মশালের আলো, ধামসা-মাদলের তালে রাতজাগা গ্রাম—হাতির ভয়ে লালগড়ে কৃষকদের অভিনব পাহারা
দেবকিশোর চক্রবর্তী
রাত গভীর হলেই যেখানে জঙ্গলমহলের গ্রামগুলি নেমে আসে নিস্তব্ধতার চাদরে, সেখানে এখন উল্টো ছবি। অন্ধকার মাঠের ধারে জ্বলছে মশাল। কোথাও আগুন ঘিরে বসে রয়েছেন একদল মানুষ। আবার কোথাও ধামসা-মাদলের তালে চলছে গান ও নাচ। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, কোনও উৎসবের আয়োজন চলছে। কিন্তু বাস্তবটা সম্পূর্ণ আলাদা। আনন্দের জন্য নয়, বরং নিজেদের ফসল ও জীবন-জীবিকা রক্ষা করতেই রাত জেগে এমন অভিনব পাহারা দিচ্ছেন ঝাড়গ্রামের লালগড়ের একাধিক গ্রামের বাসিন্দারা।
লালগড় রেঞ্জের ভাউদি বিটের আজনাশুলি, তালডাঙা-সহ আশপাশের এলাকায় হাতির আনাগোনা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে হাতির দল বড় সংখ্যায় এলাকায় ঘোরাফেরা করায় নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এলাকায় প্রায় ১২০ থেকে ১৩০টি হাতির উপস্থিতির কথা উঠে এসেছে। দিনের আলোয় জঙ্গলের দিকে হাতির দলকে দেখা গেলেও সন্ধ্যা নামার পরই শুরু হচ্ছে আসল উৎকণ্ঠা। কখন কোন দিক থেকে হাতির দল ধানখেতে ঢুকে পড়বে, সেই আশঙ্কায় ঘুম উড়েছে কৃষকদের।
এই সময়টায় মাঠে পড়ে থাকে কৃষকের কয়েক মাসের পরিশ্রম। ধানের চারা রোপণ থেকে শুরু করে পরিচর্যা—একটি ফসলের পিছনে জড়িয়ে থাকে পরিবারের আশা, সংসারের খরচ এবং আগামী দিনের পরিকল্পনা। অথচ হাতির একটি দল মাঠে ঢুকে পড়লে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে সেই সমস্ত পরিশ্রম। হাতির পায়ের তলায় মাড়িয়ে যেতে পারে ধান, খেয়ে ফেলতে পারে পরিণত শস্য। ফলে ফসল কাটার আগের এই সময়টাতেই সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকেরা।
তাই সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের মানুষ দল বেঁধে বেরিয়ে পড়ছেন। কারও হাতে মশাল, কারও হাতে টর্চ। সঙ্গে থাকছে ধামসা-মাদল। হাতির উপস্থিতির খবর পেলেই শুরু হচ্ছে সম্মিলিত আওয়াজ। বাজছে বাদ্যযন্ত্র, চলছে চিৎকার, কখনও আবার গান। উদ্দেশ্য একটাই—হাতির দল যেন মানুষের বসতি ও চাষের জমির দিকে এগিয়ে না আসে।
এই রাতজাগার দৃশ্যের মধ্যে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য রয়েছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে গ্রামবাসীরা যেন উৎসবে মেতে উঠেছেন। কিন্তু তাঁদের মুখে আনন্দের বদলে রয়েছে উদ্বেগ। নাচ-গানের মধ্যেও নজর থাকে জঙ্গলের দিকে। একটু শব্দ হলেই সবাই সতর্ক হয়ে ওঠেন। হাতির দল কোনদিকে যাচ্ছে, কোথায় রয়েছে, কখন মাঠে ঢুকতে পারে—সেই হিসাব করেই চলে রাতের পাহারা।
গ্রামবাসীদের বক্তব্য, হাতির সমস্যা দীর্ঘদিনের। ফসল নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কখনও কখনও বাড়িঘর ভাঙার ঘটনাও ঘটে। ফলে হাতি দেখলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ভয় পেলেও ফসলের মাঠ ছেড়ে দূরে সরে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ মাঠের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাঁদের জীবিকা। তাই নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী হাতি ঠেকানোর চেষ্টা করছেন তাঁরা।
