রাজীব নারায়ণ
পৃথিবী যেন আর থামে না। একদিকে যুদ্ধের আগুন, অন্যদিকে বাণিজ্যিক টানাপোড়েন, রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সামাজিক বিভাজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতি মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষোভ, অবিশ্বাস আর উদ্বেগের গল্প। এমন এক অস্থির সময়ে প্রতি চার বছর অন্তর আসে এক ব্যতিক্রমী আয়োজন, যা কয়েক সপ্তাহের জন্য হলেও বিশ্বকে একই আবেগে বেঁধে ফেলে, ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ।
বিশ্বকাপ কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি আজকের বিভক্ত পৃথিবীর অন্যতম শেষ সত্যিকারের বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে টেলিভিশন, ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মিলিয়ে প্রায় ৫০০ কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে যুক্ত হয়েছিলেন। আর আর্জেন্টিনা-ফ্রান্সের ফাইনাল ম্যাচ দেখেছিলেন প্রায় ১৫০ কোটি দর্শক।
বর্তমান বিশ্বে মানুষ অ্যালগরিদম-নির্ভর ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতায় বাস করে। কেউ এক ধরনের সংবাদ দেখে, কেউ অন্য ধরনের বিনোদন উপভোগ করে। ফলে সবার একসঙ্গে একই আবেগ অনুভব করার সুযোগ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। কিন্তু বিশ্বকাপ সেই প্রবণতাকে ভেঙে দেয়।
মেক্সিকো সিটিতে করা একটি গোলের উল্লাস ছড়িয়ে পড়ে মুম্বইয়ে। নিউ জার্সিতে মিস হওয়া একটি পেনাল্টি নিয়ে আলোচনা হয় কেরালায়। টরন্টোর কোনো অঘটন কলকাতার চায়ের আড্ডার বিষয় হয়ে ওঠে। কয়েক সপ্তাহের জন্য হলেও কোটি কোটি মানুষ একই সঙ্গে আশা, আনন্দ, হতাশা ও বিস্ময়ের অনুভূতি ভাগ করে নেয়।
ভারতের ফুটবল-প্যারাডক্স
এই বৈশ্বিক আবেগের সবচেয়ে চমকপ্রদ উদাহরণ সম্ভবত ভারত। ভারতীয় ফুটবল দল কখনও বিশ্বকাপে খেলেনি। তবুও বিশ্বকাপ ঘিরে ভারতীয়দের উন্মাদনা বিশ্বের অনেক অংশগ্রহণকারী দেশের চেয়েও বেশি।
কলকাতায় ক্লাব-সমর্থন অনেক সময় রাজনৈতিক আনুগত্যের মতোই তীব্র। কেরালায় ফুটবল দৈনন্দিন জীবনের অংশ। গোয়া ও উত্তর-পূর্ব ভারতে ফুটবল প্রায় ধর্মের মর্যাদা পেয়েছে। বিশ্বকাপ এলেই রাস্তায় রাস্তায় উড়তে থাকে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা বা জার্মানির পতাকা; গভীর রাত পর্যন্ত চলে উৎসব।
ভারত বিশ্বকাপ দেখে নিজের দল খেলছে বলে নয়, বরং এটি যে উৎকর্ষ, নাটকীয়তা ও সম্ভাবনার এক মহোৎসব, সেই অনুভূতি থেকেই। এটাই ফুটবলের সার্বজনীন শক্তির সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
মনোযোগের অর্থনীতি ও বিশ্বকাপ
আজকের বিশ্বে মানুষের মনোযোগই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল ও সংবাদমাধ্যম, সবাই তার জন্য প্রতিযোগিতায় নেমেছে। বিশ্বকাপ সেই বিরল কয়েকটি আয়োজনের একটি, যা কয়েক সপ্তাহের জন্য পুরো বিশ্বের মনোযোগ নিজেদের দিকে টেনে নিতে পারে।
তাই সম্প্রচার স্বত্ব, বিজ্ঞাপন এবং স্পনসরশিপ ঘিরে চলে তীব্র প্রতিযোগিতা। বিশ্বকাপ শুধু খেলার মঞ্চ নয়; এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও। টেলিভিশন নেটওয়ার্ক, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও বিজ্ঞাপনদাতাদের জন্য এটি বিপুল সম্ভাবনার উৎস।
ফুটবলের বাইরেও এক শিক্ষা
বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এটি পার্থক্যকে অস্বীকার করে না, বরং তাকে সহাবস্থানের জায়গা দেয়। জাতীয় গর্ব থাকবে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, আবেগ থাকবে; তবুও সবাই একই গল্পের অংশ হয়ে ওঠে।
পৃথিবীতে মতের অভাব নেই; অভাব রয়েছে একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মতো সাধারণ পরিসরের। মানুষকে একত্রিত করার মতো অনেক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়েছে। এমন সময় ফুটবল মনে করিয়ে দেয়, বৈচিত্র্যের মধ্যেও ঐক্য সম্ভব।
বিশ্বকাপ যুদ্ধ থামাবে না, মূল্যস্ফীতি কমাবে না কিংবা ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব মিটিয়ে দেবে না। ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার পর পৃথিবী আবার ফিরে যাবে তার পুরোনো উদ্বেগ ও সংঘাতে।
কিন্তু কয়েক সপ্তাহের জন্য হলেও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ একসঙ্গে হাসবে, কাঁদবে, উল্লাস করবে এবং স্বপ্ন দেখবে। বিভক্ত এই সময়ে, হয়তো এটাই ফিফা বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় জয়, মানুষকে আবার মানুষ হিসেবে একে অপরের কাছাকাছি নিয়ে আসা।
কলকাতার ফুটবলপাগল গলি, কেরালার চায়ের দোকান কিংবা উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি জনপদ, ভারতও সেই বৈশ্বিক গল্পেরই অংশ। মাঠে তেরঙ্গা না থাকলেও, বিশ্বকাপের আবেগে ভারত বরাবরের মতোই থাকবে বিশ্বের সঙ্গে একই ছন্দে।
(রাজীব নারায়ণ: প্রবীণ সাংবাদিক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ)