আমি তুরস্কে বড় হয়ে উঠেছি, যেখানে আমি আমার জীবনের অর্ধেক সময় কাটিয়েছি। গত পঁচিশ বছর ধরে আমি একজন আমেরিকান নাগরিক হিসেবে আমেরিকায় বসবাস করছি। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, আমি কি আমেরিকাকে একটি ইসলামিক দেশ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি?
কে এমন একটি প্রশ্ন গুরুত্ব সহকারে করতে পারে? সাধারণত দুটি গোষ্ঠী এমন প্রশ্ন করতে পারে, যারা ইসলামকে একটি মধ্যযুগীয় ও উগ্র দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে গ্রহণ করে (যাদের সাধারণত ‘ইসলামিস্ট’ বলা হয়) এবং যারা ইসলামকে ঘৃণা করে ও এটিকে একটি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে (যাদের সাধারণত ‘ইসলামোফোব’ বলা হয়)।
প্রতীকী ছবি
এই দুই গোষ্ঠী নিজেদের একে অপরের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থানকারী হিসেবে উপস্থাপন করে। তবুও আশ্চর্যজনকভাবে, ইসলাম সম্পর্কে তাদের ধারণা প্রায় একই। ইসলামিস্ট এবং ইসলামোফোব, উভয় গোষ্ঠীই বিশ্বাস করে যে ইসলাম ধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যে কোনো পার্থক্য রাখে না।
আমি এই বিষয়টি খুব ভালোভাবেই জানি, কারণ আমার বই Islam, Authoritarianism, and Underdevelopment: A Global and Historical Comparison (যেটি ভারতে হিন্দি ও উর্দুসহ ১৫টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে) প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে আমি এই দুই গোষ্ঠীর কাছ থেকেই সমানভাবে সমালোচিত হয়ে আসছি।
অষ্টম শতক থেকে একাদশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ যে অনেকাংশেই পৃথক ছিল, আমার এই যুক্তি ইসলামিস্টদের কাছে একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা ইসলামকে ব্যক্তিগত আচরণ থেকে শুরু করে সরকার পরিচালনা পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি দিক নিয়ন্ত্রণকারী একটি সম্পূর্ণ মডেল বা ‘ব্লুপ্রিন্ট’ হিসেবে বিবেচনা করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, উলামাদের শরিয়তের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করা উচিত এবং তাদের রাজনৈতিক শাসকদের সঙ্গে একটি জোট গড়ে তোলা উচিত।
একাদশ শতকের দুই প্রভাবশালী পণ্ডিত আল-মাওয়ার্দি এবং আল-গাজ্জালি এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার কল্পনা করেছিলেন, যার প্রধান হবেন একজন খলিফা। এর প্রায় দুই শতাব্দী পরে, ইবনে তাইমিয়া উলামা ও শাসক, উভয়ের যৌথ নেতৃত্বে পরিচালিত একটি ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। তাঁর ব্যাখ্যা আমার কথিত ‘উলামা-রাষ্ট্রের জোট’-কে একটি ঈশ্বরপ্রদত্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করে।
প্রতীকী ছবি
এখন বিংশ ও একবিংশ শতকের দিকে তাকান। একাদশ শতকের পরবর্তী উলামা-পরম্পরার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে মিশরের হাসান আল-বান্না এবং পাকিস্তানের আবুল আলা মওদুদীর মতো ইসলামিস্টরা ইসলামকে ধর্ম ও রাষ্ট্র, উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করা একটি সম্পূর্ণ ব্যবস্থা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। মওদুদী এমনকি যুক্তি দিয়েছিলেন যে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র, যেমন রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা এবং সমাজ, তাঁর কল্পিত একটি ইসলামিক রাষ্ট্রের অধীনে ইসলামীকরণ করা উচিত।
এই ইসলামিস্ট দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, আমেরিকা, ভারত বা অন্য যেকোনো মুসলিম-সংখ্যালঘু দেশে বসবাসকারী একজন মুসলমানের সামনে মাত্র দুটি বিকল্প থাকে: হয় সেই দেশ ত্যাগ করা, নয়তো সমাজ ও রাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত ইসলামীকরণের লক্ষ্য নিয়ে সেখানে থেকে যাওয়া। কিন্তু তাদের এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
আসলে ইসলামের প্রধান উদ্দেশ্য রাজনীতি নয়; এর মূল বিষয় হলো নৈতিকতা, ন্যায়পরায়ণতা, একটি সুন্দর জীবনযাপন করা, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা এবং অন্যায় প্রতিহত করা। ব্যক্তি হিসেবে প্রত্যেকেই ঈশ্বরের কাছে দায়বদ্ধ এবং (আখিরাতে) পরকালে তাদের ব্যক্তিগতভাবেই পুরস্কৃত বা বিচার করা হবে। একটি সৎ ও ধর্মপরায়ণ জীবনযাপন করাই হলো ইসলামের কেন্দ্রীয় উদ্দেশ্য।
