বিশ্বকাপের ফ্রেমে অসমের গীতিকা, ইতিহাস গড়লেন ভারতের একমাত্র মহিলা চিত্রসাংবাদিক

Story by  Sudip sharma chowdhury | Posted by  Aparna Das • 16 h ago
গীতিকা তালুকদার
গীতিকা তালুকদার
 
সুদীপ শর্মা চৌধুরী 

ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, এটি আবেগ, ইতিহাস এবং স্বপ্নের এক বৈশ্বিক মঞ্চ। মাঠে ফুটবলাররা যেমন তাঁদের পারফরম্যান্সে কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেন, তেমনই মাঠের বাইরের কিছু মানুষ সেই স্মরণীয় মুহূর্তগুলোকে চিরস্থায়ী করে রাখেন ক্যামেরার ফ্রেমে। সেই বিরল কৃতীদের তালিকায় এবার আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে অসমের কন্যা গীতিকা তালুকদারের নাম।
 
২০২৬ সালের FIFA পুরুষ বিশ্বকাপ কভার করার জন্য আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেয়েছেন গীতিকা। এর মধ্য দিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো তিনি পুরুষদের FIFA বিশ্বকাপ কভার করতে চলেছেন। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ, ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের পর এবার যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত হতে চলা ২০২৬ বিশ্বকাপেও তাঁর ক্যামেরা বন্দি করবে বিশ্ব ফুটবলের সেরা মুহূর্তগুলো। আর এখানেই তৈরি হয়েছে ইতিহাস, গীতিকাই ভারতের একমাত্র নারী চিত্রসাংবাদিক, যিনি পরপর তিনটি FIFA পুরুষ বিশ্বকাপ কভার করার সুযোগ পেলেন।
 
এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, ভারতীয় ক্রীড়া সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও এক গর্বের অধ্যায়। এমন এক পেশায় তিনি নিজের জায়গা তৈরি করেছেন, যেখানে এখনও নারীদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম। অথচ আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরগুলিতে তাঁর অবাধ বিচরণ নতুন প্রজন্মের বহু তরুণীকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
 
অরুণাচল প্রদেশে জন্ম হলেও গীতিকার পারিবারিক শিকড় অসমে। বাবার চাকরির সূত্রে দেশের নানা প্রান্তে বেড়ে ওঠা গীতিকার ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। পরবর্তীতে দক্ষিণ কোরিয়ার Seoul National University-এ গ্লোবাল স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। শুধু পড়াশোনাই নয়, স্পোর্টস মিডিয়ায় লিঙ্গ বৈষম্য নিয়েও গবেষণা করেছেন গীতিকা, যা তাঁর পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
 
তবে এই সাফল্যের পথ মোটেও সহজ ছিল না। ব্যয়বহুল ক্যামেরা সরঞ্জাম, দীর্ঘ সফর, অনিশ্চিত কর্মপরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরে প্রবেশাধিকারের জটিলতা, সবকিছুর সঙ্গেই লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু প্রতিটি বাধাকে তিনি শক্তিতে পরিণত করেছেন। ধীরে ধীরে তাঁর কাজ আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসা কুড়িয়েছে।
 
আজ গীতিকার অভিজ্ঞতার তালিকায় রয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসর। পুরুষদের FIFA বিশ্বকাপের পাশাপাশি তিনি কভার করেছেন ২০১৯ ও ২০২৩ সালের FIFA নারী বিশ্বকাপ, টোকিও ও প্যারিস অলিম্পিক, কমনওয়েলথ গেমস, আইপিএল, আইএসএল-সহ বহু বড় প্রতিযোগিতা। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির স্বীকৃতি পেয়ে প্যারিস অলিম্পিক কভার করা ভারতের প্রথম নারী চিত্রসাংবাদিক হিসেবেও ইতিহাস গড়েন তিনি।
 
গীতিকার কাজের বিশেষত্ব শুধু নিখুঁত ছবি তোলায় নয়, ছবির মাধ্যমে গল্প বলায়। ফুটবলারের চোখের জল, গোলের পর উচ্ছ্বাস, সমর্থকদের আবেগ কিংবা মাঠের অদেখা মুহূর্ত, সবই তাঁর ক্যামেরায় জীবন্ত হয়ে ওঠে। তাই তাঁর প্রতিটি ছবি যেন সময়, অনুভূতি এবং ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল।
 
২০২৬ সালের বিশ্বকাপে আবারও বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের লড়াইয়ের সাক্ষী থাকবে তাঁর ক্যামেরা। বিশ্ব ফুটবলের নতুন ইতিহাস যখন লেখা হবে, তখন সেই ইতিহাসের বহু স্মরণীয় মুহূর্ত ধরা পড়বে অসমের এক কন্যার ফ্রেমে। গীতিকা তালুকদারের এই সাফল্য প্রমাণ করে, প্রতিভা, অধ্যবসায় এবং স্বপ্ন থাকলে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা কখনও বাধা হতে পারে না।