হাকিম আবদুল হামিদ: চিকিৎসাকে মানবসেবার মিশনে রূপ দেওয়া এক দূরদর্শী স্বপ্নদ্রষ্টা
এম. আফশার আলম
জীবনের সার্থকতা শুধু কতটা দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকা, তার মধ্যে নয়; বরং সেই জীবন কতটা অর্থবহ হয়ে উঠেছে, সেটিই আসল কথা। কেউ বিপুল সম্পদ অর্জনের মাধ্যমে নিজের জীবনকে সার্থক করে তোলেন, আবার কেউ সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছু রেখে গিয়ে জীবনের প্রকৃত অর্থ খুঁজে পান। হাকিম আবদুল হামিদ ছিলেন তেমনই এক বিরল মানুষ। দক্ষিণ দিল্লিতে অবস্থিত ডিমড-টু-বি ইউনিভার্সিটি জামিয়া হামদর্দের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। ১৪ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটি তার প্রতিষ্ঠা দিবস উদযাপন করছে।
১৯০৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে জন্মগ্রহণ করেন আবদুল হামিদ। তাঁর জীবনকে শুধু একজন চিকিৎসকের জীবন হিসেবে দেখলে তাঁর অবদানের ব্যাপ্তি বোঝা যায় না। চিকিৎসার পারিবারিক ঐতিহ্যকে তিনি ধীরে ধীরে শিক্ষা, গবেষণা, স্বাস্থ্য পরিষেবা ও জনকল্যাণের এক বৃহৎ উদ্যোগে পরিণত করেছিলেন।
হাকিম আবদুল হামিদ
চিকিৎসা ও সমাজসেবার সঙ্গে তাঁর পরিবারের সম্পর্ক ছিল গভীর। তাঁর বাবা হাকিম হাফিজ আবদুল মজিদ ১৯০৬ সালে ‘হামদর্দ দাওয়াখানা’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। উর্দু ভাষায় ‘হামদর্দ’ বলতে বোঝায় এমন একজন মানুষকে, যিনি অন্যের কষ্ট অনুভব করেন। এই মানবিক অনুভূতিই পরবর্তীকালে হাকিম আবদুল হামিদের জীবনের মূল দর্শনে পরিণত হয়। বাবার কাছ থেকে তিনি শুধু একটি ব্যবসা উত্তরাধিকারসূত্রে পাননি, পেয়েছিলেন মানুষের প্রতি একটি দায়িত্ববোধও। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের উপকারে আসবে, এমন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে হামদর্দকে গড়ে তুলতেই তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন।
ইউনানি চিকিৎসার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকলেও হাকিম আবদুল হামিদের চিন্তাভাবনা শুধু রোগীর চিকিৎসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, ইউনানি চিকিৎসাকে আগামী প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দিতে হলে তার জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, কঠোর গবেষণা এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির যথাযথ ব্যবহার।
তাঁর বিশ্বাস ছিল, ঐতিহ্য ও আধুনিক বিজ্ঞান একে অপরের পরিপন্থী নয়। বরং প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতির মূল্যবান জ্ঞানকে সংরক্ষণ করে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ও গবেষণার মাধ্যমে তাকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। এই দূরদর্শী চিন্তাই তাঁকে ইউনানি চিকিৎসার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে পরিণত করে।
১৯৪৭ সালে দেশ এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। দেশভাগের অভিঘাতে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়েছিল। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল অবিশ্বাস, হিংসা ও অনিশ্চয়তা। এমন এক অস্থির সময়েও হাকিম আবদুল হামিদের চিন্তা থেমে থাকেনি। তিনি ভাবছিলেন ভবিষ্যতের ভারতের জন্য কীভাবে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যায়। সেই সময়েই তিনি হামদর্দ চ্যারিটেবল ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন এবং হামদর্দের উপার্জন সমাজসেবায় ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত তাঁর সম্পদ সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিকেই স্পষ্ট করে। তাঁর কাছে সম্পদ ব্যক্তিগত স্বার্থে জমিয়ে রাখার বিষয় ছিল না; বরং সমাজের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য তা ছিল এক ধরনের আমানত।
হাকিম আবদুল হামিদ
এরপর একে একে আরও প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে তাঁর উদ্যোগে। ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় হামদর্দ তিব্বি কলেজ এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক স্টাডিজ; ১৯৬৪ সালে হামদর্দ ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন এবং ১৯৭২ সালে হামদর্দ কলেজ অব ফার্মেসি প্রতিষ্ঠিত হয়।
সময়ের সঙ্গে এই পরিসর আরও বিস্তৃত হয়। হামদর্দ এডুকেশন সোসাইটি, হামদর্দ পাবলিক স্কুল, গালিব অ্যাকাডেমি এবং হামদর্দ ইনস্টিটিউট অব হিস্টোরিক্যাল রিসার্চের মতো প্রতিষ্ঠানও এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়। তাঁর লক্ষ্য ছিল এমন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে চিকিৎসা ও ফার্মেসির পাশাপাশি শিক্ষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং গবেষণাও সমানভাবে বিকশিত হতে পারে।
দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ১৯৮৯ সালে। হাকিম আবদুল হামিদের প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে একত্রিত করে ‘জামিয়া হামদর্দ’-কে ডিমড ইউনিভার্সিটির মর্যাদা দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে তাঁর কয়েক দশকের স্বপ্ন ও পরিশ্রম বাস্তব রূপ পায়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা চ্যান্সেলর হন। জামিয়া হামদর্দ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে হামদর্দের নিজস্ব তহবিলের পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন, জামিয়া হামদর্দের পেছনে কোনো সরকারি যন্ত্র বা কর্পোরেট গোষ্ঠীর শক্তিশালী সহায়তা ছিল না। এর ভিত্তি তৈরি হয়েছিল একজন মানুষের দৃঢ় বিশ্বাসের ওপর, শিক্ষা সমাজের প্রতি মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেবা হয়ে উঠতে পারে।
তবে হাকিম আবদুল হামিদকে কেবল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা একজন মানুষ হিসেবে স্মরণ করলে তাঁর প্রকৃত পরিচয়ের অনেকটাই আড়ালে থেকে যাবে। তিনি প্রথমত ছিলেন একজন চিকিৎসক। অন্যের কষ্ট উপলব্ধি করা তাঁর স্বভাবেরই অংশ ছিল। তাঁর কাছে একজন অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা করা এবং দরিদ্র কোনো শিশুকে শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়া, দুটি কাজই একই মানবিক ও সহমর্মিতার চেতনা থেকে উৎসারিত। মানুষের জীবনকে আরও উন্নত করে তোলাই ছিল তাঁর সারাজীবনের প্রচেষ্টা।
ওষুধ শরীরকে সুস্থ করে, আর শিক্ষা মানুষের মনকে বিকশিত করে। হাকিম সাহেবের কাছে এই দুটিই ছিল একই সমাজসেবার বৃহত্তর উদ্দেশ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সম্ভবত সেই কারণেই তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলিতে হাসপাতাল ও চিকিৎসাশিক্ষার পাশাপাশি মানবিকবিদ্যা, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্তরেও হাকিম আবদুল হামিদের অবদান স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৬৫ সালে তিনি পদ্মশ্রী এবং ১৯৯২ সালে পদ্মভূষণে সম্মানিত হন। ১৯৮৩ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন তাঁকে অ্যাভিসেনা অ্যাওয়ার্ডে সম্মানিত করে। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
তবে তাঁর ব্যক্তিত্বের দিকে তাকালে মনে হয়, এই পুরস্কার ও সম্মানের চেয়ে কোনো অভাবী মানুষকে চিকিৎসার সুযোগ করে দেওয়া কিংবা দরিদ্র কোনো ছাত্রের পড়াশোনার ব্যবস্থা করতে পারাই হয়তো তাঁকে বেশি আনন্দ দিত। কারণ তাঁর কাছে সাফল্যের অর্থ ছিল শুধু পুরস্কার অর্জন নয়; বরং অন্য একজন মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারা।
১৯৯৯ সালে হাকিম আবদুল হামিদ প্রয়াত হন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে তাঁর কাজের সমাপ্তি ঘটেনি। আজও তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলিতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, তাঁর হাসপাতালগুলিতে রোগীরা চিকিৎসা পাচ্ছেন এবং গবেষণা ও শিক্ষার কাজও সমানভাবে এগিয়ে চলেছে।
জামিয়া হামদর্দের ক্যাম্পাস তাই শুধুমাত্র একগুচ্ছ ভবনের সমষ্টি নয়। এটি এমন এক চিন্তার জীবন্ত প্রমাণ, যেখানে একজন মানুষ ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবেছিলেন। হাকিম সাহেব এই প্রতিষ্ঠানগুলি গড়ে তুলেছিলেন অনেকটা একজন দূরদর্শী মানুষের হাতে গাছ লাগানোর মতো করে, তিনি জানতেন, হয়তো নিজে সেই গাছের ছায়ায় বসতে পারবেন না, কিন্তু ভবিষ্যতের মানুষ নিশ্চয়ই তার ছায়া পাবে। তাঁর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলির একটি ছিল এই দূরদর্শিতাই।
আজ তাঁর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক মানুষের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল, তাঁর উত্তরাধিকার যেন শুধু প্রতিষ্ঠানের নাম কিংবা স্মৃতিসৌধে সীমাবদ্ধ না থাকে। ‘হামদর্দ’ শব্দের অর্থই হল অন্যের কষ্টকে উপলব্ধি করা এবং সেই কষ্ট লাঘব করার চেষ্টা করা। হাকিম আবদুল হামিদের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন মানুষের প্রকৃত উত্তরাধিকার তাঁর চলে যাওয়ার পরও টিকে থাকা প্রতিষ্ঠান ও আদর্শের মধ্যে নিহিত থাকে। অন্যরা যখন সেই প্রতিষ্ঠান ও আদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যায়, তখনই তাঁর কাজ প্রকৃত অর্থে বেঁচে থাকে। হাকিম আবদুল হামিদ আমাদের জন্য এমনই এক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন। সেই উত্তরাধিকারকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া শুধু তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিষয় নয়; এটি আমাদের দায়িত্ব।
(লেখক প্রফেসর (ড.) এম. আফশার আলম, জামিয়া হামদর্দের প্রাক্তন উপাচার্য।)