দৌলত রহমান
৯ আগস্ট সন্ধ্যায় ১৭ বছরের জানমণি কোঁওয়র যখন বাড়ি ফিরলেন, তখন তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল না কোনও বাড়ি। ছিল না নিজের ঘর, বিছানা কিংবা আলমারি। দিল্লি থেকে সঙ্গে করে নিয়ে আসা জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখার মতো কোনও পরিচিত জায়গাও ছিল না। তাঁর ঠিকানা তখন একটি বাঁধের ওপর দাঁড় করানো ত্রাণের তাঁবু, যে জায়গাটিকেই তাঁর পরিবার ১৯ জুলাই থেকে বাড়ি বলে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।
তবে সেদিন জানমণির হাতে এমন একটি জিনিস ছিল, যার মূল্য কোনও ঘর, বিছানা কিংবা আলমারির চেয়েও অনেক বেশি, জাতীয় স্তরের সোনার পদক। অসমের পূর্বাঞ্চলের যোরহাট জেলার ভোগদোইপোরিয়া গাঁওয়ের ২ নম্বর মোজিয়া ভেটিতে বন্যার জলে বাড়ি ডুবে যাওয়ার পর বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছে জানমণির পরিবার। সেই পরিবারের কাছে এই সোনা শুধু একটি ক্রীড়া-সাফল্যের স্মারক নয়। এর সঙ্গে মিশে আছে এমন এক লড়াইয়ের গল্প, যে লড়াইয়ে বন্যা তাদের জীবনের প্রায় সবকিছু কেড়ে নিয়েছিল।
তবু একটি জিনিস বন্যা কেড়ে নিতে পারেনি, জানমণির স্বপ্ন। ৭ থেকে ৯ আগস্ট নয়াদিল্লির তালকাটোরা ইনডোর স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত জাতীয় ক্যারাটে চ্যাম্পিয়নশিপের আশিহারা বিভাগে সোনা জিতেছেন এই তরুণ কারাতেকা। অসম থেকে এই বিভাগে অংশ নিয়েছিলেন চারজন প্রতিযোগী। তাঁদের মধ্যে একজন জিতেছেন ব্রোঞ্জ। আর জানমণি ফিরেছেন সোনা নিয়ে।
কিন্তু দিল্লির মঞ্চে উঠে সোনা জেতার অনেক আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল জানমণির আরেক লড়াই, যে লড়াইয়ের প্রতিপক্ষ ছিল না কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী, ছিল বন্যা। জানমণিদের বাড়ি থেকে মাত্র প্রায় ১৫০ মিটার দূরে বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল। এত দ্রুত জল ঢুকে পড়ে যে, পরিবারটির হাতে জিনিসপত্র বাঁচানোর মতোও প্রায় কোনও সময় ছিল না। কোনওমতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র উদ্ধার করা হয়। বাঁচানো হয় জানমণির পদক ও পুরস্কারগুলোও।
বাকি প্রায় সবকিছুই গিলে নেয় বন্যা। জলের তলায় চলে যায় বাড়ি। বছরের পর বছর ধরে পরিবারের তৈরি ও দেখাশোনা করা মৎস্যখামার ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভেসে যায় হাঁস-মুরগি। কোনওমতে মহিষগুলোকে উদ্ধার করে বাঁধের কাছে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেখানেই আশ্রয় নেয় পরিবারটি।
মৎস্যখামারটি নষ্ট হওয়া মানে শুধু একটি আয়ের উৎস হারানো নয়। সেই মাছের ওপর নির্ভর করেই লেখা ছিল জানমণির দিল্লি যাওয়ার পরিকল্পনা। প্রায় তিন বছর ধরে মাছ চাষ করছিল পরিবারটি। পরিকল্পনা ছিল, জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের আগে মাছ বিক্রি করা হবে। সেই টাকা দিয়েই মেটানো হবে জানমণির দিল্লি যাওয়া এবং প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার খরচ। কিন্তু বন্যার এক ধাক্কায় সেই পরিকল্পনাও ভেসে যায়।
