কলকাতা ঃ
ম্যাচের ঘড়িতে তখন ৭৩ মিনিট। স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে হাজার হাজার সমর্থকের বুক ধুকপুক করছে। এক গোলের সমতা ফিরেছে ঠিকই, কিন্তু ইতিহাস লিখতে দরকার ছিল আর একটি মুহূর্ত। আর সেই মাহেন্দ্রক্ষণই যেন নেমে এল বজ্রপাতের মতো। বিপিনের নিখুঁত পাস থেকে রশিদের ডান পায়ের আলতো স্পর্শ—বল গড়িয়ে জালে। মুহূর্তের মধ্যে বিস্ফোরিত হলো গ্যালারি। লাল-হলুদ আবেগে কেঁপে উঠল আট হাজার দর্শকের স্টেডিয়াম।
অবশেষে ২২ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। ইস্ট বেঙ্গল এফসি আবার ভারতসেরা। খেতাব নির্ণায়ক ম্যাচে ইন্টার কাশীকে ২-১ গোলে হারিয়ে নতুন ইতিহাস গড়ল অস্কার ব্রুজোর দল।
প্রথমার্ধে যেন ছায়া মাত্র ছিল ইস্টবেঙ্গল। মাঝমাঠে ছন্দহীনতা, আক্রমণে ধার নেই। ১৪ মিনিটে ডেভিড মুনোজের লং বল থেকে অ্যালফ্রেড মোয়ার অসাধারণ লব প্রভসুখন গিলকে পরাস্ত করে এগিয়ে দেয় ইন্টার কাশীকে। এরপর একের পর এক আক্রমণে কাঁপতে থাকে লাল-হলুদ রক্ষণ। কিন্তু গোলপোস্টের নীচে পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন প্রভসুখন গিল। তাঁর একাধিক দুরন্ত সেভই ম্যাচে বাঁচিয়ে রাখে দলকে।
অন্যদিকে, সুযোগ পেয়েও গোল করতে ব্যর্থ হন এজেজ্জারি। বিপিনের ক্রস থেকে নিশ্চিত সুযোগ নষ্ট হয়। প্রথম ৪৫ মিনিটে ম্যাচ কার্যত শেষ করে দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল কাশী। কিন্তু ফুটবলের সৌন্দর্যই হলো—একটা সুযোগ নষ্ট মানেই ফিরে আসার রাস্তা খোলা।
বিরতির সময় অস্কার ব্রুজোর সাহসী সিদ্ধান্ত বদলে দেয় ম্যাচের রূপ। তিন ডিফেন্সে চলে গিয়ে আক্রমণ বাড়িয়ে দেন তিনি। রাকিপের জায়গায় ডেভিডকে নামিয়ে আরও আক্রমণাত্মক ফুটবলে ঝাঁপায় ইস্টবেঙ্গল।
৫০ মিনিটে সমতা ফেরে। আনোয়ারের পাস থেকে এজেজ্জারি বক্সে ঢুকে পড়ে কিপার শুভমকে কাটিয়ে নিখুঁত প্লেসিংয়ে বল জালে জড়ান। সেই গোল যেন ঘুম ভাঙায় গোটা দলকে। মাঠে তখন একটাই দল—ইস্টবেঙ্গল।
এরপর নন্দকুমার ও চুংনুঙ্গাকে নামিয়ে আরও গতি বাড়ান অস্কার। আর ৭৩ মিনিটে এল সেই সোনালি মুহূর্ত। রশিদের গোল শুধু ম্যাচ জেতায়নি, ফিরিয়ে দিয়েছে হারিয়ে যাওয়া গৌরবও।
শেষ বাঁশি বাজতেই আর মাঠ-গ্যালারির সীমারেখা রইল না। সমর্থকের ঢল নেমে এল মাঠে। সবুজ ঘাস ঢেকে গেল লাল-হলুদ আবেগে। জ্বলে উঠল মশাল, আকাশ কাঁপল স্লোগানে। সমর্থকদের কাঁধে উঠে নাচলেন এজেজ্জারি ও কোচ অস্কার ব্রুজোন।
সুভাষ ভৌমিকের পর আবার এক বিদেশি কোচের হাত ধরে সর্বভারতীয় ট্রফি এল ইস্টবেঙ্গলে। এই জয় শুধু একটি ট্রফি নয়—এটি একটি প্রত্যাবর্তনের গল্প, অপমান ভুলে উঠে দাঁড়ানোর গল্প, আর কোটি সমর্থকের অশ্রু মুছে দেওয়ার গল্প।