শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
হুগলি জেলার জাঙ্গিপাড়া ব্লকের ছোট্ট জনপদ ফুরফুরা শরিফ আজ শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, সমগ্র পূর্ব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুফি তীর্থক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ মানুষ এখানে আসেন দোয়া চাইতে, মানত করতে কিংবা আধ্যাত্মিক শান্তির সন্ধানে। কিন্তু ফুরফুরা শরিফের পরিচয় কেবল একটি দরগাহ বা ধর্মীয় সমাবেশের কেন্দ্র নয়; এর মূল পরিচয় একটি ঐতিহ্যবাহী খানকাহ, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে সুফি সাধনা, ধর্মীয় শিক্ষা, সমাজসেবা এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চা অব্যাহত রয়েছে।
'খানকাহ' শব্দটির উৎপত্তি ফারসি ভাষা থেকে। মধ্যযুগে সুফি সাধকেরা তাঁদের শিষ্যদের নিয়ে যে আধ্যাত্মিক কেন্দ্র গড়ে তুলতেন, যেখানে আল্লাহর স্মরণ, জিকির, ধর্মীয় শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের সেবা একসঙ্গে চলত, সেই কেন্দ্রকেই বলা হতো খানকাহ। ভারতবর্ষে দ্বাদশ শতক থেকে সুফি সাধকদের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে এই সংস্কৃতির বিস্তার ঘটে। বাংলাতেও বিভিন্ন স্থানে খানকাহ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেগুলি সমাজজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে শুরু করে।
ফুরফুরা শরিফ
ফুরফুরা শরিফের আধুনিক পরিচিতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বিশিষ্ট ইসলামি পণ্ডিত ও সমাজসংস্কারক আবু বকর সিদ্দিকী-এর নাম। ঊনবিংশ শতকের শেষভাগ ও বিংশ শতকের সূচনালগ্নে তিনি ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার, নৈতিক জীবনযাপন, কুসংস্কারবিরোধী প্রচার এবং সামাজিক সংস্কারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাঁর উদ্যোগে ফুরফুরা শরিফ একটি প্রভাবশালী ধর্মীয় ও সামাজিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আজও তাঁর উত্তরসূরিরা আধ্যাত্মিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে চলেছেন।
ফুরফুরা শরিফের খানকাহে প্রতিদিন কোরআন শিক্ষা, হাদিস পাঠ, জিকির, দোয়া এবং ইসলামি আলোচনার আয়োজন হয়। এখানে বহু ছাত্র ধর্মীয় শিক্ষালাভ করে। পাশাপাশি সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোও এই খানকাহের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। বিভিন্ন সময়ে খাদ্য বিতরণ, চিকিৎসা সহায়তা, শিক্ষামূলক উদ্যোগ এবং মানবকল্যাণমূলক নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। সুফি দর্শনের মূল শিক্ষা, মানুষের সেবা, বিনয়, ভালোবাসা এবং সহমর্মিতা, এই কর্মকাণ্ডের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়।
প্রতি বছর ইসলামি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী এখানে অনুষ্ঠিত হয় ওরস শরিফ। সেই সময় পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও বিহার, ঝাড়খণ্ড, অসম, ওড়িশা এবং বাংলাদেশের বহু মানুষ ফুরফুরা শরিফে সমবেত হন। ওরস উপলক্ষে ধর্মীয় আলোচনা, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া মাহফিল ও অন্যান্য আধ্যাত্মিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন এবং ক্ষুদ্র অর্থনীতিতেও এই সমাগমের উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ে।
ফুরফুরা শরিফের আরেকটি বিশেষ দিক হলো এর সম্প্রীতির ঐতিহ্য। স্থানীয় মানুষের মতে, বহু অমুসলিম দর্শনার্থীও এখানে আসেন এবং মানত করেন। সুফি দর্শনের মানবতাবাদী আদর্শ ধর্মীয় বিভাজনের পরিবর্তে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা এবং শান্তির বার্তা বহন করে। এই কারণেই ফুরফুরা শরিফ দীর্ঘদিন ধরে বাংলার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
তবে ইতিহাসবিদদের মতে, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সুফি কেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও ফুরফুরা শরিফের ইতিহাস, পাণ্ডুলিপি, পুরোনো দলিল এবং মৌখিক ঐতিহ্যের বড় অংশ এখনও পর্যাপ্তভাবে নথিভুক্ত হয়নি। গবেষণা, সংরক্ষণ এবং ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তোলার উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই ঐতিহ্যকে আরও সুরক্ষিত করতে পারে।
আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজে ফুরফুরা শরিফের খানকাহ শুধু একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়; এটি বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি, সমাজসেবা এবং মানবিক মূল্যবোধের এক জীবন্ত ধারক। শতবর্ষেরও বেশি সময় ধরে এই কেন্দ্র যে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও আধ্যাত্মিকতার শিক্ষা দিয়ে চলেছে, তা বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ।