কার্গিলের কন্যা শাহনাজ পারভিন: তায়কোয়ান্দোতে লড়াই, স্বপ্ন আর সোনালি জয়

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 1 d ago
শাহনাজ পারভিন
শাহনাজ পারভিন
 
অনিকা মাহেশ্বরী / নয়া দিল্লি

শাহনাজ পারভিনের পরিচয় এখন আর শুধু একটি পদক বা একক জয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি কার্গিলের মাটির মেয়ে, যেখানে তীব্র শীতের মধ্যেও তিনি নিজের দৃঢ় সংকল্পের উষ্ণতা জিইয়ে রেখেছেন। তায়কোয়ান্দোতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের পতাকা উত্তোলন করা লাদাখের প্রথম মেয়ে তিনি। তাঁর গল্প শুধুমাত্র ক্রীড়া সাফল্যের নয়, এটি সামাজিক বাধার বিরুদ্ধে সংগ্রামের, ঘরের বাইরে পা রাখা এক মেয়ের প্রতি বিদ্রূপ সহ্য করার, এবং এক অটল বিশ্বাসের গল্প, যা তাঁকে দেশের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ক্রীড়াবিদদের মধ্যে স্থান করে দিয়েছে।
 
সম্প্রতি ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ থেকে ২০ মার্চ পর্যন্ত ওড়িশার বালাসোরে অল ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটি তায়কোয়ান্দো চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সেরা খেলোয়াড়রা অংশগ্রহণ করায় প্রতিযোগিতাটি ছিল অত্যন্ত কঠিন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। তবে শাহনাজ অসাধারণ কৌশল ও মানসিক দৃঢ়তা প্রদর্শন করে স্বর্ণপদক জয় করেন। তাঁর এই জয় শুধু তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গৌরব নিয়ে আসেনি, বরং প্রমাণ করেছে যে কার্গিলের মেয়েরাও কোনও অংশে পিছিয়ে নয়। কোচ ও ক্রীড়া কর্মকর্তারা তাঁর কৌশলগত দক্ষতা এবং চাপের মধ্যে শান্ত থাকার ক্ষমতার বিশেষ প্রশংসা করেছেন, যা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।
 
শাহানাজ পারভিন
 
শাহনাজ কার্গিলের ছোট্ট গ্রাম সানকুতে জন্মগ্রহণ করেন। একটি সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা শাহনাজ এমন এক পরিবেশে বড় হন, যেখানে খেলাধুলার একটি উপস্থিতি ছিল। তাঁর এক ভাই এবং তিন বোন রয়েছে, যাদের মধ্যে একজন ফুটবল খেলোয়াড়। ছোটবেলায় শাহনাজ বিভিন্ন খেলায় আগ্রহ দেখিয়েছিলেন, তবে তায়কোয়ান্দোর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় একটি স্কুল কর্মশালায়। তাঁর সমবয়সী মেয়েদের শক্তিশালী কিক করতে দেখে তিনি গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন। তাঁদের সাহস দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনিও সেই পথেই হাঁটার সিদ্ধান্ত নেন।
 
সাম্প্রতিক জয়ের পর শাহনাজ সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে জানান, এই স্বর্ণপদক তাঁর কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ ঈদের উপহার। তিনি তাঁর কোচ ও পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান, স্বীকার করেন যে তাঁদের সমর্থন না পেলে তিনি এই সমস্ত চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে পারতেন না।
 
শাহানাজ পারভিন
 
তাঁর যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। যখন তিনি মার্শাল আর্টকে নিজের ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নেন, তখন সমাজের একাংশের প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়। একটি রক্ষণশীল পরিবেশ থেকে উঠে এসে তাঁকে নানা সমালোচনা সহ্য করতে হয়েছে, এমনকি অনেকে তাঁর পরিবারকে বলেছিলেন যে তারা সমাজের পরিবেশ নষ্ট করছে। কিন্তু শাহনাজ দৃঢ় থাকেন এবং চারপাশের নেতিবাচকতার দিকে না তাকিয়ে নিজের প্রশিক্ষণে মনোনিবেশ করেন।
 
