এক রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, এক দেশত্যাগ; যে গল্পের হাত ধরে জন্ম নিল ‘কিং খান’-এর

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 23 h ago
এক রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, এক দেশত্যাগ; যে গল্পের হাত ধরে জন্ম নিল ‘কিং খান’-এর
এক রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, এক দেশত্যাগ; যে গল্পের হাত ধরে জন্ম নিল ‘কিং খান’-এর
 
মালিক আসগর হাশমী

কথাটি একটু অদ্ভুত মনে হতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ সেই না-বলা ঘটনাটি যদি না ঘটত, তাহলে আজ গোটা বিশ্ব যাঁকে ‘বলিউডের বাদশাহ’ নামে চেনে, সেই নামটি হয়তো কোনও অচেনা পথেই হারিয়ে যেত। শাহরুখ খান আজ যে উচ্চতায় পৌঁছেছেন, তার ভিত্তি আসলে তৈরি হয়েছিল ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের সেই ভয়াবহ ও রাজনৈতিক অস্থির সময়ে। সেই বিভাজনই তাঁর পিতাকে নিজের জন্মভূমি ছেড়ে যেতে বাধ্য করেছিল।

সম্প্রতি পাকিস্তানে উর্দু ভাষায় প্রকাশিত ‘ম্যাঁ কিউঁ নেহি টুটা?’ (আমি কেন ভেঙে পড়িনি?) শীর্ষক একটি বইয়ে এই রহস্যময় ইতিহাসের কিছু না-বলা অধ্যায় সামনে এসেছে। বইটির লেখক ড. মুহাম্মদ সুহাইল খান। তিনি হাজি গুলাম আহমদ বিলৌরের সঙ্গে দু’বছর ধরে চলা দীর্ঘ আলোচনা ও রেকর্ড করা কথোপকথনের ভিত্তিতে এই পুরো কাহিনি লিপিবদ্ধ করেছেন।
 
শিশু অবস্থায় শাহরুখ খান তাঁর বাবা-মা ও বোনের সঙ্গে
 
এই কাহিনি স্বাধীনতার আগের সেই সময়ের, যখন খাইবার পাখতুনখোয়ার তৎকালীন নর্থ-ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্সে স্বাধীনতা আন্দোলন তীব্র রূপ ধারণ করেছিল। সেই সময় তিন যুবকের বন্ধুত্বের কাহিনি যথেষ্ট আলোচিত ছিল। তাঁরা হলেন, শাহরুখ খানের বাবা তাজ মহম্মদ, হাজি গুলাম আহমদ বিলৌরের বাবা বিলৌর দীন এবং ড. আবদুল কাইয়ুম খান।
 
তিনজনের হৃদয়েই ছিল ভারতের স্বাধীনতার স্বপ্ন। তাঁরা কংগ্রেসের পাশাপাশি খান আবদুল গফ্ফার খান, অর্থাৎ ‘বাচা খান’-এর ঐতিহাসিক ‘খুদাই খিদমতগার আন্দোলন’-এর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। দেশপ্রেমের এক গভীর বন্ধন তিনজনকে একসঙ্গে বেঁধে রেখেছিল।
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

A post shared by Shah Rukh Khan (@iamsrk)

 
কিন্তু ১৯৪৭ সালের ভারত-পাকিস্তান বিভাজন সেই সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের সমীকরণ বদলে দিয়েছিল। মুসলিম লীগের প্রভাব বাড়তে থাকায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুধাবন করে ড. কাইয়ুম খান কংগ্রেসের সঙ্গ ত্যাগ করে মহম্মদ আলি জিন্নাহর সঙ্গে যোগ দেন। বিভাজনের পর কাইয়ুম খানকে খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছিল।
 
ক্ষমতায় আসার পর কাইয়ুম খান তাঁর পুরনো বন্ধু তাজ মহম্মদ এবং বিলৌর দীনকে মুসলিম লীগে যোগ দেওয়ার জন্য রাজনৈতিকভাবে তীব্র চাপ দিতে শুরু করেন। কিন্তু তাজ মহম্মদ ছিলেন নিজের আদর্শ ও নীতির প্রতি অটল একজন মানুষ। কাইয়ুম খানের মনে সবসময় একটি সন্দেহ ছিল যে, তাজ মহম্মদের হৃদয় এখনও ভারতের সঙ্গে যুক্ত এবং তিনি যেকোনও সময় পাকিস্তান ছেড়ে চলে যেতে পারেন।
 
পাকিস্তানে উর্দু ভাষায় প্রকাশিত ‘ম্যাঁ কিউঁ নেহি টুটা?’ শীর্ষক বইয়ের প্রচ্ছদ
 
অনেক চাপ প্রয়োগের পরও তাজ মহম্মদ নিজের আদর্শের সঙ্গে আপস করতে এবং মুসলিম লীগে যোগ দিতে অস্বীকার করায় তাঁর প্রতি কাইয়ুম খানের মনোভাব ক্রমশ কঠোর হয়ে ওঠে। সেই সময় থেকেই পুরনো বন্ধুত্বের জায়গায় শুরু হয় তিক্ততার এক অধ্যায়।
 
ড. কাইয়ুম খান নিজেরই পুরনো বন্ধুকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করতে শুরু করেন। তাজ মহম্মদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়, তাঁকে নির্যাতন করা হয় এবং বারবার কারাগারের পিছনে পাঠানো হয়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং এই অপমানজনক আচরণ তাজ মহম্মদের আত্মসম্মানে গভীর আঘাত হানে।
 
শাহরুখ খান
 
অবশেষে সহ্যের সীমা পার হয়ে গেলে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তাজ মহম্মদ তাঁর মাতৃভূমিকে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি পেশোয়ার ছেড়ে চিরদিনের জন্য ভারতে চলে আসেন। ভারতে এসে তিনি নতুন জীবনের সূচনা করেন। এখানেই তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং এই মাটিতেই জন্ম নেন তাঁর পুত্র শাহরুখ খান।
 
বইটিতে ড. সুহাইল খান লিখেছেন, সেই সময় যদি তাজ মহম্মদের সঙ্গে এমন অন্যায় না হতো, যদি তিনি তাঁর প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা পেতেন, তাহলে হয়তো তিনি কখনও পেশোয়ার ছেড়ে ভারতে আসতেন না। আর যদি তিনি পাকিস্তানেই থেকে যেতেন? তাহলে হয়তো শাহরুখ খানও কখনও ভারতে আসতেন না এবং বলিউডও হয়তো তার ‘কিং খান’-কে পেত না। কারণ আজ পর্যন্ত পাকিস্তানের শিল্পজগতে কোনও শিল্পীই ভারতের মাটিতে শাহরুখ যে আন্তর্জাতিক মর্যাদা অর্জন করেছেন, তা অর্জন করতে সক্ষম হননি।
 
ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় তাজ মহম্মদের কাছ থেকে তাঁর আপন মাতৃভূমি কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু সেই একই ঘটনার মধ্য দিয়েই যেন ইতিহাস আরেকটি নতুন কাহিনির জন্ম দিয়েছিল। সেই কাহিনি শাহরুখ খানের, যে শিল্পী ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে বিশ্বজুড়ে অর্জন করেছেন এক অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি।