দেবকিশোর চক্রবর্তী
বীরভূমের নানুরের গোপডিহির প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলেছেন শেখ আতাউল রহমান। পরিবারের আর্থিক অনটন, বাবার পরিযায়ী শ্রমিকের জীবন, কোনও কিছুই তাঁর পড়াশোনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। চলতি বছরের নিট পরীক্ষায় সর্বভারতীয় মেধাতালিকায় ৭৯৫৫ এবং পশ্চিমবঙ্গের মেধাতালিকায় ১৭৯তম স্থান অর্জন করে সেই লড়াইয়েরই সাফল্য প্রমাণ করেছেন আতাউল।
আতাউলের পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর পড়াশোনার শুরু। প্রাথমিকের পাঠ শেষ করার পর তিনি নানুরের পাপুড়ি আল আমিন মিশনে ভর্তি হন। সেখানেই মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর মিশনের প্রধান শাখা হাওড়ার খলতপুরে পড়াশোনা চালিয়ে যান। ২০২৫ সালে সেখান থেকেই উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন তিনি। উচ্চ মাধ্যমিকের পর লক্ষ্য আরও স্পষ্ট হয়, নিট পরীক্ষায় সফল হয়ে চিকিৎসক হওয়া।
শেখ আতাউল রহমান
আতাউলের এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে তাঁর বাবা কামরুল হাসান শেখের দীর্ঘ ত্যাগ। গোপডিহিতে তাঁদের প্রায় তিন বিঘা চাষের জমি রয়েছে। কিন্তু সেই জমির আয় দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি দুই সন্তানের পড়াশোনার খরচ বহন করা কঠিন ছিল। তাই বছরের অধিকাংশ সময়ই বাবাকে বাড়ির বাইরে থাকতে হয়েছে। চেন্নাইয়ে গিয়ে রাজমিস্ত্রির কাজ করে উপার্জন করেছেন তিনি। সেই উপার্জনের টাকাতেই ছেলেদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।
আতাউলের ছোট ভাই শামিম শেখ বর্তমানে নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। দুই ছেলের ভবিষ্যৎ যাতে আর্থিক সমস্যার কারণে থমকে না যায়, সে জন্যই কামরুলের এই পরিযায়ী জীবন। নিজের পরিবার ও গ্রাম থেকে দূরে থেকে কঠোর পরিশ্রম করেছেন তিনি। সম্প্রতি চাষের কাজে বাড়ি ফিরেছেন কামরুল। আর সেই সময়েই বড় ছেলের নিটে সাফল্যের খবর তাঁর কাছে হয়ে উঠেছে দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
তবে আতাউলের কাছে নিটে সাফল্য কোনও শেষ গন্তব্য নয়, বরং নতুন পথচলার শুরু। তাঁর স্বপ্ন কলকাতার কোনও মেডিক্যাল কলেজে পড়াশোনা করা। ভবিষ্যতে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হতে চান তিনি। চিকিৎসক হয়ে নিজের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি বাবাকেও পরিযায়ী শ্রমিকের জীবন থেকে ফিরিয়ে আনতে চান আতাউল।
বাবার ভিন্রাজ্যে গিয়ে কাজ করার কষ্ট খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। জানেন, সংসারের জন্য কতটা পরিশ্রম করতে হয় তাঁকে। তাই নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে বাবাকে আর পরিযায়ী শ্রমিকের জীবন কাটাতে দিতে চান না। তাঁর চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে বাবার সেই ত্যাগের ঋণ শোধ করার আকাঙ্ক্ষা।
নিজের সাফল্যের জন্য পরিবারের পাশাপাশি শিক্ষক ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতিও কৃতজ্ঞ আতাউল। বিশেষ করে এলাকার বাসিন্দা এবং গ্রাম পঞ্চায়েত দফতরের আধিকারিক মহম্মদ আলাউদ্দিন হকের সহযোগিতার কথা তিনি স্মরণ করেছেন। পড়াশোনার শুরু থেকেই তাঁর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও দিকনির্দেশ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন আতাউল।
একটি প্রত্যন্ত গ্রামের সাধারণ পরিবারের ছেলে থেকে নিটের সর্বভারতীয় মেধাতালিকায় জায়গা করে নেওয়ার এই গল্প তাই শুধুমাত্র একজন মেধাবী ছাত্রের সাফল্যের গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একজন বাবার নীরব আত্মত্যাগ, পরিবারের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও সন্তানের বড় স্বপ্ন দেখার সাহস এবং সেই স্বপ্ন পূরণে এক তরুণের নিরন্তর পরিশ্রম। গোপডিহির আতাউল এখন চিকিৎসক হওয়ার দীর্ঘ পথের প্রথম ধাপ পেরিয়েছেন। সামনে তাঁর আরও কঠিন পথ। আর সেই পথের শেষ প্রান্তে সাদা অ্যাপ্রন পরে দাঁড়িয়ে বাবাকে ঘরে ফিরিয়ে আনার স্বপ্নই তাঁকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।