছেদের পর তিনি ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের কোর্স সম্পন্ন করেন এবং কাপড় সেলাইয়ের কাজ শুরু করেন। এই কাজে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত করে তিনি আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার পথে এগিয়ে যান। তিনি বলেন, “নিজের ছোটখাটো প্রয়োজনের জন্যও যেন কারও কাছে হাত পাততে না হয়... নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য কী করা যায়, সেই ভাবনাই আমাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।” এই সংগ্রাম কেবল আর্থিক ছিল না, মানসিক দিক থেকেও ছিল অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু তিনি সেখান থেকেও নিজের পথ খুঁজে নেন। পরবর্তীকালে তিনি প্রভাষকের পদে সাক্ষাৎকার দেন এবং সেখানেও সফলতা অর্জন করেন।
 
ড. বেনজির তাম্বোলি ও সহকর্মীরা
 
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে শিক্ষা ক্ষেত্রে কাজ করা ড. বেনজির উর্দু মাধ্যমের শিক্ষা সম্পর্কে বলেন, “এমন নয় যে উর্দু মাধ্যমে পড়াশোনা করা উচিত নয়, কিন্তু অনেক ছেলে-মেয়ে পরিস্থিতির চাপে, অসহায়তার কারণে বা সুযোগের সীমাবদ্ধতায় উর্দু মাধ্যমে পড়াশোনা করে। এতে তাদের কোনো দোষ নেই।”
 
এই শিক্ষার্থীদের ভাষাগত দক্ষতা, বিশেষত ইংরেজি শেখার ক্ষেত্রে উন্নতির জন্য তিনি ‘তানজিম-এ-ওয়ালেদাইন’ সংগঠনের মাধ্যমে উর্দু মাধ্যমের স্কুলগুলোতে গিয়ে ইংরেজি শিক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ নেন এবং বহু সফল পরীক্ষামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন। এই উদ্যোগের ওপর ভিত্তি করে তিনি একটি গবেষণাপত্রও উপস্থাপন করেন।
 
নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই বেনজির মুসলিম নারীদের সমস্যাগুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। এরপর তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে মুসলিম সত্যশোধক মণ্ডলের কাজে যুক্ত করেন। এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি নানা সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন এবং বিশেষ করে মুসলিম নারীদের সমঅধিকারের দাবিতে ধারাবাহিকভাবে সোচ্চার থাকেন। পাশাপাশি ‘মুসলিম মহিলা মদত কেন্দ্র’-এর মাধ্যমে তিনি বহু তালাকপ্রাপ্ত ও নির্যাতিত নারীকে মূল্যবান সহায়তা প্রদান করেন।
 
দীর্ঘ সংগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত উপলব্ধির ভিত্তিতে তিনি সমাজকল্যাণমূলক বিষয়গুলো অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে তুলে ধরেন। পারিবারিক বিরোধ বা বিবাহবিচ্ছেদের মতো সমস্যার সমাধানে তিনি সর্বদা সাংবিধানিক ও বিচারব্যবস্থার আশ্রয় নেওয়ার ওপর জোর দেন।
 
ড. বেনজির তাম্বোলির লেখা বইয়ের প্রচ্ছদ
 
বেনজিরের পথচলা কেবল সমাজসেবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; শিক্ষা ও বৌদ্ধিক ক্ষেত্রেও তিনি নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছেন। তিনি শিক্ষাবিদ্যায় পিএইচডি সম্পন্ন করেন এবং বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। এছাড়াও তিনি দীর্ঘদিন ‘মহারাষ্ট্র নলেজ কর্পোরেশন’ (এমকেসিএল)-এ সিনিয়র এডুকেশনাল কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করেছেন এবং শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রশাসনের ক্ষেত্রে তাঁর দুই দশকেরও বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে।
 
তিলক মহারাষ্ট্র বিদ্যাপীঠে কাজ করার সময় তিনি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেলের নোডাল অফিসার হিসেবে নিজের সামাজিক দায়বদ্ধতাকে সমানভাবে বজায় রেখেছিলেন। তাঁর সাহসী ও নিষ্ঠাবান কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০১৫ সালে নয়াদিল্লিতে ‘সাহস সম্মান’ এবং ২০১৭ সালে পুনেতে ‘সেবাব্রতী মহিলা পুরস্কার’-এর মতো সম্মানে ভূষিত হন।
 
শিক্ষাক্ষেত্রের পাশাপাশি তাঁর বৌদ্ধিক ও আদর্শিক কাজও অত্যন্ত বিস্তৃত ও গুরুত্বপূর্ণ। মারাঠি, হিন্দি এবং ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার কারণে তিনি বহু অনুবাদ ও সম্পাদনার কাজ করেছেন। তিনি ‘মুসলিম সত্যশোধক পত্রিকা’ এবং ‘সমাজবাদী অধ্যাপক পত্রিকা’-এর সহ-সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেছেন। সংগঠনের সাময়িকীতে তিনি নিয়মিত লিখেছেন এবং বিভিন্ন স্থানে বিদ্বৎপূর্ণ বক্তৃতা দিয়েছেন।
 
