শ্রীনগরের প্রাচীন শহরের সরু গলিগুলো আজও অতীত ও বর্তমানের স্থাপত্য ঐতিহ্যকে পাশাপাশি বহন করে চলেছে। এই পথ ধরে এগোতে এগোতে নওয়াকাদল সেতু থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে পৌঁছালে দেখা মেলে এমন একটি রাস্তার, যা কাশ্মীরের প্রথম সুফি সাধক সৈয়দ শরফ-উদ-দীন আবদুর রহমানের পবিত্র দরগাহে নিয়ে যায়। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ‘বুলবুল শাহ’ নামেই অধিক পরিচিত।
ঝিলম নদীর (স্থানীয়ভাবে ভেথ) তীরে অবস্থিত এই দরগাহটি বুলবুল লংকর নামে পরিচিত এলাকায় অবস্থিত। এই এলাকার নামও বুলবুল শাহের নাম থেকেই এসেছে। বিশ্বাস করা হয়, চতুর্দশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে তাঁর আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও মানবসেবার আদর্শ অনুসরণ করে এখানেই কাশ্মীরের প্রথম লঙ্গর (সকলের জন্য বিনামূল্যে আহারের ব্যবস্থা) চালু হয়েছিল। বছরের পর বছর এই দরগাহে মূলত স্থানীয় ভক্তদেরই সমাগম ঘটে। ইতিহাসবিদদের মতে, এটিই ছিল কাশ্মীরের প্রথম খানকাহ (সুফি সাধনাকেন্দ্র), যা তুর্কিস্তান থেকে কাশ্মীরে এসে ইসলামের বাণী প্রচারকারী প্রথম সুফি সাধক বুলবুল শাহের স্মৃতিতে নির্মিত হয়েছিল।
বুলবুল শাহের পবিত্র দরগাহ
আজও এই দরগাহ আধ্যাত্মিক সাধনা, উপাসনা এবং ভক্তির এক জীবন্ত কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। নওয়াকাদলে অবস্থিত সরকারি মহিলা মহাবিদ্যালয়ের ঠিক বিপরীতে, সেতুর অপর প্রান্তে এর অবস্থান। ইতিহাস অনুসারে, এর কাছেই একসময় কাশ্মীরের তৎকালীন শাসক রিঞ্চন শাহের রাজপ্রাসাদ ছিল। নওয়াকাদল থেকে বুলবুল শাহের দরগাহের সামনে দিয়ে যাওয়া সরু পথটি ঐতিহাসিক এস আর গঞ্জ, অর্থাৎ মহারাজগঞ্জ বাজারে পৌঁছে যায়। ১৮৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বাজার আজও কাশ্মীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাইকারি বাণিজ্যিক কেন্দ্র।
দরগাহ পরিচালনা সমিতির এক প্রবীণ সদস্য বলেন, "শাহ-ই-হামাদান (মীর সৈয়দ আলি হামাদানি) কাশ্মীরে আসার ৫৯ বছর আগেই বুলবুল শাহ এখানে এসেছিলেন।" তাঁর মতে, শাহ-ই-হামাদানের আগেই কাশ্মীরে ইসলামের বাণী প্রচারের উদ্দেশ্যে আগত তিনজন বিশিষ্ট আলেম ও সুফি ছিলেন যথাক্রমে বুলবুল শাহ (সৈয়দ শরফ-উদ-দীন আবদুর রহমান), যিনি সুহরাওয়ার্দী তরিকার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন; সৈয়দ তাজউদ্দীন, যাঁকে শাহ-ই-হামাদান কাশ্মীরের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য আগাম পাঠিয়েছিলেন; এবং মীর সৈয়দ হাসান চেমনানি, যিনি শাহ-ই-হামাদানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও দূত ছিলেন।
দরগাহের প্রবেশদ্বারের ডানদিকে সম্প্রতি স্থাপিত একটি কালো মার্বেলের ফলকে উর্দুর পাশাপাশি ইংরেজিতেও বুলবুল শাহের জীবন, কাশ্মীরে আগমন এবং তাঁর ধর্মীয় শিক্ষার সংক্ষিপ্ত বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে। ফলকে লেখা রয়েছে, "সৈয়দ শরফ-উদ-দীন, যিনি বুলবুল শাহ সাহেব নামে অধিক পরিচিত, তিনি শাহ নিয়ামত উল্লাহ ফারসির শিষ্য ছিলেন। শাহ নিয়ামত উল্লাহ ফারসি আবার শেখ শিহাব-উদ-দীন সুহরাওয়ার্দীর শিষ্য ছিলেন। সৈয়দ শরফ-উদ-দীনের আদি নিবাস ছিল তুর্কিস্তানে।"