সুতরাং, একজন মুসলমান আমেরিকা, ভারত বা অন্য যেকোনো দেশের আইন মেনে সেই দেশের একজন বিশ্বাসী মুমিন (ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি) এবং একজন সুনাগরিক হতে পারেন। মুসলমানদের তাদের চুক্তি ও প্রতিশ্রুতিগুলো সম্মান করার প্রত্যাশা করা হয় এবং নাগরিকত্ব হলো অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি।অন্যদিকে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সম্প্রতি বৃদ্ধি পাওয়া জনপ্রিয় জাতীয়তাবাদের পাশাপাশি প্রভাব বিস্তার করা ‘ইসলামোফোব’দেরও একইভাবে ভুল পথে পরিচালিত করা হয়েছে।
তারা দাবি করে যে ইসলাম জন্মগতভাবেই হিংসাত্মক এবং এটি জিহাদের মাধ্যমে আগ্রাসী যুদ্ধের নির্দেশ দেয়। কিন্তু ঐতিহাসিক প্রমাণ এই দাবিকে সমর্থন করে না। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো বৃহৎ হিংসাত্মক ঘটনাগুলোতে মুসলমানদের কোনো কেন্দ্রীয় ভূমিকা ছিল না। সাধারণভাবে বলতে গেলে, আধুনিক যুদ্ধগুলো ধর্মীয় মতবাদের পরিবর্তে মূলত ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং জাতীয়তাবাদের দ্বারা পরিচালিত হয়ে এসেছে।
প্রতীকী ছবি
তারা মুসলমানদের শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখে এবং তাদের অন্যান্য বহু পরিচয়কে উপেক্ষা করে, যেমন পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী, উদ্যোক্তা, শিল্পী এবং বিভিন্ন জাতিগত ও সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে তাদের পরিচয়। সংক্ষেপে বলতে গেলে, নিজেদের দেশের সহ-নাগরিক হিসেবে তাদের পরিচয়কে তারা গুরুত্ব দেয় না।
ইসলামোফোবদের এই শত্রুতা শুধুমাত্র মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি প্রায়ই অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিও প্রসারিত হয়। সমাজের প্রতি সংখ্যালঘুদের অবদানকে স্বীকৃতি দিতে তারা অস্বীকার করে।
সমগ্র ইতিহাসজুড়ে সংখ্যালঘুরা প্রায়ই বৌদ্ধিক ও অর্থনৈতিক সৃজনশীলতার প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে। অষ্টম থেকে একাদশ শতকের মধ্যবর্তী সময়ের ইসলামের স্বর্ণযুগে বহু অগ্রণী পণ্ডিত ও দার্শনিক ছিলেন পারসিক (Persian)। ব্রিটেনে নবজাগরণকে (Enlightenment) প্রায়ই ‘স্কটিশ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়, কারণ এর বহু অগ্রণী চিন্তাবিদ স্কটল্যান্ড থেকে এসেছিলেন। সাম্প্রতিক শতাব্দীগুলোতে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় ইহুদি সংখ্যালঘুরা বিজ্ঞান, দর্শন ও শিল্পকলার ক্ষেত্রে চমকপ্রদ অবদান রেখেছেন।
যেসব দেশ অভিবাসীদের প্রত্যাখ্যান করে বা সংখ্যালঘুদের সম্মান করতে ব্যর্থ হয়, সেসব দেশ গতিশীলতা ও সৃজনশীলতা হারায়। এর বিপরীতে, আমেরিকার শিক্ষাগত, বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক সাফল্যের পেছনে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো অভিবাসী ও সংখ্যালঘুরা।
এই সমগ্র আলোচনার মূল ধারণাটিই হলো ‘নাগরিকত্ব’। ইসলামিস্টরা এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকে অস্বীকার করে, কারণ তারা কল্পনা করে যে সমস্ত মুসলমান একদিন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি ইসলামিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হবে। অন্যদিকে, ইসলামোফোবরা মুসলমানদের পূর্ণ নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকার করে, কারণ তারা এমন একটি সমাজের কল্পনা করে যেখানে মুসলমানরা কখনোই প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে না। এই দুই ধারণাই সম্পূর্ণ ভুল।
বাস্তবে, মুসলমানরা তারা যে দেশেই বসবাস করুক না কেন, সেই দেশের সমান অধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক হতে পারে। আর এই বিষয়টি বিশ্বাস, নৈতিকতা ও ন্যায়পরায়ণতার দ্বারা পরিচালিত হয়ে একটি সম্পূর্ণ ইসলামিক জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। কোরানও শিক্ষা দেয় যে ঈশ্বর মানবজাতিকে বিভিন্ন “জাতি ও গোত্রে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো” (৪৯:১৩), এই কারণে নয় যে একটি গোষ্ঠী অন্য একটি গোষ্ঠীর ওপর আধিপত্য বিস্তার করবে।
ইসলাম মুসলমানদের রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের জন্য কখনো বাধ্য করে না। বরং, তারা যেখানেই বসবাস করুক না কেন, ঈশ্বরের উপাসনা করতে, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে, নিজেদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে এবং জনসাধারণের কল্যাণে কাজ করার জন্যই ইসলাম তাদের আহ্বান জানায়।
(আহমেত টি. কুরু যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন এবং ‘Islam, Authoritarianism, and Underdevelopment: A Global and Historical Comparison গ্রন্থের লেখক। )