তাঁর তৈরি ‘শিক্ষণশাস্ত্র শব্দকোষ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। এছাড়াও তিনি ‘প্রভাবশালী শিক্ষণ তজ্ঞ’ নামের একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। দক্ষিণ ভারতের লেখক শেখ ইউসুফ বাবার (যিনি ‘স্কাই বাবা’ নামে পরিচিত) তেলুগু ছোটগল্প সংকলনের মারাঠি অনুবাদও তিনি করেছেন, যা শীঘ্রই প্রকাশিত হবে। এই গল্পগুলো মুসলিম সমাজের বিভিন্ন স্তর, বিশেষ করে নারীদের জীবনকে অত্যন্ত কার্যকরভাবে তুলে ধরে।
 
ড. বেনজির তাম্বোলি
 
প্রচলিত সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতিকে অতিক্রম করে তিনি এক অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তিনি এবং তাঁর স্বামী ড. শামসুদ্দিন তাম্বোলি মৃত্যুর পর নিজেদের দেহ দান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং সেই সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক কাগজপত্রও পূরণ করেছেন। তাঁদের এই সিদ্ধান্ত তাঁদের প্রগতিশীল চিন্তার পরিপক্বতার পরিচয় বহন করে।
 
ড. বেনজির ইতিমধ্যেই জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ উচ্চতায় পৌঁছালেও ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছেন। ইতিহাস থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত মুসলিম সমাজে বহু নারী বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসাধারণ কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। ধর্মীয় বা সামাজিক ক্ষেত্রের পাশাপাশি বিজ্ঞান, চিকিৎসা, বিচারব্যবস্থা, শিল্প ও সাহিত্যেও মুসলিম নারীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রায়ই এই মুখগুলো সমাজের সামনে আসে না। তাই তিনি এমন কৃতী নারীদের তথ্য সংগ্রহ, তাঁদের জীবনী নথিবদ্ধ করা এবং তাঁদের নিয়ে একটি বই লেখার পরিকল্পনা করছেন। মুসলিম নারীদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে এই কাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
 
তিনি মনে করেন, মুসলিম সত্যশোধক মণ্ডল এবং হামিদ দলওয়াইয়ের চিন্তাধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া বর্তমান সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন। এই চিন্তা তাঁর রক্তে ও আদর্শে মিশে আছে। তাই তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে, যতদিন সম্ভব তিনি এই আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকে কাজ করে যাবেন।
 
সাম্প্রতিক সময়ে আন্তঃধর্মীয় বিবাহে আবদ্ধ হওয়া দম্পতিদের নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে তিনি আরও দ্রুততার সঙ্গে কাজ করতে চান, যাতে মানুষ ১৯৫৪ সালের ‘স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট’-এর আওতায় বিবাহে উৎসাহিত হয় এবং প্রয়োজনীয় আইনি ও মানসিক সহায়তা পায়। সমাজে ক্রমবর্ধমান ঘৃণা কমিয়ে ‘ঐক্য ও সংহতি’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েই তিনি কাজ করতে চান।
 

অন্য কথায়, বেনজির তাম্বোলির আগামী দিনের পথচলা চলবে দুই সমান্তরাল ধারায়, কলমের মাধ্যমে আদর্শিক জাগরণ এবং কাজের মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তন। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, এই পথচলায় তাঁর স্বামী ড. শামসুদ্দিন তাম্বোলির অমূল্য সমর্থন সবসময় তাঁর পাশে রয়েছে।
 
নিজের বিবাহবিচ্ছেদের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসে তিনি শুধু নিজের জীবনকেই নতুনভাবে গড়ে তোলেননি, বরং আরও বহু নারীর জীবনেও সাহস ও আশার আলো জ্বালিয়েছেন। তাই বলা যায়, ড. বেনজির তাম্বোলি সেই বিরল উদাহরণ, যিনি প্রতিকূল পরিস্থিতির কাছে হার না মেনে সেখান থেকেই নতুন পথ তৈরি করেছেন এবং নিজের জীবনকে আলোকিত করার পাশাপাশি অন্যদের জীবনেও আলোর দিশা দেখিয়েছেন। তাঁর কাজ, তাঁর চিন্তাধারা এবং তাঁর অদম্য মনোবল সমাজের সকলের জন্য, বিশেষ করে মুসলিম নারীদের জন্য, গভীরভাবে অনুপ্রেরণাদায়ক।