নয়াদিল্লি
প্রতিবছরের কাঁওয়ার যাত্রায় শিবভক্তরা হরিদ্বার থেকে গঙ্গাজল সংগ্রহ করে নিজেদের এলাকার শিবমন্দিরে তা নিবেদন করতে দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে অতিক্রম করেন। এই যাত্রাপথে বহু জায়গায় মুসলিমদের নিঃস্বার্থ সেবা ও সহযোগিতার দৃশ্য ভারতের সাধারণ মানুষের অন্তর্নিহিত ঐক্য ও সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
দিল্লি-এনসিআর অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ কাঁওয়ার যাত্রীদের জন্য অস্থায়ী শিবির গড়ে তুলেছেন। সেখানে ভক্তরা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে পারছেন এবং তাঁদের ‘কাঁওয়ার’, অর্থাৎ গঙ্গাজলভর্তি পাত্র, মাটিতে না রেখে উঁচু স্থানে নিরাপদে রাখতে পারছেন। বিভিন্ন মুসলিম সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী ও সাধারণ মানুষ যাত্রীদের জন্য চিকিৎসা পরিষেবা, বিশ্রামের ব্যবস্থা এবং খাবার-দাবারেরও আয়োজন করেছেন।
অনেক জায়গায় টুপি পরিহিত মুসলিমদের কাঁওয়ার যাত্রীদের ওপর ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে দিতে এবং তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে দেখা গেছে। আবার কোথাও কোনো শিবির না থাকলেও অনেক মুসলিম স্বতঃস্ফূর্তভাবে কলার মতো সহজপাচ্য খাবার তুলে দিয়েছেন যাত্রীদের হাতে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই যাত্রীদের অনেকেই খালি পায়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেন।
কাঁওয়ার যাত্রা হিন্দুদের একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থযাত্রা, যেখানে ভক্তরা গঙ্গার উৎস বা পবিত্র প্রবাহ থেকে জল সংগ্রহ করেন। পুরো যাত্রাপথে গঙ্গাজলভর্তি পাত্রটি মাটিতে রাখা যায় না। সেই কারণেই অধিকাংশ ভক্ত কাঁধে একটি দণ্ডের দুই পাশে ঝুলিয়ে ‘কাঁওয়ার’ বহন করেন।
এই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের আরেকটি উদাহরণ সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়। কাঁওয়ার যাত্রীরা যখন পথ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন সামনে এক মুসলিম ব্যক্তির জানাজার শোভাযাত্রা দেখতে পেয়ে তাঁরা নিজে থেকেই থেমে যান এবং শেষযাত্রার প্রতি সম্মান জানিয়ে পথ ছেড়ে দেন।
এক্স (আগের টুইটার)-এ প্রকাশিত আরেকটি ভিডিওতে এক কাঁওয়ার যাত্রী ও এক মুসলিম সমাজকর্মীর কথোপকথনও সম্প্রীতির এক হৃদয়স্পর্শী বার্তা তুলে ধরে। হরিয়ানার একটি গ্রাম থেকে চার দিন ধরে হেঁটে আসা ওই শিবভক্ত জানান, তিনি ৯ বা ১০ আগস্টের মধ্যে তাঁর গন্তব্যে পৌঁছানোর আশা করছেন।
মুসলিম সমাজকর্মী তাঁকে জল পান করিয়ে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানান। জবাবে ওই যাত্রী বলেন, যারা ধর্মের নামে ঘৃণা ছড়ায়, তাদের বোঝা উচিত, মানবতাই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়। তিনি আরও বলেন, তাঁর বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং সবাই মিলে মানুষের সেবা করেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে যেমন হিন্দু ও মুসলিম কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিলেন, তেমনই আজও দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য এই ঐক্য অপরিহার্য বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
কথোপকথনের শেষে দু'জনেই দেশবাসীর কাছে ভালোবাসা, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা আরও বেশি করে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান, যাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আরও সুদৃঢ় হয় এবং ঘৃণার রাজনীতি পরাজিত হয়।
আরও একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনায় দেখা যায়, এক মুসলিম শিশু পথ থেকে কুড়িয়ে পাওয়া এক কাঁওয়ার যাত্রীর হারিয়ে যাওয়া মানিব্যাগ নিরাপদে তাঁর হাতে ফিরিয়ে দেয়।
মানিব্যাগটিতে একটি মোবাইল নম্বর, আধার কার্ড, প্যান কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স, সৌদি আরবের ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা নগদ ছিল। শিশুটি মানিব্যাগটি নিজের কাছে রেখে না দিয়ে, তাতে থাকা মোবাইল নম্বরের সাহায্যে প্রকৃত মালিকের সন্ধান করে সেটি ফিরিয়ে দেয়। এমনকি সব নথিপত্র ও টাকা ঠিকঠাক আছে কি না, সেটিও যাচাই করে নিতে অনুরোধ করে।
ঘটনায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ওই কাঁওয়ার যাত্রী। তিনি শিশুটির সততা ও মানবিকতার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, এমন মানুষদের কারণেই সমাজে বিশ্বাস, ভ্রাতৃত্ব ও মানবতা আজও বেঁচে রয়েছে।
একই ধরনের আরেকটি ঘটনায় এক কাঁওয়ার যাত্রী এক মুসলিম যুবকের প্রশংসা করেন। ওই যুবক যাত্রীর গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রভর্তি একটি প্যাকেট কুড়িয়ে পেয়ে অনেক চেষ্টা করে প্রকৃত মালিককে খুঁজে বের করেন এবং তা তাঁর হাতে ফিরিয়ে দেন।
যাত্রীটি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ওই যুবককে টাকা দিতে চাইলে তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। পরে কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবে কাঁওয়ার যাত্রী তাঁকে একটি জুসের প্যাকেট উপহার দেন।
ভারতের আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে আরও একবার সামনে এনে, এক মুসলিম যুবককেও কঠোর কাঁওয়ার যাত্রায় অংশ নিতে দেখা যায়। যদিও এই সিদ্ধান্তের কারণে তিনি স্থানীয় কিছু মুসলিমের হুমকির মুখে পড়েছিলেন, তবুও নিরাপত্তার মধ্যে থেকে তিনি তাঁর এই তীর্থযাত্রা সম্পন্ন করেন।