ড. আবেদা ইনামদার
সমীর ডি. শেখ
সমাজের অন্ধকার দূর করতে শিক্ষা যে সবচেয়ে কার্যকর শক্তি, তা নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন ড. আবেদা ইনামদার। একটি সম্মানজনক ও নিরাপদ সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমাজসেবার কাজে উৎসর্গ করেছিলেন। বিশেষ করে নারী শিক্ষা ও প্রান্তিক মানুষের উন্নয়নের লক্ষ্যে তাঁর এই সাহসী সিদ্ধান্ত তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
শিক্ষা ও সমাজকল্যাণের ক্ষেত্রে আজ ড. আবেদা ইনামদারের নাম গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। পুনের বিখ্যাত ‘আজম ক্যাম্পাস’-কে গড়ে তোলা ও বিস্তৃত করার পেছনে তাঁর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংখ্যালঘু ও বহুজান সম্প্রদায়ের হাজার হাজার ছেলে-মেয়েকে শিক্ষার মূলস্রোতে নিয়ে আসতে এই প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, আর সেই উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছেন আবেদা ইনামদার।
আবেদা ইমানদার
আবেদা ইনামদারের জন্ম ৪ জুন, ১৯৪৯ সালে। তিনি ছিলেন পরিবারের দশ ভাইবোনের মধ্যে চতুর্থ সন্তান। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে সুশিক্ষা, মূল্যবোধ ও নীতিনিষ্ঠ চিন্তাধারার বীজ রোপিত হয়েছিল। পড়াশোনার প্রতি গভীর আগ্রহ নিয়ে তিনি অধ্যবসায়ের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। তিনি পুনে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাণিজ্যে স্নাতকোত্তর (এম.কম.) ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর প্রশাসনিক পরিষেবায় অসাধারণ সাফল্য লাভ করেন। সেই সাফল্যের ফলস্বরূপ তিনি ‘কাস্টমস অ্যান্ড সেন্ট্রাল এক্সাইজ’ বিভাগে এক্সিকিউটিভ অফিসার পদে নির্বাচিত হন।
পরবর্তীতে তিনি পুনে ও মুম্বইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরে অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ পদে কাজ করেন। তাঁর হাতে ছিল একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ সরকারি চাকরি। ১৯৭২ সালে তিনি পীরপাশা হুসাইনি ইনামদারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবাহের কয়েক বছর পর তিনি বৃহত্তর লক্ষ্যকে সামনে রেখে নিজের কর্মজীবনকে নতুন দিশা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সমাজের জন্য বাস্তব ও অর্থবহ কিছু করার আকাঙ্ক্ষা থেকে তিনি ১৯৮১ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর প্রকৃত সমাজসেবার পথচলা। “সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন আনার একমাত্র হাতিয়ার হলো শিক্ষা। আমি এই কথায় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি,” এটাই ছিল তাঁর স্পষ্ট মত।
আবেদা ইমানদার মঞ্চে বক্তৃতা দেওয়ার মুহূর্তে
নারী শিক্ষার ভিত্তি নির্মাণ ও আজম ক্যাম্পাসের বিস্তার
তিনি খুব তাড়াতাড়িই বুঝতে পেরেছিলেন যে বিশেষ করে মুসলিম ও বহুজান সম্প্রদায়ের মেয়েরা শিক্ষার মূলধারা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। তিনি বলেন, “নারীরা আমাদের জনসংখ্যার পঞ্চাশ শতাংশ। মানব উন্নয়নে তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং মানব সভ্যতার বিকাশের মূল কেন্দ্রবিন্দু। যেকোনো সামাজিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সমস্যার মূল কারণ হলো নিরক্ষরতা। শিক্ষা সমাজের অগ্রগতির সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। এটি বিশ্বের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করে।” তিনি আরও বলেন, “জ্ঞানই শক্তি। শিক্ষা মানুষকে সব ধরনের বন্ধন থেকে মুক্ত করে এবং সঠিক পথে চিন্তা করার ক্ষমতা দেয়। তাই মেয়েদের শিক্ষায় বিনিয়োগ সমাজকে সবচেয়ে বড় প্রতিদান দেয়।”