আধুনিক কোনও সরঞ্জাম বা বিশেষ প্রযুক্তি তাঁদের হাতে নেই। সেই জায়গায় গ্রামের চেনা বাদ্যযন্ত্রই হয়ে উঠেছে রাতের পাহারার অন্যতম হাতিয়ার। ধামসা-মাদলের তীব্র শব্দ এবং মানুষের সম্মিলিত আওয়াজে হাতির দলকে দূরে রাখার চেষ্টা চলছে। মশালের আলোও ব্যবহার করা হচ্ছে হাতির গতিবিধি নজরে রাখার জন্য। একসঙ্গে বহু মানুষ পাহারা দেওয়ায় একদিকে যেমন হাতির গতিবিধির খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, অন্যদিকে বিপদের সময় একে অপরকে সাহায্য করাও সম্ভব হচ্ছে।
হাতির হামলায় ফসল নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে কৃষকদের একাংশের। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ক্ষতির পর দ্রুত ক্ষতিপূরণ না পেলে তাঁদের আর্থিক সমস্যায় পড়তে হয়। হাতির দাপট এবং ফসলের ক্ষতি নিয়ে বন দফতরের কাছে সমস্যার কথা জানিয়েছেন তাঁরা। হাতি-মানুষের সংঘাত কমাতে প্রশাসনের আরও সক্রিয় ভূমিকার দাবিও উঠেছে।
বন দফতরের তরফে অবশ্য পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। হাতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মানুষকে সতর্ক করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তবে জঙ্গল লাগোয়া এলাকায় হাতির চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করা সহজ নয়। খাবার ও জলের সন্ধানে হাতিরা এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলে যায়। আর সেই যাতায়াতের পথেই অনেক সময় পড়ে মানুষের বসতি ও কৃষিজমি।
লালগড়ের রাতজাগা মানুষগুলির গল্প তাই শুধুমাত্র হাতি তাড়ানোর একটি অভিনব কৌশলের গল্প নয়। এর মধ্যে রয়েছে জঙ্গল ও মানুষের সহাবস্থানের কঠিন বাস্তবতা। বন বাঁচবে, হাতিও থাকবে—আবার সেই জঙ্গলের পাশেই মানুষ চাষ করে সংসার চালাবেন। কিন্তু এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি না হলে সংঘাতের আশঙ্কা থেকেই যাবে।
রাত যত বাড়ে, মশালের আগুন ততই জ্বলতে থাকে। ধামসা-মাদলের শব্দ ছড়িয়ে পড়ে অন্ধকার মাঠের দিকে। ক্লান্ত চোখে পাহারা দিতে থাকেন গ্রামের মানুষ। তাঁদের কাছে সেই রাতের গান কোনও উৎসবের গান নয়, সেই নাচ কোনও আনন্দের নাচ নয়। প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি আওয়াজের পিছনে রয়েছে কয়েক মাসের পরিশ্রম বাঁচানোর চেষ্টা।
ভোর হলে হয়তো মাঠের ধান অক্ষত থাকবে, হয়তো কোনও অংশে হাতির পায়ের ছাপ দেখা যাবে। কিন্তু পরের রাতের চিন্তা তখনও থেকেই যাবে। কারণ লালগড়ের এই মানুষগুলির কাছে এখন রাত মানেই শুধু অন্ধকার নয়—রাত মানেই পাহারা, উদ্বেগ আর ফসল বাঁচানোর লড়াই।মশালের আলোয়, ধামসা-মাদলের তালে তাই জেগে থাকে লালগড়ের গ্রাম। উৎসবের মতো দেখতে সেই রাত আসলে এক কঠিন সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি—হাতির সঙ্গে লড়াই নয়, নিজেদের বেঁচে থাকার লড়াই।