হঠাৎ কেন নজরে রাজ্যের সব মাদ্রাসা? মেগা সমীক্ষার আসল উদ্দেশ্য কী? ৫ জুলাইয়ের মধ্যে রিপোর্ট চাইল নবান্ন
তরুণ নন্দী,কলকাতাঃ
পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ করতে এগোচ্ছে রাজ্য সরকার। নবান্নের সংখ্যালঘু বিষয়ক এবং মাদ্রাসা শিক্ষা দফতর থেকে জারি করা এক নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, রাজ্যের সমস্ত ব্লক সহ পুরসভা এলাকায় পরিচালিত মাদ্রাসার পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সংগ্রহের নির্দেশের কথা। আগামী ৫ জুলাইয়ের মধ্যে এই সমীক্ষা শেষ করে চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার ডেডলাইন বেঁধে দেওয়া হয়েছে জেলাশাসকদের। সরকারি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন, কোনো মাদ্রাসাই রাজ্য সরকারের এই সমীক্ষার আওতার বাইরে থাকছে না বলেই মনে করা হচ্ছে।
নবান্ন সূত্রে এই পদক্ষেপ নিয়ে চলছে নানা চর্চা। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যটি বেশ বহুমুখী। নির্দেশিকায় অনুযায়ী সমীক্ষায় প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতি, পরিচালন ব্যবস্থা এবং আইনি বৈধতা যাচাই করা হবে। পঠনপাঠনের ঘর থেকে পানীয় জল ও শৌচাগারের মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধার বর্তমান দশা খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি পঠনপাঠনের সামগ্রিক পরিবেশ মূল্যায়ন করা হবে সমীক্ষার মাধ্যমে। সেইসঙ্গে মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীদের সঠিক সংখ্যা এবং তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থান চিহ্নিত করার কাজও চলবে। রাজ্য সরকারের দাবি, একটি নির্ভরযোগ্য ‘ডেটা ব্যাংক’ তৈরি করার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ। মনে করা হচ্ছে, এই ব্যবস্থা ভবিষ্যৎ শিক্ষাগত পরিকল্পনা এবং শিশু কল্যাণে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। একই সঙ্গে, কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়মের অসঙ্গতি বা বেআইনি কার্যকলাপ থাকলে তা চিহ্নিত করে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়াও এর অন্যতম উদ্দেশ্য বলেই মনে করছেন অভিজ্ঞমহল।
সমস্ত স্তরের মাদ্রাসায় এমন আকস্মিক সমীক্ষার ঘোষণায় সংশ্লিষ্ট মহলগুলিতে কিছুটা উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। তবে রাজ্য সরকার এই বিষয়ে অত্যন্ত পরিপক্ব অবস্থান নিয়েছে। নির্দেশিকায় স্পষ্ট ভাষায় আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, এই সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করে কোনো মাদ্রাসার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক শাস্তিমূলক পদক্ষেপ বা তা বন্ধ করে দেওয়ার মতো কোনো ‘কোয়ার্সিভ অ্যাকশন’ নেওয়া হবে না। এমনকি শিক্ষাবর্ষের স্বাভাবিক পঠনপাঠন ব্যাহত না করার পাশাপাশি কোনো পড়ুয়াকে উচ্ছেদ না করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকমহলের একাংশ মনে করছেন, নবান্নের এই সিদ্ধান্ত আসলে মাদ্রাসা শিক্ষাকে একটি সুসংহত কাঠামোর মধ্যে আনার এক নিয়মতান্ত্রিক প্রয়াস হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরেই নানামহলে স্বীকৃতি না পাওয়া ও বেসরকারি মাদ্রাসাগুলির পরিকাঠামোর আধুনিকীকরণের অভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল। একটি নির্ভরযোগ্য ডেটা ব্যাংক তৈরি হলে রাজ্য সরকার অনুদান বণ্টন, আধুনিক পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্তি আর পরিকাঠামোগত উন্নয়ন করে মাদ্রাসাগুলোর উন্নতি করতে পারবে। তবে অবশ্যই এই উদ্যোগের সাফল্য সম্পূর্ণ নির্ভর করছে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার ওপর। ৫ জুলাইয়ের মধ্যে জমা পড়তে চলা এই রিপোর্ট আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসা শিক্ষার রূপরেখা কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার দেখার বিষয়।