সম্প্রীতির অনন্য নজিরঃ গোশালার মঞ্চে সাম্প্রদায়িক ভাষণ থামালেন রাজস্থানের যুবক

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 1 h ago
বিকি দুধওয়া
বিকি দুধওয়া
 
মনসুরুদ্দিন ফরিদী / নয়া দিল্লি

যখন সমাজের একাংশ নিরন্তরভাবে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর চেষ্টায় লিপ্ত, ঠিক তখনই রাজস্থানের সিকার জেলা থেকে উঠে এসেছে সম্প্রীতি ও মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই ঘটনা যেন ঘৃণার রাজনীতিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। একটি গোশালার মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন একজন ব্যক্তি মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য রাখতে শুরু করেন, তখনই সেখানে উপস্থিত আরেকজন গো-রক্ষক ও আয়োজক নির্ভীকভাবে তার প্রতিবাদ জানান। হাজারো মানুষের সামনে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া এই যুবক বিকি দুধওয়া এখন সাহস ও সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
 
এই পুরো ঘটনাটি ঘটে গত ৪ এপ্রিল। বিকি দুধওয়া তার গ্রামে শহীদদের স্মরণে ‘জয় প্রকাশ কিসওয়া গোশালা’-য় একটি বড় জাগরণ ও শোকসভার আয়োজন করেন। এই সভায় আশপাশের বহু গ্রামের হাজার হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে হরিয়ানা থেকে আসা এক অতিথি তার বক্তব্যের মধ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অত্যন্ত আপত্তিকর ও বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠতে দেখে আয়োজক বিকি সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। তিনি মাইক হাতে নিয়ে মঞ্চ থেকেই ওই অতিথির মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেন।
 

বিকি দুধওয়া স্পষ্টভাবে জানান যে তিনি এমন চিন্তাধারার সঙ্গে কখনও একমত নন। তিনি উপস্থিত মানুষদের উদ্দেশে বলেন, এটি ওই ব্যক্তির ব্যক্তিগত মত হতে পারে, কিন্তু তার নিজের মন এমন কথা মেনে নেয় না। এমনকি বিকি এটাও ঘোষণা করেন যে, যদি অনুষ্ঠানে এ ধরনের ঘৃণামূলক বক্তব্য চলতে থাকে, তাহলে তিনি সেই মুহূর্তেই অনুষ্ঠান বাতিল করে দেবেন।
 
তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, যারা তার এই ভ্রাতৃত্বের বার্তার সঙ্গে একমত নন, তারা এই শোকসভা ছেড়ে চলে যেতে পারেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তিনি হিন্দু-মুসলিম ভ্রাতৃত্বে বিশ্বাসী এবং নিজের গ্রামকে ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যের মাধ্যমে পরিচালনা করতে চান।
 
বিকির এই সাহসী পদক্ষেপের ফলে ঘৃণা ছড়াতে আসা ব্যক্তিরা পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়। সেখানে উপস্থিত হাজার হাজার মানুষ বিকির বক্তব্যকে সমর্থন করেন এবং ঘৃণার এজেন্ডাকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। ঘটনার পরই সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
 

যদিও একাংশ মানুষ বিকির এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন, তবে বৃহত্তর অংশ তাকে প্রকৃত নায়ক হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিকির সহকর্মীরাও স্পষ্ট করেন যে মঞ্চে অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো ছিল একটি সামষ্টিক সিদ্ধান্ত, তবে বিকি তার দায়িত্ব পালন করে ভুল কথাকে প্রশ্রয় দেননি।
 
এই ঘটনার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, সিকারের ওই এলাকায় গো-সেবা শুধুমাত্র হিন্দুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয়দের মতে, সেখানে বহু মুসলিম যুবকও দিনরাত পরিশ্রম করে গোশালাগুলিতে সেবা প্রদান করেন। বিকি দুধওয়া ও তার সমর্থকরা বিশ্বাস করেন, একজনের ভুলকে পুরো সমাজ বা ধর্মের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া অন্যায়। তারা সংকল্প নিয়েছেন যে নিজেদের গ্রামের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কোনওভাবেই নষ্ট হতে দেবেন না।
 
