পেটের টানে পেশা বদলাচ্ছে গ্রাম, বাপ-দাদার স্মৃতি আর ‘মুন্সী গামছা’র সম্মান বাঁচাতে একা কুম্ভ হয়ে লড়ে চলেছেন মান্নান মোল্লা

Story by  Tarun Nandi | Posted by  Aparna Das • 2 d ago
আব্দুল মান্নান মোল্লা
আব্দুল মান্নান মোল্লা
 
তরুণ নন্দী / কলকাতা

অস্তিত্ব রক্ষায় আজও খটখাট সুর শোনা যায় আব্দুল মান্নান মোল্লার বাড়িতে। বসিরহাটের ‘মুন্সি গামছা’র ১৫০ বছরের ঐতিহ্য রক্ষায় একাই লড়ে যাচ্ছেন মান্নান। এক সুতির বস্ত্রখণ্ড বছরের পর বছর ধরে হয়ে উঠেছে বঙ্গজীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। পুজো-অর্চনা থেকে শুরু করে মেহনতি মানুষের নিত্যসঙ্গী, সব কিছুতেই জড়িয়ে রয়েছে বাংলার গামছার কথা। আর এ বিষয়ে কথা উঠলেই প্রথমে আসে বসিরহাটের বিখ্যাত মুন্সী গামছার কথা। কিন্তু প্রযুক্তির বাড়বাড়ন্ত আর চরম আর্থিক অনটনে জেরবার হয়ে বর্তমানে বিলুপ্তির পথে উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট মহকুমার দেড়শো বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ‘মুন্সী গামছা’।
 
অবিভক্ত বাংলার খুলনা, যশোর, ঢাকা থেকে কলকাতার বড়বাজারে বিশাল চাহিদা থাকত বসিরহাটের ১০০ শতাংশ খাঁটি সুতির বিশেষ স্ট্রাইপ ও চেকের গামছার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যে শিল্প আজ ধুঁকতে বসেছে। বলা ভালো, হস্তচালিত তাঁতের সেই সোনালী অতীত আজ প্রায় স্মৃতির পাতায়। তবে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার সংকল্প নিয়ে বসিরহাটের পানিতর গ্রামে শত বছরের ঐতিহ্যকে বুকে আঁকড়ে শেষ প্রদীপ হয়ে একাই লড়ে যাচ্ছেন কারিগর আব্দুল মান্নান মোল্লা।
 

স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, একসময় ভ্যাবলা, পিফা, কেয়ামারি, মাটিয়া সহ নদী তীরবর্তী গ্রামগুলোতে রাতেও শোনা যেত কাঠের মাকুর ‘খটখাট’ শব্দ। গ্রামের বেশীরভাগ মানুষগুলোর জীবনজীবিকা ছিল এই গামছা বোনা। কিন্তু সময় বদলেছে, আধুনিক পাওয়ারলুম মেশিনের পলিয়েস্টার মিশ্রিত সস্তা গামছার দাপট কেড়ে নিয়েছে বসিরহাটের গামছার সেই কদর। বাড়তি পাওয়া হিসেবে সুতোর আকাশছোঁয়া দাম কাঠের মাকুর ‘খটখাট’ শব্দ স্তব্ধ করে দিয়েছে। এতকিছুর মাঝেও কারখানার ভাঙাচোরা দেওয়াল আর মরচে ধরা মাকুর সাহায্যে গামছা শিল্পী মান্নান সাহেব নিজের খসখসে আঙুলে বাঁচিয়ে রেখেছেন ইতিহাসের শেষ নিঃশ্বাস।
 
তবে মান্নান একই পেশায় রয়ে গেলেও অন্যান্য গামছার কারিগররা পেট চালাতে কেউ গিয়েছেন ইটভাটা তো কেউ টোটো নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছেন। কেউ আবার কোন উপায় না দেখে বেছে নিয়েছেন পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ। কিন্তু ঘরে অনটন থাকলেও মান্নান মোল্লা দিনমজুরির ফাঁকেও আঁকড়ে ধরেছেন বাপ-দাদার পেশা। কেন তিনি আজও এই পেশাকে টিকিয়ে রেখেছেন?
 
আব্দুল মান্নান মোল্লা
 
উত্তরে মান্নান জানালেন, আগে হাতে গামছা তৈরির কাজে যুক্ত ছিল পুরো পানিতর গ্রামের বেশিরভাগ বাসিন্দা। বাপ-দাদার আমল থেকে এই কাজ চলে আসছে। কিন্তু এখন সুতোর দাম প্রচুর বেড়েছে, কিন্তু সেই হিসেবে গামছা শিল্পে রোজগার বাড়েনি। হস্তশিল্পের কারখানাগুলো সব ভেঙেচুরে বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। শুধু আমি কোনরকমভাবে এখনও ধরে রেখেছি এই ঐতিহ্যের শিল্পকে। পেট চালাতে দিনমজুরিও করি। অন্য কাজের ফাঁকে সময় বের করে ঐতিহ্য ধরে রাখতে বাড়িতে বসে গামছা বুনি। ঠিকমত কাজ করতে পারলে সারাদিনে মাত্র চার পিস গামছা তৈরি হয়।
 
মান্নান আক্ষেপ নিয়ে বললেন, এই শিল্পকে বাঁচাতে হলে কারিগরদের মজুরি বাড়াতে হবে আর সেইসঙ্গে কমাতে হবে সুতোর দাম। সর্বপরি বসিহাটের এএই গামছা শিল্পকে বাঁচাতে হলে এখনই সরকারি হস্তক্ষেপ অবশ্যই দরকার।
 
আব্দুল মান্নান মোল্লা
 
ব্যবসায়ীদের মতে, বাজারে খাঁটি সুতির হাতে বোনা মুন্সী গামছার চাহিদা এখনও রমরমা রয়েছে। কিন্তু টিকে থাকার লড়াইয়ের কাছে হার মেনে কারিগর ও জোগান না থাকায় শিল্পটি অচিরেই হারিয়ে যাচ্ছে। প্রবীণ কারিগরেরাও আক্ষেপ করে বললেন, বাজারের প্রবল চাহিদা তবুও কোনো কিছুই গতি ফেরাতে পারছে না এই কুটির শিল্পের। সরকারিভাবে সুতোয় ভর্তুকি, আর্থিক সাহায্য না পেলে আব্দুল মান্নান মোল্লার হাত ধরে টিকে থাকা দেড়শো বছরের এই শিল্প অচিরেই একদিন ঠাঁই নেবে ইতিহাসের পাতায়।