সাকিব সেলিম
নারী ক্ষমতায়নের পথে প্রধান বাধা কী, এই প্রশ্নটি একবার বেগম শরীফা তৈয়বজিকে করা হলে তিনি হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, “পুরুষ, অবশ্যই।” ১৯৪৮ সালের ১৯ জানুয়ারি, জাতিসংঘের ‘কমিশন অন দ্য স্ট্যাটাস অব উইমেন’-এর অধিবেশন শেষে এই মন্তব্য করেছিলেন তিনি।
সেই কমিশনে অংশ নেওয়া ১৫টি দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে ভারতের হয়ে উপস্থিত ছিলেন বেগম শরীফা। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, নারীর সার্বিক উন্নতির চাবিকাঠি রাজনৈতিক ক্ষমতা। তিনি বলেছিলেন, “ভোটাধিকার পেলে ক্ষমতা আসে, আর ক্ষমতা এলেই শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা সহ অন্যান্য লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়।” অল ইন্ডিয়া উইমেনস কনফারেন্সের (AIWC) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও প্রথম ভারতীয় সভানেত্রী হিসেবে তিনি ভারতীয় নারীদের ভোটাধিকার অর্জনের জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম চালিয়েছেন। ১৯৩৩ সালেই তিনি ভারতের নারীদের ভোটাধিকার দেওয়ার পক্ষে প্রশ্ন করা প্রতিনিধিদের অন্যতম ছিলেন।
১৯২৬ সালে মার্গারেট কাজিন্সের সভাপতিত্বে AIWC গঠিত হলে শরীফা ছিলেন তার সক্রিয় সদস্য। ১৯২৭ ও ১৯২৮ সালে কাজিন্স সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন এবং পরবর্তীতে শরীফাই হন প্রথম ভারতীয় নারী, যিনি এই সম্মেলনের চেয়ারপার্সন হন।
জাতিসংঘে অন্যান্য প্রতিনিধিদের সাথে শরীফা তৈয়বজি
ইতিহাসের নথিতে তিনি পরিচিত ‘বেগম হামিদ আলি’ নামে, নিজের নাম, শরীফা তৈয়বজি, সেখানে যেন আড়ালেই থেকে গেছে। এ এক নির্মম বৈপরীত্য। ভারতের নারীবাদী চিন্তা ও আন্দোলনের অগ্রদূত যাঁদের হাতে গড়ে উঠেছে, তাঁদের একজনের পরিচয় আজও স্বামীর নামে আবদ্ধ। ১৯০৮ সালে আইসিএস অফিসার হামিদ আলির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর তাঁর ব্যক্তিসত্তা যেন ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ে মিলিয়ে যায়। এমনকি অল ইন্ডিয়া উইমেনস কনফারেন্সের সরকারি নথিপত্রেও তিনি ‘বেগম হামিদ আলি’, নিজের নামটি সেখানে অনুচ্চারিত, অবহেলিত।
মার্গারেট কাজিন্স লিখেছিলেন, “বেগমকে মনে পড়লেই তাঁর পাশে তাঁর সমান বৈশিষ্ট্যময় স্বামীকেও দেখি। দু’জনের মধ্যে ছিল গভীর সহযোদ্ধার সম্পর্ক, যেন তারা কোনো প্রাচীন মোগল চিত্র থেকে বেরিয়ে এসেছেন।”
১৮৮৩ সালে গুজরাটের গান্ধীবাদী আন্দোলনের দুই স্তম্ভ আব্বাস ও আমিনা তৈয়বজির ঘরে জন্ম শরীফার। বিয়ের এক বছর আগেই, ১৯০৭ সালে, তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে যোগ দিয়ে জনজীবনে প্রবেশ করেন।
রবার্ট ফ্লেমিং লিখেছেন, “১৯৩৩ সালে লন্ডনে রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সে ভারতের তিন প্রতিনিধির একজন ছিলেন বেগম হামিদ আলি। সেখানে তিনি নতুন সংবিধানে নারীর অবস্থান নিয়ে সাক্ষ্য দেন। পরের বছর ইস্তানবুলে বিশ্ব নারী সম্মেলনে, ১৯৩৭ সালে চেকোস্লোভাকিয়ার লুহাচোভিচে নারী সম্মেলনে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৩৩ ও ১৯৩৭ সালে জেনেভায় তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা এই দাবিটি মান্য করাতে সক্ষম হন যে, কোনো অ-ভারতীয় নারী ভারতের প্রতিনিধি হতে পারবেন না। ১৯৩৯ সালের দিল্লি প্রস্তাবে বিবাহ আইন সংস্কারের পক্ষে তিনি জোরালো সমর্থন দেন। ১৯৪৭ ও ১৯৪৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের লেক সাকসেসে জাতিসংঘের নারী কমিশনে ভারতের প্রতিনিধি ছিলেন তিনি।”
১৮৮৩ সালে গুজরাটের গান্ধীবাদী আন্দোলনের একটি দৃশ্য (ফাইল)
গান্ধীবাদী আন্দোলন ও মজদুর সেবা সংঘের সঙ্গেও তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। স্বামীর কর্মস্থল বদলের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় তিনি হাসপাতাল ও স্কুল স্থাপন করেন। ১৯৪০ সালে, যখন জিন্নাহ-নেতৃত্বাধীন মুসলিম লিগ পৃথক রাষ্ট্রের দাবি তুলেছে, সেই অস্থির সময়ে তিনি AIWC-এর সভাপতিত্ব করেন। তিনি বলেছিলেন, “ভারত বিভাজনের দাবি সাময়িক। এটি মুছে যাবে। আমরা হয়তো কিছুটা দুঃখী, কিন্তু আরও জ্ঞানী জাতি হয়ে বেরিয়ে আসব।”
ব্রিটিশরা যখন হিটলারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ভারতকে যোগ দিতে বলেছিল, শরীফার তীক্ষ্ণ মন্তব্য ছিল, “আমরা তো প্রতিটি প্রজন্মেই ঘরের ভেতর বহু হিটলারের অত্যাচার সহ্য করেছি।”
১৯৪০ সালের সভাপতির ভাষণে তিনি ভারতীয় পুরুষদের উদ্দেশে প্রশ্ন তুলেছিলেন, “নারীরা যে অন্যায় ভোগ করছে, সে বিষয়ে চোখ বন্ধ রেখে পুরুষরা কীভাবে স্বাধীনতার কথা বলতে পারে? দাসী মায়ের সন্তান মানসিকভাবে কখনোই মুক্ত হতে পারে না। ভারত তখনই স্বরাজ পাবে, যখন জনসংখ্যার অর্ধেককে তাদের ন্যায্য অধিকার দেওয়া হবে।”
নারীদের প্রতি আচরণের তুলনা তিনি নাৎসিবাদের সঙ্গে করে বলেছিলেন, “প্রত্যেক নারী তার জীবনের অধিকারী হবে। সে রান্নাঘরের মালকিন হতে চাইলে হবে, না চাইলে নয়। সন্তান ধারণ করবে কি করবে না, সেটিও তার সিদ্ধান্ত। সন্তানদের অভিভাবকত্বে পিতার সঙ্গে তার সমান অধিকার থাকবে। এই মানবিক অধিকার অস্বীকার করা অমানবিক ও অশালীন। আমাদের ঘরে ঘরে হিটলার ছিল, এই হিটলারবাদ চিরতরে বিলুপ্ত হোক।”
এই বক্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ তখন নেহরু সহ কংগ্রেস নেতারা হিটলারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ডাক দিচ্ছিলেন। শরীফা সরাসরি তাঁদেরই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করান।
অল ইন্ডিয়া উইমেনস কনফারেন্সের (AIWC) সদস্য (ফাইল)
AIWC-এর সভানেত্রী হিসেবে তিনি অভিন্ন দেওয়ানি বিধির সমর্থক ছিলেন। ১৯৪০ সালের আগস্টে AIWC-এর পত্রিকা রোশনি-তে তিনি লেখেন, “বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, পণ ইত্যাদি বিষয়ে সব ধর্মের নারীদের জন্য আধুনিক আইন প্রয়োজন। ব্যক্তিগত আইন সংস্কার করে একদিন একটি অভিন্ন ভারতীয় দেওয়ানি বিধি প্রণীত হবে, এই আশা আমাদের।”
ইসলামে নারীর অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট বলেন, “শরিয়তের প্রসঙ্গ এখানে বারবার আসে। মুসলিম নারীরা কিছু সুবিধা পেলেও বহুবিবাহ, উত্তরাধিকার, বিবাহবিচ্ছেদ ও সন্তানের অভিভাবকত্বে তারা সমানাধিকার থেকে বঞ্চিত।”
১৯৪০ সালেই তিনি আশা প্রকাশ করেছিলেন এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের, “আমরা সেই নিকট ভবিষ্যৎ কল্পনা করি, যখন নারী-পুরুষ সমতার নীতি একটি আধুনিক ভারতীয় আইনে সম্পূর্ণভাবে স্বীকৃত হবে। তুরস্ক ইতিমধ্যেই আধুনিক আইন গ্রহণ করেছে, ইরাকেও সংস্কার হয়েছে, শিক্ষার মাধ্যমে ভারতের মুসলিম সমাজও সেই পথ অনুসরণ করতে পারে।”
বেগম শরীফা তৈয়বজি ছিলেন সেই বিরল কণ্ঠ, যিনি স্বাধীনতার লড়াইয়ের সঙ্গে ঘরের ভেতরের শৃঙ্খল ভাঙার প্রশ্নটিকেও সমান জোরে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর কথায় আজও প্রতিধ্বনিত হয় এক অদম্য সাহস ও সময়ের অনেক আগেই উচ্চারিত ভবিষ্যতের স্বপ্ন।