প্রথমদিকে তিনি ব্যাডমিন্টনও খেলতেন, কিন্তু শীঘ্রই বুঝতে পারেন যে তাঁর প্রকৃত লক্ষ্য তায়কোয়ান্দোতেই। তিনি প্রথমে স্থানীয় কোচ মোহাম্মদ আলির কাছে প্রশিক্ষণ নেন এবং পরে নিজের দক্ষতা আরও উন্নত করতে জম্মুতে কোচ অতুল পাংগোত্রার অধীনে প্রশিক্ষণ নেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে তাঁর খেলার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়। তিনি জেলা ও রাজ্যস্তরের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় একাধিক পদক জয় করেন। তাঁর ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ২০২৩ সালে, যখন তিনি ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি গেমসে স্বর্ণপদক জয় করেন এবং লাদাখের প্রথম মহিলা হিসেবে এই কৃতিত্ব অর্জন করেন, যা ছিল অঞ্চলের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
 
বিশ্বের তায়কোয়ান্দো মঞ্চে শাহানাজ পারভিন
 
বালাসোরে তাঁর সাম্প্রতিক জয় তাঁর কঠোর পরিশ্রমের আরও একটি প্রমাণ। আজ শাহনাজ সেইসব মেয়েদের জন্য আশার আলো, যারা সামাজিক বাধার কারণে নিজেদের স্বপ্ন দমিয়ে রাখে। তিনি দেখিয়েছেন যে খেলাধুলা শুধুমাত্র শারীরিক ফিটনেসের জন্য নয়, এটি আত্মবিশ্বাস ও পরিচয় গড়ে তোলার এক শক্তিশালী মাধ্যম।
 
বর্তমানে তিনি রোহতকের মহর্ষি দয়ানন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। ২০২৩ সালের আগস্টে তিনি চীনের চেংদুতে অনুষ্ঠিত ফিসু ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি গেমসে নির্বাচিত হন, এবং এই বৈশ্বিক মঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করা লাদাখের প্রথম মহিলা হন। তিনি কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছান, এবং যদিও পদক পাননি, বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে খেলে অমূল্য অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ভারতের জার্সি পরা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে গর্বের মুহূর্ত।
 
কার্গিল বিজয় দিবসের ২৫তম বর্ষপূর্তিতে আন্তর্জাতিক তায়কোয়ান্দো খেলোয়াড় শাহনাজ পারভিনকে সম্মান জানালো ভারতীয় সেনা
 
তিনি ২০২৪ সালের ভিয়েতনামে অনুষ্ঠিত এশিয়ান তায়কোয়ান্দো চ্যাম্পিয়নশিপেও দেশের জন্য সাফল্য এনে দেন, যেখানে তিনি আবারও কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছান। দেশের মাটিতেও তিনি নিজের আধিপত্য বজায় রাখেন, ২০২৫ সালে নাসিকে ফেডারেশন কাপে স্বর্ণপদক জয় করেন। তাঁর সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ লাদাখ প্রশাসন তাঁকে সহ-অ্যাথলিট সোনম চোসফালের সঙ্গে সম্মানিত করে।
 
একই বছরে তিনি রাইন-রুহরে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি গেমসের জন্য যোগ্যতা অর্জন করেন, তবে চোটের কারণে রাউন্ড অব ৩২ থেকে বিদায় নিতে হয়। তবুও তিনি থেমে যাননি এবং তিনি একজন লক্ষ্যা স্কলারও। তিনি লাদাখ স্টেট চ্যাম্পিয়নশিপে তিনটি স্বর্ণপদক জয় করে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন।
 
 
শাহনাজের গল্প আমাদের শেখায় যে প্রতিভা বড় শহর বা আধুনিক সুযোগ-সুবিধার উপর নির্ভর করে না। দৃঢ় সংকল্প থাকলে কার্গিলের সরু গলি থেকেও বিশ্বমঞ্চে উজ্জ্বল হওয়া যায়। তাঁর সাফল্য সেইসব অভিভাবকদের জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা, যারা নিজেদের মেয়েদের অবমূল্যায়ন করেন।
 
আজ শাহনাজ একজন আইকন হয়ে উঠেছেন, এবং আগামী দিনে দেশের তাঁর কাছে অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। নিজের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত থেকে আকাশ ছোঁয়ার তাঁর ক্ষমতা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। তাঁর এই যাত্রা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে, এবং ভারতীয় তায়কোয়ান্দোর ভবিষ্যতে তাঁর নাম ইতিমধ্যেই সোনার অক্ষরে লেখা হয়ে গেছে। কার্গিলের এই কন্যা এখনও থামেননি, তিনি আরও বড় উচ্চতায় পৌঁছাতে প্রস্তুত।