বিকির সমর্থনে এলাকার বহু যুবক সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ্যে সামনে এসেছেন। হরিয়ানার ঝাঝ্জরের বাসিন্দা রাহুল সাহার একটি ভিডিও শেয়ার করে জানান যে তিনিও সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি সাক্ষ্য দিয়ে বলেন যে খারা দুধওয়া গ্রামে হিন্দু ও মুসলিম উভয়েই একসঙ্গে গো-সেবা করেন।
 

রাহুল জানান, সেখানে একজন মুসলিম ভাই দিনরাত গ্রামের সেবায় নিয়োজিত থাকেন। কলেজ ও স্কুলে পড়া বহু মুসলিম ছাত্রও গোশালার কাজে হাত বাড়িয়ে দেয়। তিনি তারানগরের ফ্লেক্স তৈরি করা জাভেদ ভাইয়ের উদাহরণ দিয়ে বলেন, জাভেদ শহীদদের ফ্লেক্সগুলো সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সেবার মনোভাব নিয়ে তৈরি করেছিলেন। রাহুল আরও জানান, ওই অনুষ্ঠানের জন্য ১৩৫টি গ্রামের মাটি সংগ্রহ করা হয়েছিল, যেখানে মুসলিমদেরও বড় অবদান ছিল।
 
যুবকদের মতে, রাজস্থান সবসময় ভ্রাতৃত্বের ভূমি হিসেবে পরিচিত এবং এটিকে রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। রাহুল প্রশ্ন তোলেন, যদি সন্ত্রাসবাদীরা ধর্ম জিজ্ঞেস করে হত্যা করে, তবে আমরাও কি একই পথ অনুসরণ করব? তিনি দেশের কৃতী কন্যা কর্নেল সফিয়া কুরেশির উদাহরণ দিয়ে বলেন, সেনা ও দেশের সেবাতেও মুসলিমদের বড় অবদান রয়েছে। তার মতে, প্রতিটি ধর্মেই ভালো ও খারাপ মানুষ থাকে, তাই পুরো সমাজকে দোষারোপ করা ঠিক নয়।
 
রাহুল প্রলক নামের আরেক যুবক বলেন, গো-রক্ষক শুধু হিন্দুরাই নন, স্থানীয় মুসলিমরাও। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে পরিবেশ নষ্ট করে এমন কোনও বিদ্বেষমূলক মন্তব্য সহ্য করা হবে না। তাদের একমাত্র লক্ষ্য গরুর সেবা করা, এবং যে কেউ এই সৎ কাজে যুক্ত, তিনি সম্মানের যোগ্য। তার মতে, মুসলিম ও হিন্দু সমাজ একসঙ্গে দাঁড়ানোই ঘৃণা ছড়ানোদের সবচেয়ে বড় জবাব।
 

তবে এই ঘটনার পর কিছু কট্টরপন্থী ব্যক্তি বিকি দুধওয়াকে হুমকি দিয়েছেন বলেও খবর প্রকাশ্যে এসেছে। কিন্তু বিকি ভয় পাননি। তিনি আরেকটি ভিডিও প্রকাশ করে জানান, এটি তার নিজের গ্রাম, যেখানে সবাই একসঙ্গে খায়-দায় এবং শান্তিতে বসবাস করে।
 
তিনি স্পষ্ট করেন, জাগরণ হোক বা অন্য যেকোনও সামাজিক কাজ, মুসলিম ভাইয়েরা সবসময় পূর্ণ সহযোগিতা করে। দুধওয়া গ্রামের এই যুবকের সাহস প্রমাণ করে দিয়েছে, যদি উদ্দেশ্য সৎ হয়, তবে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করতে চাওয়া মানুষ কখনও সফল হতে পারে না। বিকি শুধু ঘৃণাকেই প্রতিহত করেননি, বরং রাজস্থানের ঐক্যবদ্ধ সংস্কৃতি ও ভ্রাতৃত্বের মূল্যবোধকে আরও শক্তিশালী করেছেন।