ফিজিক্স ওয়ালাহ-র প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত অলখ পাণ্ডে জানমণির সঙ্গে
জানমণির বড় ভাই কৃষ্ণমণি কোঁওয়রের কথায়, “আমরা মাছ বিক্রি করে জানমণিকে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে দিল্লি পাঠানোর পরিকল্পনা করেছিলাম। বন্যা সবকিছু তছনছ করে দিল।” জানমণির ক্রীড়াস্বপ্নের জন্য ত্যাগ স্বীকার এই পরিবারের কাছে নতুন কিছু নয়। মাত্র এক বছর আগেই তাঁর একটি প্রতিযোগিতার খরচ জোগাতে দুটি মহিষ বিক্রি করেছিল পরিবার। এবার বন্যা সেই শেষ ভরসাটুকুও কেড়ে নিল।
মাত্র পাঁচ বছর বয়সে ক্যারাটে শেখা শুরু করেছিলেন জানমণি। উন্নত প্রশিক্ষণকেন্দ্র বা আধুনিক পরিকাঠামো তাঁর কপালে জোটেনি। স্থানীয় ক্লাবেই চলেছে অনুশীলন। কখনও বাড়ির উঠোনও হয়ে উঠেছে তাঁর প্রশিক্ষণের জায়গা। বছরের পর বছর সেই কঠোর পরিশ্রমের ফলও এসেছে। ২০২৩ সালে ব্রোঞ্জ জেতার পর ২০২৫ সালে সোনা জিতেছিলেন তিনি।
২০২৬ সালের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ তাই তাঁর ক্রীড়াজীবনে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল।কিন্তু তার আগেই আঘাত হানল বন্যা। বাড়ি জলের নিচে। পরিবারের জীবিকা বিপর্যস্ত। রেল পরিষেবা ব্যাহত। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস জোগাড় করাও কঠিন। এমন অবস্থায় জাতীয় স্তরের একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার টাকা জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন জানমণি।
ঠিক তখনই এল অপ্রত্যাশিত সাহায্য। এল দূর থেকে। বন্যাবিধ্বস্ত অসম সফরের সময় ফিজিক্স ওয়ালাহ-র প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত অলখ পাণ্ডে জানতে পারেন জানমণির পরিস্থিতির কথা। তরুণ এই ক্রীড়াবিদের লড়াইয়ের কথা জানার পর তিনি তাঁকে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দলের দিল্লি যাওয়া এবং ফিরে আসার যাত্রার খরচ বহন করেন তিনি। ব্যবস্থা করেন থাকার। পাশাপাশি জানমণির পরিবারকে দেন ৩ লক্ষ টাকা।
কেন্দ্রীয় বিদেশ প্রতিমন্ত্রী পবিত্র মার্ঘেরিটাও দেন ১০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা। জানমণির পরিবারের কাছে এই সাহায্য শুধু টাকা ছিল না। এটি ছিল প্রায় হারিয়ে যেতে বসা একটি স্বপ্নকে আবার বাঁচিয়ে তোলার সুযোগ। পরিবারের ভাষায়, “পাণ্ডে স্যার আমাদের কাছে ঈশ্বরের পাঠানো দূতের মতো ছিলেন।”
এবার দিল্লি যাওয়া সম্ভব হল জানমণির। কিন্তু সোনা জয়ের আগে আরও একটি পরীক্ষা অপেক্ষা করছিল তাঁর জন্য। বাঁধই হয়ে উঠল প্রশিক্ষণের মাঠ। পরিবার যখন বেঁচে থাকা, মাথা গোঁজার ঠাঁই এবং ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে জীবনকে আবার গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় ব্যস্ত, তখন জানমণি ফিরে গেলেন অনুশীলনে। তবে অনুশীলনের জায়গা আর আগের মতো ছিল না। এবার তাঁর প্রশিক্ষণের মাঠ ছিল সেই বাঁধ, যেখানে তাঁর পরিবার আশ্রয় নিয়েছিল।
