ক্রিকেট বিশ্বের এক স্বর্ণযুগের অবসান ঘটল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি অলরাউন্ডার স্যার গ্যারি সোবার্স আর নেই। ৮৯ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। ব্যাট, বল ও নেতৃত্ব, তিন ক্ষেত্রেই অসামান্য কৃতিত্বের জন্য গ্যারি সোবার্সকে সর্বকালের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর প্রয়াণে বিশ্ব ক্রিকেট এক অনন্য অধ্যায়ের সমাপ্তি দেখল।
বার্বাডোজে জন্ম ও বেড়ে ওঠা গ্যারি সোবার্স মাত্র ১৬ বছর বয়সে প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে এবং ১৮ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক করেন। ১৯৫৪ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে ৯৩টি টেস্ট এবং একটি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেন তিনি। টেস্ট ক্রিকেটে ৫৭.৭৮ গড়ে ৮,০৩২ রান করার পাশাপাশি বল হাতে নেন ২৩৫টি উইকেট। বাঁহাতি বোলার হিসেবে তিনি অর্থোডক্স স্পিন, রিস্ট স্পিন এবং মিডিয়াম পেস, তিন ধরনের বোলিংয়েই সমান দক্ষ ছিলেন।
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নিজের প্রথম টেস্ট শতরানকে তিনি রূপ দেন ৩৬৫ রানের ঐতিহাসিক ইনিংসে। সে সময় সেটিই ছিল টেস্ট ক্রিকেটের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর। ১৯৯৪ সালে ব্রায়ান লারা ৩৭৫ রান করে সেই রেকর্ড ভাঙলেও, অভিষেক শতরান হিসেবে গ্যারি সোবার্সের ৩৬৫ এখনও টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
এই ইনিংসের পর শুরু হয় তাঁর দুর্দান্ত ব্যাটিং আধিপত্য। পরপর পাঁচটি টেস্ট সিরিজে ৫০০-র বেশি রান সংগ্রহ করেন তিনি। তাঁর কভার ড্রাইভ ও হুক শট ছিল ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে নান্দনিকতার প্রতীক। ১৯৫৮-৫৯ সালে ভারতের সফরে তিনটি শতরান করার পর ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পরের সিরিজে ১০১.২৮ গড়ে ৭০৯ রান করেন। সেই সিরিজেই ফ্র্যাঙ্ক ওরেলের সঙ্গে ৩৯৯ রানের জুটি গড়ে তোলেন, যার মধ্যে তাঁর ২২৬ রানের ইনিংস প্রায় সাড়ে নয় ঘণ্টা স্থায়ী হয়।
অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধেও তাঁর পারফরম্যান্স ছিল সমান স্মরণীয়। ১৯৬০ সালের ব্রিসবেনে ইতিহাসের প্রথম টাই হওয়া টেস্টে তিনি খেলেন ১৩২ রানের অনবদ্য ইনিংস। ১৯৬১ সালে সিডনি টেস্টে করেন ১৬৮ রান। আবার ১৯৬৮-৬৯ মৌসুমে ব্রিসবেনেই অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ৬ উইকেটে ৭৩ রান দিয়ে নিজের সেরা বোলিং পারফরম্যান্স উপহার দেন। সেই সিরিজে প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও টানা ২২টি আট বলের ওভার করে তাঁর অসাধারণ ফিটনেসের নজির স্থাপন করেন।
স্যার ফ্র্যাঙ্ক ওরেলের অবসরের পর ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের নেতৃত্বের দায়িত্বও কাঁধে তুলে নেন গ্যারি সোবার্স। অধিনায়ক হিসেবে ৩৯টি টেস্টে নেতৃত্ব দিয়ে দলকে একাধিক সাফল্য এনে দেন। টেস্ট ক্রিকেটে ৮,০০০-এর বেশি রান এবং ২০০-র বেশি উইকেটের বিরল কৃতিত্ব অর্জন করেছেন মাত্র দু'জন ক্রিকেটার, স্যার গ্যারি সোবার্স এবং জ্যাক ক্যালিস।
১৯৬৮ সালে কাউন্টি ক্রিকেটে নটিংহ্যামশায়ারের হয়ে গ্ল্যামরগানের বিরুদ্ধে এক ওভারে ছয়টি ছক্কা মেরে পেশাদার ক্রিকেটে প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে এই অনন্য নজিরও গড়েছিলেন তিনি।
গ্যারি সোবার্সের প্রয়াণে শোকপ্রকাশ করে ভারতের কিংবদন্তি ব্যাটার সুনীল গাভাস্কার বলেন, “আজ সম্ভবত ক্রিকেটের জন্য সবচেয়ে দুঃখের দিন। পৃথিবীর সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। স্যার গারফিল্ড সোবার্সকে ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। ছোটবেলায় আমরা ব্যাট বা বল হাতে যা হওয়ার স্বপ্ন দেখি, তিনি ছিলেন তারই প্রতিচ্ছবি।
তাঁর অসংখ্য স্মৃতি আজ বারবার ফিরে আসছে। সেই স্মৃতিগুলোকেই আমি আজীবন হৃদয়ে আগলে রাখব। শান্তিতে থাকুন, স্যার গারফিল্ড। আপনি চিরকাল আমাদের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবেন।”
স্যার গ্যারি সোবার্সের মৃত্যু শুধু ওয়েস্ট ইন্ডিজ নয়, সমগ্র ক্রিকেট বিশ্বের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর কীর্তি, প্রতিভা এবং খেলাটির প্রতি অবদান আগামী প্রজন্মের ক্রিকেটারদের কাছে চিরকাল অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।