এই চিন্তাধারাকে সামনে রেখে তিনি পুনের ‘মহারাষ্ট্র কসমোপলিটান এডুকেশন সোসাইটি’ (আজম ক্যাম্পাস)-এর মাধ্যমে এক শিক্ষাবিপ্লবের সূচনা করেন। ড. পি. এ. ইনামদার ও আবেদা ইনামদার দম্পতি এই প্রতিষ্ঠানটিকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দেন। শুরুতে মাত্র চারটি বিদ্যালয় নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। আজ ২৪ একরজুড়ে বিস্তৃত সবুজ ও মনোরম এই ক্যাম্পাসে ৩২টিরও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গর্বের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে। কলা, বিজ্ঞান, বাণিজ্য, আইন, ফার্মেসি, ম্যানেজমেন্ট ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৩০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী এখানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে। এর মধ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের ছেলে ও মেয়েদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এই প্রতিষ্ঠানের ‘স্কলার ব্যাচ’-এর মতো সফল উদ্যোগ দেখে বহু অন্যান্য সংস্থাও একই ধরনের কর্মসূচি চালু করতে অনুপ্রাণিত হয়েছে।
আবেদা ইমানদার
মেয়েদের শিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘আবেদা ইনামদার জুনিয়র অ্যান্ড সিনিয়র কলেজ ফর গার্লস’। এই প্রতিষ্ঠানের জন্য তিনি উল্লেখযোগ্য আর্থিক সহায়তাও প্রদান করেন। আজ এই কলেজগুলিতে দশ হাজারেরও বেশি ছাত্রী শিক্ষা গ্রহণ করছে এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের পায়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিক্ষাগত উন্নয়নের জন্য তাঁর দীর্ঘ পরিশ্রমের সুফল আজ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টার ফলে এই সম্প্রদায়ের দুই থেকে তিন প্রজন্ম উল্লেখযোগ্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। আজ এই সম্প্রদায়ের হাজার হাজার তরুণ-তরুণী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে এবং অত্যন্ত সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ পদে কর্মরত রয়েছে।
একাধিক প্রতিষ্ঠানের দক্ষ নেতৃত্ব ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা
আবেদা ইনামদার নিজেকে শুধুমাত্র আজম ক্যাম্পাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করছেন। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠিত ‘ড. পি. এ. ইনামদার ইউনিভার্সিটি’-র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি। এছাড়াও ‘হাজি গুলাম মোহাম্মদ আজম এডুকেশন ট্রাস্ট’, ‘পি. এ. ইনামদার এডুকেশন ট্রাস্ট’ এবং ‘পুনা উইমেন্স কাউন্সিল’-এর মতো বৃহৎ সংস্থার মাধ্যমে তিনি দিনরাত কাজ করে চলেছেন তৃণমূল স্তরের শিক্ষার্থী ও নারীদের জন্য।
আবেদা ইমানদার একটি পুরস্কার গ্রহণের মুহূর্তে
সামাজিক সম্প্রীতি ও মারাঠি ভাষার মর্যাদা রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা
আবেদা ইনামদারের নেতৃত্বে আজম ক্যাম্পাস কখনও শুধু পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি সর্বদা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধর্মীয় সমতা ও জাতীয় সংহতির মূল্যবোধ গড়ে তুলেছেন। রাজ্যের মূলস্রোতের সঙ্গে মুসলিম শিক্ষার্থীদের যুক্ত করতে তিনি এক অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেন। আজম ক্যাম্পাসে হাজার হাজার মুসলিম শিক্ষার্থীকে মারাঠি ভাষা শেখানোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে।
প্রতি বছর এই ক্যাম্পাসে অত্যন্ত জাঁকজমক ও শৃঙ্খলার সঙ্গে ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের জন্মজয়ন্তী উদ্যাপন করা হয়। ঐতিহ্যবাহী পোশাকে হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী এই শিব জয়ন্তীতে অংশগ্রহণ করে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি সমগ্র রাজ্যের কাছে সামাজিক সম্প্রীতি ও ঐক্যের এক গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। মহারাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য ‘পন্ধরপুর ওয়ারি’-র উদ্দেশ্যে যাত্রারত সন্ত তুকারাম ও সন্ত জ্ঞানেশ্বরের পালকিগুলি যখন পুনেতে অবস্থান করে, তখন আজম ক্যাম্পাসের বিভিন্ন বিভাগ, বিশেষ করে মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী ও চিকিৎসকেরা আগত ভক্তদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদান করেন।
