কৃষ্ণের জন্মদিনে সাজের নেপথ্যে বাংলার মুসলিম কারিগর

Story by  Sampee Chakroborty Purkayastha | Posted by  Aparna Das • 20 h ago
কৃষ্ণের জন্মদিনে সাজের নেপথ্যে বাংলার মুসলিম কারিগর
কৃষ্ণের জন্মদিনে সাজের নেপথ্যে বাংলার মুসলিম কারিগর
 
শম্পি চক্রবর্তী পুরকায়স্থ 

জন্মাষ্টমী মানেই কৃষ্ণের জন্মের অপেক্ষা। মন্দিরে মন্দিরে প্রস্তুতি, ঘরে ঘরে ছোট্ট গোপালকে সাজানোর আয়োজন। কোথাও তিনি বালগোপাল, কোথাও নন্দলাল, কোথাও রাধার সঙ্গে যুগলবেশে। কৃষ্ণের জন্মমুহূর্তকে ঘিরে ভক্তির এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আর একটি ব্যস্ত জগত, কৃষ্ণের পোশাক তৈরির জগত। আর সেই জগতের নেপথ্যে রয়েছেন এমন বহু কারিগর, যাঁদের ধর্মীয় পরিচয় কৃষ্ণের ভক্তের থেকে আলাদা হলেও তাঁদের হাতেই তৈরি হচ্ছে কৃষ্ণের সাজ।
 
কলকাতার বড়বাজারে ঢুকলে জন্মাষ্টমীর সেই ছবিটা আরও স্পষ্ট। বিশাল পাইকারি বাজারের একের পর এক দোকানে সাজানো রাধারানির পোশাক, কৃষ্ণের রাজবেশ, বালগোপালের ধুতি-পাঞ্জাবি, লাড্ডু গোপালের ক্ষুদ্র পোশাক। কয়েক ইঞ্চির মূর্তির জন্য তৈরি পোশাকও যেন মানুষের জামাকাপড়ের বাজারের মতোই বৈচিত্র্যময়। জরি, চুমকি, পুঁতি, পাথর, রেশমি কাপড়, সব মিলিয়ে ছোট্ট গোপালের জন্য তৈরি হচ্ছে এক-একটি পূর্ণাঙ্গ সাজ।
 
এই বিপুল বাজারের পিছনে রয়েছেন বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের কারিগর। তাঁদের মধ্যে মুসলিম কারিগরদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে রাধা-কৃষ্ণ ও গোপালের পোশাক তৈরির কাজ করছেন। বাড়ির ঘরেই অনেক সময় তৈরি হচ্ছে ছোট ছোট পোশাক। পরিবারের একাধিক মানুষ যুক্ত হচ্ছেন কাজে। জন্মাষ্টমীর অর্ডার বাড়লে দিন-রাতের হিসাবও বদলে যাচ্ছে।
 
অফজল মোল্লার হাতে তখন কৃষ্ণের পোশাক তৈরির ব্যস্ততা। কাপড়ের মাপ ছোট, কিন্তু কাজের সূক্ষ্মতা বড়। গোপালের শরীরের মাপ অনুযায়ী কাপড় কাটা, সেলাই, জরি বসানো, নকশা করা, প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন নিখুঁত হাতের কাজ।
 
শুধু কৃষ্ণ নয়, একই কারিগরের হাতে তৈরি হচ্ছে রাধারানির পোশাকও। রাধার ঘাগরা, ওড়না, কৃষ্ণের রাজবেশ, যুগলবেশ, অর্ডার অনুযায়ী বদলে যাচ্ছে নকশা। আর সব থেকে বেশি সূক্ষ্ম কাজ লাগে লাড্ডু গোপালের পোশাকে। কয়েক ইঞ্চির শরীরের জন্য তৈরি করতে হয় ধুতি, জামা বা রাজবেশের ক্ষুদ্র সংস্করণ।
 
শাকিবের কাজের জায়গাতেও জন্মাষ্টমীর সেই ব্যস্ততা। একসঙ্গে তৈরি হচ্ছে একাধিক অর্ডার। কোনওটি বাংলার কোনও বাড়ির গোপালের জন্য, কোনওটি আবার বড় মন্দিরের বিগ্রহের জন্য। পোশাকের নকশা বদলালেও কাজের জায়গায় একটিই লক্ষ্য, মাপ এবং ফিনিশিং যেন নিখুঁত হয়।
 
