শান্তি প্রিয় রায়চৌধুরী
বৃহস্পতিবার গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে পুরুষদের ১০০ মিটার টি-৪৭ ইভেন্টে দিলীপ মহাদু গাভিত শেষ ৩০ মিটারে গতি ও শক্তির দুর্দান্ত ঝলক দেখিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ফেলে ১০.৭১ সেকেন্ডে গেমস রেকর্ড গড়ে ভারতের জন্য একটি ঐতিহাসিক স্বর্ণপদক এনে দিয়েছেন। আর এই সাফল্যের মাধ্যমে গাভিত প্যারা-অ্যাথলেটিক্সে কমনওয়েলথ গেমসে স্বর্ণপদক জয়ী প্রথম ভারতীয় পুরুষ ক্রীড়াবিদ হিসেবে ইতিহাস গড়লেন।
পুরুষদের ১০০ মিটার টি৪৭ হলো প্যারা অ্যাথলেটিক্সের একটি স্প্রিন্ট ইভেন্ট, যা এমন ক্রীড়াবিদদের জন্য আয়োজিত হয় যাদের এক পাশের বাহুতে অক্ষমতা রয়েছে, যা তাদের শরীরের এক পাশের শক্তি, নড়াচড়া বা সমন্বয়কে প্রভাবিত করে।
দিলীপ মহাদু গাভিত
গাভিতের স্বর্ণপদক জয়ের পেছনে রয়েছে প্রতিকূলতা আর দৃঢ় সংকল্পের এক গল্প। মহারাষ্ট্রের এই প্যারা-অ্যাথলিটের বয়স যখন মাত্র চার বছর, তখন সে একটি গাছ থেকে পড়ে গিয়ে কনুইয়ের নিচ থেকে তার ডান হাতটি হারায়।
দুর্ভাগ্যবশত, সে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা পায়নি, কারণ তার বাবা-মা তাকে হাসপাতালে না নিয়ে একজন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে তাকে ওষুধ দেওয়া হয় এবং তার আহত হাতে ব্যান্ডেজ করে দেওয়া হয়। এরপর ক্ষতস্থানটিতে পচন ধরে, এবং পরে গাভিতের হাতটি কেটে ফেলতে হয়।
কিন্তু মহারাষ্ট্রের নাসিকের কাছে তোরণ ডোঙ্গারিতে জন্ম নেওয়া এক ক্ষুদ্র কৃষকের এই ছেলেটি নিজেকে কখনও কারও চেয়ে নিকৃষ্ট মনে করেননি এবং অ্যাথলেটিক্স চালিয়ে যান, এমনকি নিজের যোগ্যতা যাচাই করার জন্য সক্ষম দৌড়বিদদের সাথেও প্রতিযোগিতা করতেন।
দিলীপ মহাদু গাভিত
মহারাষ্ট্রের একটি স্থানীয় স্কুল প্রতিযোগিতায় এক কোচ বৈজন্থ দয়ানন্দ কালে প্রথম তাঁর উদীয়মান প্রতিভা আবিষ্কার করেন, যিনি পরবর্তীতে তাঁর প্রশিক্ষক ও অভিভাবক হয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁর যাত্রাপথ তৈরিতে সহায়তা করেন।
গ্লাসগোতে গোভিতের এই যাত্রা নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। যখন গাভিত স্বর্ণপদক জয় করে ভারতের পদক সংখ্যা ১৫-তে নিয়ে যান, যার মধ্যে ছিল তিনটি স্বর্ণ, নয়টি রৌপ্য এবং তিনটি ব্রোঞ্জ। পদক তালিকায় ভারত অষ্টম স্থানে ছিল।
জয়ের পর কাঁধে তেরঙ্গা পতাকা জড়িয়ে গাভিত তার দৌড়ের কথা স্মরণ করে বললেন, "শুরুটা একটু ধীর ছিল। পরে আমি গতি বাড়িয়েছিলাম। পরেরবার আরও ভালো করব। আমাকে ১০০ মিটার দৌড়াতে হয়েছিল। সাধারণত আমি ৪০০ মিটার দৌড়াই। ওটাই আমার প্রধান ইভেন্ট। কিন্তু এখানে আমি ১০০ মিটার দৌড়েছি এবং দৌড়টা আমি সত্যিই উপভোগ করেছি।"
দিলীপ মাহাদু গাভিত তাঁর সতীর্থ মোহাম্মদ বাসিলের সঙ্গে
"আমি একটি ছোট গ্রাম থেকে এসেছি। শুরুতে আমি এই গ্রামেই চাষের কাজ করতাম। তারপর, আমার স্যার আমাকে দৌড়াতে দেখে প্রশিক্ষণের জন্য নাসিকে আসতে বলেন। তিনি বলেছিলেন যে খরচসহ সবকিছুর দায়িত্ব তিনিই নেবেন। আজ গুরু পূর্ণিমা, তাই এই পদকটি আমার গুরুর জন্য একটি উপহার।"
আগামী কমনওয়েলথ গেমস কেন আরো অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীতাতে মহারাষ্ট্রের নাসিকের প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষক পরিবারের এই ছেলেটি তার প্রশিক্ষককে আরো বড় সাফল্য এনে দিতে চান। তার এই সাফল্যে আমরা ভারতবাসী গর্বিত।