রাজমিস্ত্রির সহকারী থেকে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্বপ্ন: ইগর থিয়াগোর অবিশ্বাস্য উত্থানের গল্প

Story by  Shanti Roy Chowdhury | Posted by  Aparna Das • 12 h ago
ইগর থিয়াগো
ইগর থিয়াগো
 
শান্তিপ্রিয় রায়চৌধুরী

ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, কখনও কখনও এটি বেঁচে থাকার গল্প। ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াই, দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ আর অসম্ভবকে সম্ভব করার এক মানবিক উপাখ্যান। ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের ব্রাজিল দলে জায়গা করে নেওয়া ইগর থিয়াগোর জীবনকাহিনি যেন সেই বাস্তবতারই জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। আজ তিনি ব্রাজিলের হলুদ-সবুজ জার্সিতে বিশ্বকাপের আলোচনায়।
 
কিন্তু কয়েক বছর আগেও তাঁর পরিচয় ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, রাজমিস্ত্রির সহকারী, সবজি বিক্রেতা, লিফলেট বিলি করা কিশোর কিংবা রাস্তার ধারে গাড়ি ধোয়া এক শ্রমজীবী ছেলে।
 
ইগর থিয়াগো
 
ক্ষুধা আর স্বপ্নের একসঙ্গে বেড়ে ওঠা
 
ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়ার উপকণ্ঠের গামা শহরের দরিদ্র পরিবারে জন্ম ইগর থিয়াগোর। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। মা মারিয়া দিভা ও ভাই মাইকনের মুখে খাবার তুলে দেওয়াই হয়ে ওঠে প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু দারিদ্র্য তাঁর স্বপ্ন কেড়ে নিতে পারেনি। দিনে কাজ, রাতে ফুটবল, এই ছিল তাঁর জীবন। কখনও নির্মাণ শ্রমিকের সহকারী, কখনও বাজারে সবজি বিক্রি, কখনও গাড়ি ধোয়ার কাজ করেও ফুটবলের অনুশীলন বন্ধ করেননি।ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (CBF)-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "ছোটবেলার কঠিন কাজগুলোই আমাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে। জীবনের সাধারণ জিনিসগুলোর মূল্য বুঝতে শিখিয়েছে।"
 
প্রথম ধাক্কা, তারপর নতুন পথ
 
অ্যাথলেটিকো পারানায়েন্সের ট্রায়ালে বাদ পড়েছিলেন ইগর। অনেকের স্বপ্ন সেখানেই ভেঙে যায়। কিন্তু তাঁর জীবনে আশীর্বাদ হয়ে আসেন ব্রাজিলের সাবেক ফুটবলার টিকো।টিকোর পরামর্শে ছোট ক্লাব ভেরে এফসি-তে যোগ দেন তিনি। অনূর্ধ্ব-১৭ প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে নজর কেড়ে নেন ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ক্রুজেইরোর। কিন্তু বড় ক্লাবের চাপ, সমালোচনা আর প্রত্যাশার ভার তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল।
 
ইগরের ভাষায়, "মানুষের সমালোচনা ও প্রশংসা কীভাবে সামলাতে হয়, ক্রুজেইরো আমাকে সেটাই শিখিয়েছে।" ইউরোপে সংগ্রাম থেকে সাফল্য। ক্রুজেইরোর আর্থিক সংকটের কারণে তাঁকে তুলনামূলক কম মূল্যে বিক্রি করে দেওয়া হয় বুলগেরিয়ার ক্লাব লুদোগোরেতস-এ। সেখান থেকে বেলজিয়ামের ক্লাব ব্রুজ, আর তারপর ইংল্যান্ডের প্রিমিয়ার লিগ। ২০২৪ সালে প্রায় ২১ কোটি রিয়াল ট্রান্সফার ফিতে তিনি যোগ দেন ব্রেন্টফোর্ডে।ইংল্যান্ডে পৌঁছেই বদলে যায় সবকিছু।
 
ইগর থিয়াগো
 
প্রিমিয়ার লিগে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে তিনি গোলের পর গোল করতে থাকেন। ইউরোপীয় ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর শারীরিক শক্তি, বক্সের ভেতরে অবস্থান নেওয়ার ক্ষমতা এবং লড়াকু মানসিকতা তাঁকে আধুনিক স্ট্রাইকারদের মধ্যে বিশেষভাবে আলাদা করে তুলেছে।
 
আনচেলত্তির আস্থার প্রতিদান
 
ব্রেন্টফোর্ডের হয়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স নজর এড়ায়নি ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তির। বিশ্বকাপের আগে তাঁকে ডেকে পাঠানো হয় ব্রাজিলের মূল দলে। ইতোমধ্যেই জাতীয় দলের হয়ে নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক গোলও করে ফেলেছেন তিনি।যে ছেলেটি একদিন ক্ষুধার সঙ্গে যুদ্ধ করেছে, আজ সেই ইগর থিয়াগো ব্রাজিলের সম্ভাব্য ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের অভিযানের অন্যতম ভরসা।
 
ফুটবলের বাইরেও এক অনুপ্রেরণা
 
ইগর থিয়াগোর গল্প শুধু গোল করার গল্প নয়। এটি সামাজিক বৈষম্য ভেঙে উঠে আসার গল্প। এটি প্রমাণ করে যে প্রতিভার সঙ্গে যদি অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস এবং কঠোর পরিশ্রম যোগ হয়, তাহলে ভাগ্যের লিখনও বদলে দেওয়া যায়।
 

বিশ্বকাপের ঝলমলে আলোয় যখন ব্রাজিলের জার্সিতে তাঁকে দেখা যাবে, তখন হয়তো বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ একজন স্ট্রাইকারকে দেখবে। কিন্তু তাঁর মায়ের চোখে তিনি সেই ছেলেটিই, যে একদিন সংসার চালাতে মাথায় ইট বহন করেছিল।
 
স্বপ্ন দেখার নাম ইগর থিয়াগো
 
ফুটবলের ইতিহাসে অনেক তারকা এসেছে-গেছে। কিন্তু কিছু গল্প থাকে, যা পরিসংখ্যানের গণ্ডি ছাড়িয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। রাজমিস্ত্রির সহকারী থেকে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াড, ইগর থিয়াগোর যাত্রাপথ সেই বিরল গল্পগুলোর একটি। হয়তো বিশ্বকাপে তিনি কত গোল করবেন, তা সময় বলবে। কিন্তু জীবনের ম্যাচে তিনি ইতোমধ্যেই জিতে গেছেন। কারণ, ছেঁড়া বুট পায়ে যে কিশোর একদিন ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়েছিল, আজ সেই ইগর থিয়াগো কোটি মানুষের স্বপ্ন ও অনুপ্রেরণার নাম।