ছিল না কোনও উপযুক্ত প্রশিক্ষণকেন্দ্র। পরিবার জানত না পরের রাত কোথায় কাটবে। জানত না কবে আবার নিজের বাড়িতে ফিরতে পারবে। চারপাশে তখন একই অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন অসংখ্য বন্যাদুর্গত মানুষ। তবু জানমণি থামেননি।
জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের প্রস্তুতি নেওয়া ১৭ বছরের একজন ক্রীড়াবিদের জন্য এটি ছিল খেলাধুলার স্বাভাবিক পরিবেশের সম্পূর্ণ বিপরীত ছবি। কিন্তু তাঁর কাছে তখনও একটি জিনিস অটুট ছিল, শৃঙ্খলা। প্রতিদিন অনুশীলন করেছেন তিনি। বন্যা তাঁর বাড়ি কেড়ে নিয়েছে। পরিবারের জীবিকা বিপর্যস্ত করেছে। ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
কিন্তু পাঁচ বছর বয়সে যে দৃঢ় সংকল্প তাঁকে কারাতের মাটিতে নিয়ে এসেছিল, সেটিকে কেড়ে নিতে পারেনি।তারপর এল সেই দিন। বন্যায় ভেসে যাওয়া বাঁধ থেকে জাতীয় মঞ্চে পৌঁছে গেলেন জানমণি। দিল্লির পথে তাঁর সঙ্গে ছিল পরিবারের আশা। সঙ্গে ছিল তাঁর ক্রীড়াজীবনকে টিকিয়ে রাখতে পরিবারের বছরের পর বছর ধরে করা ত্যাগের স্মৃতি।
তারপর তিনি প্রবেশ করলেন চ্যাম্পিয়নশিপের মঞ্চে। ফলাফল, সোনা। তাই এই সোনার পদককে আর শুধুমাত্র একটি ক্রীড়া-সাফল্য বলে দেখার উপায় নেই। এই পদকের সঙ্গে মিশে আছে বন্যার জলে তলিয়ে যাওয়া একটি বাড়ির গল্প। মিশে আছে সেই মৎস্যখামার হারানোর বেদনা, যেটি থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে জানমণির দিল্লি যাওয়ার খরচ মেটানোর কথা ছিল। মিশে আছে গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি হারানোর কষ্ট।
মিশে আছে ত্রিপলের নিচে দিন কাটানো একটি পরিবারের ছবি। আর মিশে আছে ১৭ বছরের এক কিশোরীর দৃঢ়তা, যে সময়ে ক্রীড়ার স্বপ্নকে পাশে সরিয়ে রাখার যথেষ্ট কারণ ছিল, সেই সময়েও সে বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে অনুশীলন করেছে।
এই গল্পে রয়েছে সময়মতো পাওয়া সাহায্যের কথাও। এমন সাহায্য, যা একটি প্রায় অসম্ভব যাত্রাকে বাস্তবে সম্ভব করে তুলেছিল। ১০ আগস্ট ডিব্রুগড় বিমানবন্দর হয়ে অসমে ফিরলেন জানমণি। সাধারণত জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়ে সোনার পদক নিয়ে কোনও তরুণ ঘরে ফিরলে সেখানে উৎসবের আবহ থাকে। পরিচিত একটি ঘর থাকে। থাকে বিছানা। পরিবারের মানুষ অপেক্ষা করে থাকে। আর হয়তো পদকটি রাখার জন্য তৈরি হয় একটি বিশেষ জায়গাও।
জানমণির জন্য সেসব কিছুই ছিল না। তিনি ফিরে গেলেন বাঁধের ওপর সেই ত্রিপলের আশ্রয়ে। পদকের একটি ঘর আছে। কিন্তু জানমণির নিজের ঘর নেই, অন্তত এখনও নয়। তাঁর বড় ভাইয়ের কথায়, নভেম্বরের আগে বাড়িতে ফিরে যাওয়ার কথাও হয়তো ভাবার মতো অবস্থায় নেই পরিবারটি।
আর জানমণির সামনে এখন শুধু একটি বাড়ি পুনর্নির্মাণের চ্যালেঞ্জ নয়। তিনি দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী। তাঁর পড়াশোনা চলছে। একইসঙ্গে কারাতেকে পেশা হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্নও রয়েছে। আর সেই স্বপ্নের পাশাপাশি তাঁকে দেখতে হচ্ছে বন্যায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া পরিবারের জীবনকে আবার দাঁড় করানোর সংগ্রাম।
