ছেলে শ্যামলের পাশে জাহিদ-রবিউল, পথে খৈ ছড়ালেন কাদের; দাহ শেষে শ্যামলদের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে তবেই ফিরলেন মুসলিম প্রতিবেশীরা
দেবকিশোর চক্রবর্তী
মৃত্যুর কাছে হার মেনে যায় সব পরিচয়। সেখানে ধর্মের বিভেদও যেন মুছে যায় মানুষের সম্পর্কের কাছে। মুর্শিদাবাদের শমসেরগঞ্জের এক গ্রামে ৭৯ বছরের সবিতা সরকারের শেষযাত্রায় দেখা গেল তেমনই এক হৃদয়ছোঁয়া ছবি। নিজের ছেলে শ্যামল তমালের পাশাপাশি মায়ের মরদেহ কাঁধে তুলে নিলেন প্রতিবেশী মুসলিম যুবক জাহিদ ও রবিউল। তাঁদের সঙ্গে শেষযাত্রায় শামিল হন আরও অনেকে। ধর্মের সীমানা পেরিয়ে এই শেষযাত্রা হয়ে উঠল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
বয়সজনিত কারণে মৃত্যু হয় সবিতা সরকারের। খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নামে এলাকায়। শেষকৃত্যের প্রস্তুতি শুরু হলে হিন্দু প্রতিবেশীদের সঙ্গে এগিয়ে আসেন মুসলিম যুবকেরাও। নিজের ছেলের পাশে কাঁধ মেলান জাহিদ ও রবিউল। পরিচিত প্রতিবেশীর মরদেহ তাঁরা শুধু বহনই করেননি, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পাশে থেকেছেন আপনজনের মতো।
প্রতীকী ছবি: ধর্মের বিভেদ ভুলে শেষযাত্রায় প্রতিবেশীর পাশে প্রতিবেশী
পাহাড় ঘাটি মহাশ্মশানের উদ্দেশে যখন শেষযাত্রা এগিয়ে চলেছে, তখন পথজুড়ে ফুটে উঠেছে আবেগ আর সম্প্রীতির ছবি। শেষযাত্রার পথে খৈ ছড়িয়েছেন কাদের। ধর্মীয় রীতিনীতি পালন চলেছে আপন গতিতে, আর তার পাশেই থেকেছেন মুসলিম প্রতিবেশীরা, কোনও বিভেদ নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতাকে সামনে রেখে।
এই সম্পর্ক অবশ্য আজকের নয়। জীবিত অবস্থায় সবিতা সরকারের বাড়ির উঠোনে বিকেল কিংবা সন্ধ্যায় বসত প্রতিবেশীদের আড্ডা। সেখানে ধর্ম কখনও সম্পর্কের মাঝে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়নি। হাসি-গল্প, সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার সেই প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কই যেন তাঁর শেষযাত্রায় আরও গভীর হয়ে ধরা দিল।
জাহিদ হাসানের কথাতেও উঠে এসেছে সেই মানবিক সম্পর্কের কথা। তিনি বলেন, “শ্যামলদা মোড় অত্যন্ত পরিচিত। খবর পেয়েছি আমরা। কিন্তু মৃত্যুর চেয়ে বড় বিপদ নেই।” তাঁর এই কথাতেই যেন ধরা পড়ে প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ববোধের সহজ অথচ গভীর দর্শন। বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়ানোই যে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়, তাঁর কথায় সেই বার্তাই স্পষ্ট।
সবিতা দেবীর দাহকার্য শেষ হওয়ার পরও দায়িত্ব শেষ হয়নি জাহিদদের। মহাশ্মশান থেকে শ্যামলদের বাড়ি পৌঁছে দেন তাঁরা। তারপর নিজেদের বাড়ির পথে ফেরেন। অর্থাৎ শেষযাত্রার শুরু থেকে দাহকার্য শেষ হওয়া এবং শোকাহত পরিবারকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া, পুরো সময়টাই তাঁরা পাশে ছিলেন পরিবারের মানুষের মতো।
আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে শমসেরগঞ্জের এই ঘটনা তাই নিছক একটি শেষযাত্রার গল্প নয়। এটি এমন এক সামাজিক সম্পর্কের ছবি, যেখানে ধর্মের পরিচয়ের আগে জায়গা পেয়েছে প্রতিবেশীর সম্পর্ক, আর আনুষ্ঠানিকতার আগে স্থান পেয়েছে মানবিকতা।
প্রতীকী ছবি: ধর্মের বিভেদ ভুলে শেষযাত্রায় প্রতিবেশীর পাশে প্রতিবেশী
একজন হিন্দু বৃদ্ধার শেষযাত্রায় তাঁর নিজের ছেলের সঙ্গে মুসলিম প্রতিবেশীর কাঁধ মিলে যাওয়া যেন সমাজকে একটি সহজ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়, মানুষের দুঃখের সময়ে পাশে দাঁড়ানোর জন্য কি সত্যিই ধর্মের পরিচয় প্রয়োজন?
শমসেরগঞ্জের মানুষ তার উত্তর দিয়েছেন নিজেদের কাজের মধ্য দিয়েই। সবিতা সরকার আর নেই। কিন্তু তাঁর শেষযাত্রার সেই দৃশ্য হয়তো বহুদিন মনে থাকবে গ্রামবাসীর। ছেলে শ্যামলের কাঁধের পাশে জাহিদ ও রবিউলের কাঁধ, পথে কাদেরের ছড়ানো খৈ, আর দাহ শেষে শ্যামলদের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে নীরবে নিজেদের ঘরে ফেরা, সব মিলিয়ে এই শেষযাত্রা যেন বলে গেল একটাই কথা, "ধর্ম যার যার, কিন্তু বিপদে-আপদে মানুষ মানুষেরই পাশে দাঁড়ায়। আর সেই মানবিকতাই সবচেয়ে বড় সম্প্রীতি"।