আবু হোসেনের হাতেও একই কাজ। রঙিন কাপড়ের উপর জরি বসছে। কোথাও পুঁতির কাজ, কোথাও চুমকি। তাঁর তৈরি পোশাক বড়বাজারের বাজারে পৌঁছচ্ছে, সেখান থেকে যাচ্ছে বাংলার বিভিন্ন জায়গায়। পাইকারি বাজারের এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কয়েক ইঞ্চির একটি গোপালের পোশাকও পৌঁছে যাচ্ছে বহু দূরের কোনও বাড়ির ঠাকুরঘরে।
 
কলকাতার বড়বাজারের এই বাজারের সঙ্গে অবশ্য কৃষ্ণের জন্মভূমি মথুরা-বৃন্দাবনের কারিগরি পরম্পরার একটি অদৃশ্য যোগ রয়েছে। মথুরা ও বৃন্দাবনে বহু মুসলিম কারিগর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কৃষ্ণ, রাধারানি ও লাড্ডু গোপালের পোশাক তৈরি করে আসছেন। জন্মাষ্টমীর আগে সেখানে রেশম, জরি ও নানা অলংকরণে তৈরি হয় কৃষ্ণের বিশেষ সাজ। রাধারানির পোশাকেও থাকে আলাদা নকশা ও কারুকাজ।
 
কৃষ্ণের জন্মভূমিতে মুসলিম কারিগরের হাতে তৈরি কৃষ্ণের পোশাক, এই ছবির সঙ্গে কলকাতার বড়বাজারের দৃশ্যটিকে পাশাপাশি রাখলে গল্পটি আরও বড় হয়ে ওঠে। কারণ এখানে শুধু ধর্মীয় উৎসবের বাজার নেই, রয়েছে এক প্রজন্ম থেকে আর এক প্রজন্মে চলে আসা কারুশিল্পের পরম্পরা।
 
বাংলায় গোপালকে ঘরের সন্তান হিসেবে দেখার সংস্কৃতিও এই বাজারকে আরও বিস্তৃত করেছে। জন্মাষ্টমীর দিন অনেক বাড়িতে গোপালের জন্য নতুন পোশাক আসে। কেউ তাঁকে রাখাল সাজে সাজান, কেউ রাজবেশে, কেউ আবার রাধার সঙ্গে যুগলবেশে। ফলে কৃষ্ণের পোশাক এখন শুধু মন্দিরের প্রয়োজন নয়, তা ঢুকে পড়েছে বাঙালির ঘরের ঠাকুরঘরেও।
 
এই ছোট্ট পোশাকগুলির দিকে তাকালে তাই শুধু ধর্মীয় আবেগের ছবি দেখা যায় না। দেখা যায় একটি বড় কারিগরি অর্থনীতি। কাপড়ের ব্যবসায়ী, জরি-চুমকির কারিগর, সেলাইশিল্পী, মুকুট প্রস্তুতকারক, পাইকারি ব্যবসায়ী, সবাই কোনও না কোনওভাবে জড়িয়ে রয়েছেন জন্মাষ্টমীর এই বাজারের সঙ্গে। তার মধ্যেই সবচেয়ে নীরব অথচ তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা তাঁদের, যাঁরা নিজের ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে না এনে নিজেদের শিল্পকে সামনে রেখেছেন।
 
মথুরা-বৃন্দাবনে যেমন মুসলিম কারিগরের হাতে তৈরি হচ্ছে কৃষ্ণের পোশাক, তেমনই কলকাতার বড়বাজারের বাজারে জায়গা করে নিয়েছে বাংলার মুসলিম কারিগরদের তৈরি রাধা-কৃষ্ণ ও লাড্ডু গোপালের সাজ।জন্মাষ্টমীর রাতে ভক্তের চোখ থাকবে কৃষ্ণের দিকে। তাঁর মাথার মুকুট, গায়ের পোশাক, কোমরের সাজ, হাতে বাঁশি, সবকিছু মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠবেন নন্দের সেই কাঙ্ক্ষিত সন্তান।
 
কিন্তু সেই সাজের আড়ালে থেকে যাবেন একজন কারিগর। হয়তো তিনি অফজল মোল্লা। হয়তো শাকিব। হয়তো আবু হোসেন। অথবা তাঁদের মতোই কোনও অচেনা শিল্পী, যাঁর হাতে তৈরি হয়েছে কয়েক ইঞ্চির সেই পোশাক।
 
কৃষ্ণের জন্মদিনে তাই তাঁর জন্মের কাহিনির পাশাপাশি উঠে আসতে পারে আর একটি গল্প, যে হাতে কৃষ্ণের সাজ তৈরি হয়, সেই হাতের কোনও ধর্মীয় পরিচয় নেই; তার পরিচয় শুধু শিল্পীর।