বুলবুল শাহের পবিত্র দরগাহ
নিজের আধ্যাত্মিক গুরুর ইচ্ছানুসারে সৈয়দ শরফ-উদ-দীন (বুলবুল শাহ) কাশ্মীরের রাজা সাহদেবের (খ্রিস্টাব্দ ১৩০১–১৩২০) শাসনকালে উপত্যকায় এসেছিলেন। তাঁকে কাশ্মীরের ইতিহাসে প্রথম পরিচিত সুফি সাধক হিসেবে গণ্য করা হয়।
তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল তৎকালীন বৌদ্ধ শাসক রিঞ্চন শাহকে (খ্রিস্টাব্দ ১৩২০–১৩২৩) ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা। ইসলাম গ্রহণের পর রিঞ্চন শাহ ‘সদর-উদ-দীন’ নাম গ্রহণ করেন। বুলবুল শাহের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবে তিনি তাঁর নামে একটি খানকাহ নির্মাণ করান এবং এর জন্য করমুক্ত জমিও দান করেন। ইতিহাসবিদদের মতে, এটিই ছিল কাশ্মীরের প্রথম খানকাহ। এর লঙ্গর এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, যে মহল্লায় এই খানকাহ নির্মিত হয়েছিল, তা পরবর্তীকালে ‘বুলবুল লংকর’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
দরগাহ পরিচালনা সমিতির সভাপতি আওয়াইস করিম কানুর মতে, ইসলামি চন্দ্রপঞ্জিকা অনুসারে প্রতি বছর ৭ রজব বুলবুল শাহের বার্ষিক উরস উদযাপন করা হয়। এই অনুষ্ঠানে মূলত স্থানীয় ভক্তদের বিপুল সমাগম ঘটে। ওই দিন বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হয় এবং পরদিন মিলাদ পাঠ অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া ইসলামি পঞ্জিকার প্রতিটি মাসের সপ্তম দিন দরগাহে বিশেষ ইবাদত ও দোয়ার আয়োজন করা হয়। এসব অনুষ্ঠানে শতাধিক পুরুষ ও মহিলা ভক্ত উপস্থিত হয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
বুলবুল শাহের পবিত্র দরগাহ
দরগাহ পরিচালনা সমিতি দরগাহের সংরক্ষণ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, লঙ্গরের ব্যবস্থা, ধর্মীয় বয়ান, পবিত্র নিদর্শন (রেলিক) প্রদর্শনসহ সমস্ত দায়িত্ব পালন করে। পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের জন্য একটি দরসগাহ (ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র) পরিচালনা করা হয়, যেখানে বর্তমানে প্রায় ৪০ জন শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করছে।
পুরুষ ও মহিলা নির্বিশেষে প্রতিদিন অসংখ্য ভক্ত দরগাহে এসে বুলবুল শাহের মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। মহিলা ভক্তদের জন্য মাজার বা রওজায় যাওয়ার পৃথক পথের ব্যবস্থা রয়েছে। বুলবুল শাহের কবরের পাশেই তাঁর মাতুল, বিশিষ্ট আলেম ও আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক মুল্লা মহম্মদ আহমদের সমাধিও অবস্থিত।
পরিচালনা সমিতির প্রবীণ সদস্য জাভেদ আহমদ ম্যাট্টু জানান, গত বছর উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর থেকে সুহরাওয়ার্দী তরিকার সঙ্গে যুক্ত একটি পরিবার এই দরগাহ দর্শনে এসেছিল। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু অনুসারী সময়ে সময়ে সুহরাওয়ার্দী তরিকার প্রতি তাঁদের আস্থা প্রকাশ করতে এই পবিত্র স্থানে আসেন।
বুলবুল শাহের পবিত্র দরগাহ
