দানিশ আলি / শ্রীনগর
সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে শুধু সুযোগ-সুবিধা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন এক অদম্য ইচ্ছাশক্তির। মার্শাল আর্টসের চর্চার চেয়ে পাহাড় আর অশান্ত পরিবেশের জন্য বেশি পরিচিত এক ভূখণ্ডে, একদিন এক ছোট্ট মেয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সে লড়বে, তবে রাগে নয়, বরং গ্লাভস পরে। কাশ্মীরের মতো একটি জায়গা থেকে উঠে এসে সেই মেয়েটি গোটা বিশ্বের সামনে নিজের পরিচয় তুলে ধরেছে। তিনি আর কেউ নন, বন্দিপোরার গর্ব তাজামূল ইসলাম। সমাজের সব বাধা আর প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে গ্লাভস পরে যে লড়াই তিনি শুরু করেছিলেন, তা আজ বিশ্বজুড়ে অনুপ্রেরণার প্রতীক।
মেডেল জেতার অনেক আগে, মানুষের করতালি পাওয়ার বহু আগে, বিদেশের স্টেডিয়ামে তিরঙ্গা ওড়ানোর আগেই, তাজামুল ইসলাম ছিলেন বন্দিপোরার সরু গলিতে দৌড়ে বেড়ানো এক দৃঢ়চেতা শিশু। যখন অন্য বাচ্চারা খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকত, তখন এই মেয়েটি কাশ্মীরের ঠান্ডা হাওয়ায় ঘুষি মারার অনুশীলন করত। শীতের কুয়াশায় তার নিঃশ্বাস দৃশ্যমান হয়ে উঠত, কিন্তু তার সংকল্প ছিল অদৃশ্য অথচ অত্যন্ত শক্তিশালী।
কিকবক্সিং তার কাছে কোনো সাধারণ পছন্দ ছিল না। এই খেলাটি ছিল কোলাহলপূর্ণ, আক্রমণাত্মক। সমাজের প্রচলিত ধারণা ছিল, এটি শুধুমাত্র ছেলেদের খেলা। কিন্তু তাজামুল সেই ধারণাকে মেনে নেননি।
তার গল্পটি ব্যতিক্রমী শুধু এই কারণে নয় যে তিনি মাত্র আট বছর বয়সে বিশ্ব খেতাব জয় করেছিলেন। এর আসল কারণ হলো, তিনি এমন একটি পথ বেছে নিয়েছিলেন, যেখানে তার চারপাশের কেউ আগে পা বাড়ায়নি। যেখানে স্বপ্নগুলো সাধারণত বাস্তবতার সীমায় আবদ্ধ থাকে, সেখানে তাজামুলের স্বপ্ন ছিল সাহসী, নির্ভীক।
প্রশিক্ষণের সুযোগ ছিল অতি সীমিত। সুবিধা ছিল প্রায় নেই বললেই চলে। সম্পদের অভাব ছিল স্পষ্ট। তবুও প্রতিদিন ভোরে তিনি বেরিয়ে পড়তেন। হাতে গ্লাভস, চোখে অটল দৃঢ়তা। কোনো দ্বিধা ছিল না। তার প্রতিটি ঘুষির পেছনে ছিল এক নীরব বার্তা, কাশ্মীরের মেয়েরা কখনো দুর্বল নয়।
তাজামূল ইসলাম
২০১৬ সালে ইতালিতে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড কিকবক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপ’-এ বিশ্ব প্রত্যক্ষ করল সেই সত্য, যা বন্দিপোরা আগেই জানত, এই মেয়েটি আলাদা। যখন তিনি সোনার পদক উঁচিয়ে ধরলেন, তা শুধু একটি খেলায় জয় ছিল না, তা ছিল এক সাংস্কৃতিক মুহূর্ত।
উত্তর কাশ্মীরের একটি ছোট শহরের এক কিশোরী আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে ভারতের জাতীয় পতাকা তুলে ধরেছিল। গোটা স্টেডিয়াম করতালিতে মুখরিত হয়ে উঠেছিল, আর ঘরে বসে পুরো উপত্যকা গর্বে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল।
তাজামুল ইসলামের প্রকৃত জয় শুধু ট্রফিতে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি মানুষের ঘরের আলোচনার বিষয় বদলে দিয়েছেন, শ্রেণিকক্ষের মানসিকতায় পরিবর্তন এনেছেন। পিতাদের অনুপ্রাণিত করেছেন তাদের কন্যাদের স্বপ্নে আস্থা রাখতে।
তাজামুল ইসলাম এবং তার পুরস্কারসমূহ
তার এই যাত্রা এক নীরব বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি, যেখানে ক্ষমতায়ন কোনো স্লোগানে নয়, বরং রিঙের ভেতরে নিয়ন্ত্রিত ঘুষিতে প্রকাশ পায়।
আজ তাজামুল ইসলাম শুধু ক্রীড়া উৎকর্ষতার প্রতীক নন, তিনি সম্ভাবনারও প্রতীক। প্রতিটি প্রশিক্ষণ শিবিরে তিনি শুধু শক্তির সঞ্চার করেন না, বরং এই বার্তাও ছড়িয়ে দেন, কাশ্মীরের তরুণ প্রজন্ম ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা, সামাজিক ধ্যানধারণা ও প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে পারে।
বন্দিপোরার বরফঢাকা প্রান্তর থেকে আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের উজ্জ্বল আলো পর্যন্ত, তাজামুল ইসলামের যাত্রা আমাদের একটি সহজ সত্য মনে করিয়ে দেয়, চ্যাম্পিয়নরা কখনো স্টেডিয়ামে জন্মায় না। তারা গড়ে ওঠে নীরবতায়, সংগ্রামের আগুনে নিজেদের তৈরি করে এবং সঠিক সময়ে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরে।