এ দরবারে সবাই সমান! বখতিয়ার খিলজির মাজারে মাটির ঘোড়া আর চাদর চড়িয়ে হিন্দু-মুসলিম মিলেমিশে একাকার
তরুণ নন্দী / কলকাতা
ইতিহাসের পাতা উল্টালে যাঁর নাম ভেসে ওঠে এক দুর্ধর্ষ সেনাপতি হিসেবে, কিন্তু দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুরের পিরপাল এলাকায় কালের নিয়মে আজ তিনিই এক শান্তির দূত। ইখতিয়ার উদ্দিন মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি যাঁর বীরত্ব একসময় বাংলা কাঁপিয়েছিল, আজ তাঁর মাজার ঘিরেই দেখা যায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক বিরল ছবি। বৈশাখী মাস জুড়ে সেই মাজার চত্বরে থাকে না কোনো বিভেদ। উৎসবের আবহে মিলেমিশে এক হয়ে যায় আজান আর শঙ্খধ্বনি।
দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুরের এই ঐতিহ্যবাহী পীরসাহেবের মাজারকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে বার্ষিক সম্প্রীতির মেলা। সকাল থেকেই নানা ধর্মের মানুষের উপস্থিতিতে মাজার চত্বরে তিল ধারণের জায়গা থাকেনা। এক হাতে ফুলের সাজি, অন্য হাতে দুধ-বাতাসার থালা নিয়ে লাইনে দাঁড়ানে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষজন। দেখা গেল, কেউ দিচ্ছেন চাদর, কেউ বা ভক্তিভরে অর্পণ করছেন বেলপাতা ও খাগড়া। বলা ভালো, মাজারের এই ছবি যেন বাংলার শাশ্বত সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল।
স্থানীয় সূত্রে শোনা যায়, ১২০৬ সালে তিব্বত অভিযানে ব্যর্থ হয়ে দেবীকোটে ফিরে আসার পর অসুস্থ অবস্থায় সেনাপতি আলি মর্দানের হাতে নিহত হন বখতিয়ার খিলজি। তার মৃত্যুর পর এখানেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। কালের নিয়মে বখতিয়ার খিলজির দুর্ধর্ষ যোদ্ধার পরিচয় ছাপিয়ে আজ স্থানীয়দের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন পরম শ্রদ্ধেয় ‘পীরসাহেব’। কথিত আছে, এখানে যদি কেউ ভক্তিভরে মানত করেন তবে কেউ খালি হাতে ফেরে না। আর সেই বিশ্বাস থেকেই মুসলিমদের পাশাপাশি বহু হিন্দু পরিবার তাঁদের মানত পূরণে উৎসর্গ করেন মাটির ঘোড়া।
মেলার আসা এক বৃদ্ধ দর্শনার্থী বললেন, আমরা জানি না উনি ইতিহাসে কী ছিলেন, আমরা শুধু জানি উনি আমাদের পীরবাবা। বিপদে-আপদে ওঁর দরবারে হিন্দু-মুসলিম সবাই আসি। জানা গেল, এই সম্প্রীতির বার্তা আরও জোরালো হবে যখন মাজার চত্বরে বসবে ঐতিহ্যবাহী ‘সত্যপীরের গানের আসর’। সুরের মূর্ছনায় সেসময় জাত-পাতের ভেদাভেদ যেন উধাও হয়ে যায়।
মাজারে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের একটি দৃশ্য
দেশজুড়ে মাঝেমাঝেই ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার খবর যখন শান্তিপ্রিয় মানুষদের মন ভারাক্রান্ত করে তখন গঙ্গারামপুরের এই সম্প্রীতির মেলা যেন হয়ে ওঠে এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। এখানে বখতিয়ার খিলজি যেন হয়ে উঠেছেন এক আধ্যাত্মিক যোগসূত্র।
এমনিতেই বাংলায় বলা হয় ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। পিরপালের এই মাজারের মাহাত্ম্যে উঠে এসেছে, ধর্মীয় হানাহানির চেয়ে মানুষের ভালোবাসার জয়গান অনেক বেশি শক্তিশালী। তাই উদাহরণসরূপ বলা যেতে পারে, এই মেলা আসলে বাংলার হাজার বছরের লালিত সম্প্রীতির এক অনন্য স্বাক্ষর।