আবেদা ইমানদার কপিল দেবের সঙ্গে
মেয়েদের সর্বাঙ্গীণ বিকাশে জোর
শিক্ষা শুধু একটি মেয়েকে সাক্ষর করে না; এটি তাকে প্রকৃত অর্থে সব বাধা থেকে মুক্তি দেয়। এ বিষয়ে তিনি বলেন, “মেয়েদের শিক্ষা সরাসরি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, পারিবারিক স্বাস্থ্য, সমতাভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সমাজে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত।” তিনি বলেন, “শিক্ষা মেয়েদের নিজেদের সম্ভাবনা উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তারা সমানভাবে অংশ নিতে পারে। এর মাধ্যমে নারীরা সমান কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার সুযোগ পায়।” এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “শিক্ষিত নারী প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি কুসংস্কার হ্রাস পায়, সমাজে ব্যাপক পরিবর্তন আসে এবং লিঙ্গবৈষম্য অনেকটাই কমে যায়।”
আজম ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যাধুনিক গ্রন্থাগার, আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার ও ওয়াই-ফাই সুবিধা উপলব্ধ করা হয়েছে। ছেলে ও মেয়েদের জন্য নিরাপদ ও সুসজ্জিত হোস্টেল নির্মাণ করা হয়েছে। খেলাধুলায় প্রতিভা বিকাশের জন্য আন্তর্জাতিক মানের ‘ভি. এম. গনি স্পোর্টস কমপ্লেক্স’ গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে আজ আজম ক্যাম্পাস শুধু শিক্ষার জন্য নয়, বিশেষ করে খেলাধুলার ক্ষেত্রে ছাত্রীদের সাফল্যের জন্যও পরিচিত। ক্রিকেট, ফুটবল ও হকির মতো বহু রাজ্য ও জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় এই শিক্ষার্থীরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ড. ইনামদার শতবর্ষ প্রাচীন ‘ডেকান মুসলিম ইনস্টিটিউট’ গ্রন্থাগারকে একটি বিশাল ‘ইনফরমেশন সেন্টার’-এ রূপান্তরিত করেছেন। সেখানে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দিকনির্দেশনা দেওয়ার কেন্দ্র অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি সুলভ মূল্যে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য একটি গাইডেন্স সেন্টারও ক্যাম্পাসে চালু করা হয়েছে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে সম্মাননা
আবেদা ইনামদারের অসামান্য কাজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃতি পেয়েছে। তিনি নয়াদিল্লির ‘ন্যাশনাল কমিশন ফর মাইনরিটি এডুকেশনাল ইনস্টিটিউশনস’-এর ‘কমিটি অন গার্লস এডুকেশন’-এর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি জেনেভাভিত্তিক ‘গ্র্যাজুয়েট উইমেন ইন্টারন্যাশনাল’-এর সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তিনি ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কিতে ভারতের প্রতিনিধিত্বও করেছেন। এছাড়া সাভিত্রীবাই ফুলে পুনে বিশ্ববিদ্যালয় এবং নান্দেড়ের স্বামী রামানন্দ তীর্থ মরাঠওয়াড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর অসামান্য ও নিঃস্বার্থ অবদানের জন্য মহারাষ্ট্র সরকার তাঁকে ‘সাভিত্রীবাই ফুলে’ পুরস্কারে সম্মানিত করেছে। এছাড়াও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফাউন্ডেশন ফর এক্সেলেন্স’ থেকে ‘হিউম্যান রাইটস অ্যাওয়ার্ড’ এবং ‘বেস্ট ফ্যাসিলিটেটর অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেছেন। প্রশাসনিক পরিষেবার উচ্চপদস্থ চাকরি ছেড়ে সমাজের দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষের জন্য নিজের সমগ্র জীবন উৎসর্গ করা ড. আবেদা ইনামদারের জীবনযাত্রা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। এক দৃঢ়সংকল্প নারী চাইলে কীভাবে নিজের উদারতা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে হাজার হাজার ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে পারেন, তিনি তার জীবন্ত উদাহরণ।
(লেখক ‘আওয়াজ দ্য ভয়েস - মারাঠি’-র সম্পাদক।)