শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ
পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার পান্ডুয়া শুধু একটি ঐতিহাসিক জনপদ নয়; এটি বাংলার সুফি ঐতিহ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র। একসময় বাংলার রাজধানী হিসেবে খ্যাত এই অঞ্চল মধ্যযুগে ধর্মীয় শিক্ষা, আধ্যাত্মিক সাধনা এবং মানবকল্যাণের এক অনন্য মিলনভূমিতে পরিণত হয়েছিল। সেই ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন দুই মহান সুফি সাধক, হজরত মখদুম শেখ আলাউল হক পান্ডভী (রহ.) এবং তাঁর সুযোগ্য পুত্র হজরত নূর কুতুবুল আলম (রহ.)। তাঁদের প্রতিষ্ঠিত খানকাহ আজও বাংলার আধ্যাত্মিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
চতুর্দশ শতকে যখন বাংলার সুলতানি শাসনের বিকাশ ঘটছে, তখনই মধ্য এশিয়া ও পারস্যের সুফি ভাবধারা বাংলার মাটিতে গভীরভাবে শিকড় গাড়তে শুরু করে। সেই সময়ে হজরত মখদুম শেখ আলাউল হক পান্ডভী (রহ.) পান্ডুয়াকে তাঁর সাধনা ও মানবসেবার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত খানকাহ ছিল ধর্মীয় উপাসনার স্থানই নয়; বরং ছিল শিক্ষা, সমাজসংস্কার, দরিদ্রসেবা এবং মানবিক মূল্যবোধ গঠনের এক অনন্য প্রতিষ্ঠান।
খানকাহে প্রতিদিন কোরআন, হাদিস, ইসলামি দর্শন, ফিকহ ও নৈতিক শিক্ষার পাঠ চলত। দূর-দূরান্ত থেকে আগত শিক্ষার্থী, দরবেশ ও সাধারণ মানুষ এখানে আশ্রয় ও শিক্ষা লাভ করতেন। পথিকদের জন্য ছিল বিশ্রামের ব্যবস্থা, অভাবী মানুষের জন্য ছিল আহারের ব্যবস্থা। সুফি দর্শনের মূলমন্ত্র—মানুষের সেবা, বিনয়, সহমর্মিতা এবং আত্মশুদ্ধি—এই খানকাহের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হতো।
পিতার আদর্শকে আরও সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করেন হজরত নূর কুতুবুল আলম (রহ.)। তিনি শুধু একজন সুফি সাধকই ছিলেন না, বরং মধ্যযুগীয় বাংলার অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামি চিন্তাবিদ ও সমাজনেতা। তাঁর আধ্যাত্মিক প্রভাব বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে উত্তর ভারত এবং তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, তাঁর খানকাহ ছিল জ্ঞানচর্চা, সমাজসংগঠন এবং মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
ইতিহাসের নানা সূত্রে জানা যায়, বাংলার সুলতানরাও এই সুফি সাধকদের গভীর শ্রদ্ধা করতেন এবং তাঁদের মতামতকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তবে তাঁরা কখনও রাজক্ষমতার অংশ হয়ে ওঠেননি; বরং সাধারণ মানুষের মধ্যেই থেকে ন্যায়, সততা এবং মানবিকতার শিক্ষা প্রচার করেছেন। এই কারণেই তাঁদের খানকাহ সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
আজও পান্ডুয়ায় অবস্থিত হজরত মখদুম শেখ আলাউল হক পান্ডভী (রহ.) এবং হজরত নূর কুতুবুল আলম (রহ.)-এর দরগাহ ও খানকাহে প্রতিদিন বহু ভক্ত ও দর্শনার্থী আসেন। মুসলিমদের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মানুষেরও এখানে আগমন ঘটে। কেউ দোয়া চান, কেউ মানত করেন, আবার কেউ ইতিহাস ও স্থাপত্যের টানে এই ঐতিহ্যবাহী স্থানে আসেন। প্রতিবছর ওরস শরিফ উপলক্ষে হাজার হাজার মানুষের সমাগমে পান্ডুয়া এক মহামিলনক্ষেত্রে পরিণত হয়।
পান্ডুয়ার এই সুফি কেন্দ্রগুলির বিশেষত্ব শুধু ধর্মীয় গুরুত্বে সীমাবদ্ধ নয়। আশপাশে অবস্থিত ঐতিহাসিক একলাখি সমাধি, আদিনা মসজিদ এবং অন্যান্য মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের সঙ্গে এই খানকাহগুলির ঘনিষ্ঠ ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে পান্ডুয়া একদিকে যেমন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষী, অন্যদিকে তেমনি সুফি দর্শন ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতিরও এক অমূল্য ভাণ্ডার।
বর্তমানে এই ঐতিহাসিক খানকাহকে ঘিরে ধর্মীয় কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলেও ইতিহাসবিদদের মতে, এর বহু প্রাচীন দলিল, পাণ্ডুলিপি ও মৌখিক ইতিহাস এখনও পর্যাপ্তভাবে সংরক্ষিত হয়নি। সুসংগঠিত গবেষণা, বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ এবং পর্যটন-সহায়ক পরিকাঠামো গড়ে উঠলে এই সুফি ঐতিহ্য দেশ-বিদেশের গবেষক ও ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে আরও পরিচিত হয়ে উঠতে পারে।
আজকের বিভক্ত ও সংঘাতপূর্ণ বিশ্বে পান্ডুয়ার এই খানকাহ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের হৃদয় জয় করার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ভালোবাসা, জ্ঞান, সহমর্মিতা এবং সেবা। সাতশো বছরেরও বেশি সময় ধরে হজরত মখদুম শেখ আলাউল হক পান্ডভী (রহ.) এবং হজরত নূর কুতুবুল আলম (রহ.)-এর শিক্ষা বাংলার সমাজে যে সম্প্রীতি ও মানবতার বীজ বপন করেছে, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
মালদার পান্ডুয়ার এই খানকাহ তাই শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়; এটি বাংলার ইতিহাস, সুফি দর্শন, শিক্ষা, মানবসেবা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অমর প্রতীক, যা যুগের পর যুগ মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বালিয়ে চলেছে।