ঐতিহাসিক খানকাহ-ই-বুলবুল শাহ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে গঠিত। এর মূল দরগাহটি রাজ্য সরকারের সহযোগিতায় নির্মিত হয়েছে। ২০০৬ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। এই দরগাহের ভেতরে বুলবুল শাহ এবং তাঁর আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শকের মাজার রয়েছে। দরগাহের সামনের ঝিলম নদীমুখী সবুজ প্রাঙ্গণে ইসলাম গ্রহণের পর সদর-উদ-দীন নামে পরিচিত রিঞ্চন শাহের স্মৃতিসৌধ (Cenotaph) স্থাপন করা হয়েছে, যা কাশ্মীরের ইতিহাসে সুফিবাদ ও ইসলামের প্রসারের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের স্মৃতি বহন করে।
বর্তমানে সমাধির আবরণের মধ্যে থাকা রিঞ্চন শাহের স্মৃতিসৌধটি ১৯৯০ সালের কাছাকাছি সময়ে রাজ্যের আর্কাইভস বিভাগ পুনরায় শনাক্ত করেছিল বলে স্থানীয়রা জানান। যে স্থানে রিঞ্চন শাহ (পরবর্তীকালে সদর-উদ-দীন)-এর শাসনকালে মূল খানকাহ নির্মিত হয়েছিল, সেখানে বর্তমানে জামিয়া মসজিদ ‘মসজিদ-ই-হানাফিয়া’ অবস্থিত।
ইতিহাস অনুসারে, এই খানকাহ একাধিকবার পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে সংঘটিত এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এটি সম্পূর্ণরূপে ভস্মীভূত হয়ে যায়। আট সদস্যের পরিচালনা সমিতির প্রবীণ সদস্য আলি মহম্মদ ওয়ানি অতীতের স্মৃতি স্মরণ করে বলেন, “আমার শৈশবেই খানকাহটি আগুনে পুড়ে গিয়েছিল। তখন আমরা শিশুরা সেই জায়গায় খেলাধুলা করতাম।”
বুলবুল শাহের পবিত্র দরগাহ
দরগাহে সংরক্ষিত শিলালিপি অনুযায়ী, বুলবুল শাহের স্মৃতিতে নির্মিত এই মসজিদ বা খানকাহ প্রথমবার ৭২০ হিজরি (খ্রিস্টাব্দ ১৩২০) সালে নির্মিত হয়েছিল। বর্তমানে যে মসজিদ-খানকাহটি দেখা যায়, সেটি ১৩৯৯ হিজরি (খ্রিস্টাব্দ ১৯৭৯) সালে নির্মাণ করা হয়।
বুলবুল শাহের জন্ম ত্রয়োদশ শতাব্দীতে একটি উইঘুর মুসলিম পরিবারে। তিনি সে সময়ের প্রখ্যাত সুফি পণ্ডিত শেখ শাহাবুদ্দীন সুহরাওয়ার্দী এবং সৈয়দ শাহ নিয়ামতুল্লাহসহ মহান আধ্যাত্মিক গুরুর কাছে সুফিবাদের শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীকালে সুফিবাদের আদর্শ ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার মাধ্যমে ইসলামের বাণী প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি ধর্মীয় সফর শুরু করেন। আধ্যাত্মিক নির্দেশ অনুসারে তিনি প্রায় ১৩০২ খ্রিস্টাব্দে কাশ্মীরে পৌঁছেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়।
খ্রিস্টাব্দ ১৩২৭ (৭২৬ হিজরি) সালে বুলবুল শাহের মৃত্যু হয়। শ্রীনগরের নওয়াকাদলের নিকটবর্তী বর্তমান বুলবুল লংকরে অবস্থিত তাঁর খানকাহের পাশেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। বুলবুল শাহ নামের সঙ্গে একটি জনপ্রিয় কিংবদন্তিও জড়িয়ে আছে। বলা হয়, একদিন তিনি ঝিলম নদীর তীরে অজু করার সময় একটি বুলবুল পাখি (ফারসি ভাষায় ‘বুলবুল’) দেখতে পান।
তাঁর শিষ্যরা সেই পাখিটির উড়ে যাওয়া এবং হঠাৎ অন্তর্ধানকে তাঁর আত্মার আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। এই ঘটনার পর বুলবুল শাহ তাঁর এক শিষ্যকে এক অলৌকিক আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার অনুভূতি দিয়েছিলেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এরপর থেকেই তিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘বুলবুল শাহ’ নামেই সর্বাধিক পরিচিত হয়ে ওঠেন।