এই কারণেই তাঁর সোনার পদককে গল্পের শেষ বলে দেখা যায় না।
বরং এখান থেকেই শুরু হচ্ছে নতুন একটি অধ্যায়। জানমণির এই সাফল্য একটি অনেক বড় বিপর্যয়ের মধ্যেই জন্ম নিয়েছে। বন্যাকবলিত অসমে হাজার হাজার পরিবার এখন ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর, ধ্বংস হয়ে যাওয়া জীবিকা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়ে।
সাম্প্রতিক অসমের বন্যা দুর্যোগের একটি দৃশ্য
অনেকের ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগবে। কয়েক মাস। আর কিছু পরিবারের ক্ষেত্রে হয়তো তার থেকেও বেশি।তবু জানমণির গল্প দুর্যোগের আরেকটি মুখ আমাদের সামনে তুলে ধরে। বন্যার ক্ষয়ক্ষতি হিসাব করা যায় ডুবে যাওয়া কৃষিজমির পরিমাণ দিয়ে। ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামের সংখ্যা দিয়ে। ধ্বংস হওয়া বাড়ির সংখ্যা দিয়ে। বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দিয়ে।
এই পরিসংখ্যান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারাই বলে দেয় বিপর্যয়ের ব্যাপ্তি কতটা বড়। কিন্তু পরিসংখ্যান পুরো গল্প বলতে পারে না। প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পেছনে রয়েছে একজন মানুষ, যিনি ক্ষতি সামলাচ্ছেন, অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়ছেন, পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছেন এবং আবার নতুন করে শুরু করার চেষ্টা করছেন।
জানমণির সোনা বন্যার ধ্বংসযজ্ঞ মুছে দিতে পারবে না। এই পদক তাঁর বাড়ি ফিরিয়ে দিতে পারবে না। ফিরিয়ে দিতে পারবে না ধ্বংস হয়ে যাওয়া মৎস্যখামার। ফিরিয়ে আনতে পারবে না হারিয়ে যাওয়া গবাদি পশুগুলোকে।
কিন্তু এই সোনা একটি শক্তিশালী সত্যের প্রতীক, একটি বিশাল সংগ্রামের মাঝখানে একটি ছোট, অথচ গভীরভাবে ব্যক্তিগত বিজয়। তাঁর গল্প শুধুমাত্র বন্যাকে হারিয়ে এক তরুণ ক্যারাটে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ওঠার গল্প নয়।
জানমণি কোঁওয়র
এটি আসলে টিকে থাকার গল্প। এমন এক মানুষের গল্প, যার চারপাশ থেকে প্রায় সবকিছু কেড়ে নেওয়ার পরও এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে যায়নি। বন্যা জানমণির পৃথিবীর অনেকটাই ভেঙে দিয়েছে। কিন্তু ভাঙতে পারেনি তাঁর সংকল্প। চারপাশ যখন ভেঙে পড়ছিল, তিনি তখনও দাঁড়িয়ে ছিলেন। হাল ছেড়ে দেওয়া যখন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হতে পারত, তখনও তিনি এগিয়ে গেছেন।
আর সম্ভবত এই কারণেই দৃশ্যটি এতটা হৃদয়স্পর্শী, ১৭ বছরের একটি মেয়ে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে সোনার পদক নিয়ে ফিরছে, অথচ সেই রাতেই তাকে ঘুমাতে হচ্ছে একটি ত্রাণের তাঁবুর নিচে। সোনাটি জানমণির, একজন চ্যাম্পিয়নের। আর তাঁবুটি সেই পরিবারের, যে পরিবার এখনও তার ঘরের অপেক্ষায়।