নদী রক্ষাই জীবনের ব্রত, গঙ্গার প্রহরী লাল মহম্মদ

Story by  atv | Posted by  Aparna Das • 14 h ago
নদী রক্ষাই জীবনের ব্রত, গঙ্গার প্রহরী লাল মহম্মদ
নদী রক্ষাই জীবনের ব্রত, গঙ্গার প্রহরী লাল মহম্মদ
 
মালিক আসগর হাশমি

উত্তর প্রদেশের কানপুর থেকে উঠে এসেছে মানবতা, সম্প্রীতি ও পরিবেশ রক্ষার এক অনন্য কাহিনি। এমন এক সময়ে, যখন সমাজে ঘৃণা ও সাম্প্রদায়িকতার আবহ ক্রমশ জোরদার হচ্ছে, তখন গঙ্গার রক্ষক হিসেবে পরিচিত লাল মহম্মদ বাদশাহ নিজের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মা গঙ্গার নিঃস্বার্থ সেবার জন্য তিনি একটি ভালো সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনি পায়ে স্যান্ডেল পরাও ত্যাগ করেছেন এবং গঙ্গা নদীর পরিচ্ছন্নতা ও সুরক্ষার কাজে কোনো বাধা না আসে, সেই লক্ষ্যেই আজীবন অবিবাহিত থাকার কঠিন ও অটল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।
 
লাল মহম্মদ বাদশাহ গত পঁয়ত্রিশ বছর ধরে কানপুরের নিকটবর্তী ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় শহর বিঠূরে দিনরাত মা গঙ্গার সেবা করে আসছেন। যে সময়ে মানুষ ধর্মের নামে ক্রমশ দূরত্ব বাড়িয়ে তুলছে, সেই সময়ে লাল মহম্মদ ধর্মের রক্ষণশীল দেয়াল ভেঙে পরিবেশ সংরক্ষণ ও পারস্পরিক সম্প্রীতির এমন এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন, যার প্রতিধ্বনি এখন সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে দেশের প্রান্তে প্রান্তে শোনা যাচ্ছে।
 
লাল মহম্মদ
 
ধর্মীয় ও পৌরাণিক ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে বিঠূরের একটি বিশেষ ও পবিত্র গুরুত্ব রয়েছে। সনাতন বিশ্বাস অনুযায়ী, ভগবান শ্রীরামের পুত্র লব ও কুশের জন্ম এই পবিত্র ভূমিতেই হয়েছিল। আদিকবি মহর্ষি বাল্মীকিও তাঁর অমর গ্রন্থ ‘রামায়ণ’ এই স্থানেই রচনা করেছিলেন। আজও বিঠূরে মাতা সীতার রান্নাঘর অবস্থিত, যা দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে পর্যটকদের ভিড় জমে। গঙ্গা নদীর বাহান্নটি ঘাটে ঘেরা এই অত্যন্ত পবিত্র অঞ্চলটিতে সারা বছরই ভক্তদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। এই পবিত্র ভূমিকেই লাল মহম্মদ বাদশাহ নিজের ভক্তি ও কর্মের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তুলেছেন।
 
নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে লাল মহম্মদ ‘আওয়াজ - দ্য ভয়েস’-কে জানান, “আগে তিনি একটি সরকারি সার কারখানায় ভালো চাকরি করতেন। তাঁর জীবন ছিল সম্পূর্ণ নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময়। কিন্তু তাঁর হৃদয়ে মা গঙ্গার প্রতি এমন গভীর টান ও শ্রদ্ধা জন্ম নেয় যে তিনি সেই সরকারি চাকরিটি চিরদিনের জন্য ছেড়ে দেন।” চাকরি ছাড়ার পর তিনি নিজের সমগ্র জীবন গঙ্গা নদীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সুরক্ষার কাজে উৎসর্গ করে দেন।
 
গঙ্গার পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থা আরও উন্নত করার উদ্দেশ্যে লাল মহম্মদ বাদশাহ ৮-১০ জন স্থানীয় সহযোগীকে নিয়ে ‘গঙ্গা সুরক্ষা দল’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন। তাঁর কথায়, প্রতি রবিবার তাঁর নেতৃত্বে গঙ্গার বিভিন্ন ঘাটে একটি বিশেষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হয়। তাঁদের এই নিঃস্বার্থ উদ্যোগের প্রভাব এতটাই ব্যাপক যে পাশের জেলা উন্নাও থেকেও বহু মানুষ প্রতি রবিবার বিঠূরে এসে স্বেচ্ছায় এই কাজে অংশ নেন।
 
লাল মহম্মদ ও তাঁর দলের কাজ শুধু নদী থেকে প্লাস্টিক ও আবর্জনা সরানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁরা বিঠূরের সমস্ত বাহান্নটি ঘাটেই মাছের সুরক্ষার দায়িত্বও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন। অবৈধভাবে মাছ শিকারকারীদের ওপর তাঁরা কড়া নজর রাখেন এবং নদীর জলজ প্রাণীদের রক্ষা করেন। এই পুরো অভিযানের সবচেয়ে বড় ও বিশেষ বিষয় হলো, লাল মহম্মদ বাদশাহ বা তাঁর সংস্থা এর জন্য কোনো ব্যক্তি বা সরকারি দপ্তরের কাছ থেকে এক টাকাও অনুদান নেয় না। তাঁরা সম্পূর্ণ আত্মনির্ভরশীল থেকে নিজেদের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই এই পবিত্র কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
 

পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সি লাল মহম্মদ বাদশাহ নিজের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে সম্পূর্ণ অটল। তিনি সবসময় মাথায় ঐতিহ্যবাহী মুসলিম টুপি পরেন এবং মুখে লম্বা দাড়ি রাখেন। তিনি একজন প্রকৃত ও নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া মুসলমান। আগে তিনি কাছাকাছি একটি মসজিদে থাকতেন, তবে এখন নিজের জন্য একটি আলাদা আশ্রয়স্থল তৈরি করেছেন। সরকারি চাকরি ছাড়ার পর এখন তাঁর জীবন ও জীবিকার একমাত্র ভরসা একটি ছোট নৌকা।
 
পর্যটকদের সুবিধার জন্য তিনি নৌকাটিতে গদি ও বসার ব্যবস্থা করেছেন। বিঠূরে আসা পর্যটকদের তিনি এই নৌকায় করে গঙ্গার বুকে ভ্রমণ করান। এই নৌবিহার থেকে পাওয়া সামান্য উপার্জন দিয়েই তিনি নিজের জীবনযাপন করেন এবং এই অভিযানের খরচও বহন করেন। লাল মহম্মদের আরেকটি মজার অভ্যাস হলো, তিনি যখনই কোনো পরিচিত বা অপরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা করেন, তখনই ‘গঙ্গা মাইয়া কি জয়’ বলে সম্ভাষণ জানান।
 
সাধারণত হিন্দুধর্মে গঙ্গা নদীকে অত্যন্ত পবিত্র ও পূজনীয় মাতৃরূপে দেখা হয়, অন্যদিকে সাধারণ মুসলিম সমাজে একে কেবল একটি নদী হিসেবেই গণ্য করা হয়। যখন লাল মহম্মদ গঙ্গাকে রক্ষা করার সংকল্প নিয়েছিলেন, তখন তাঁর নিজের সমাজের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি অত্যন্ত শান্ত ও পরিণত সুরে বলেন, “এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা ও আন্তরিক সংযোগের বিষয়। গঙ্গার সঙ্গে আমার একটি আত্মিক ও আধ্যাত্মিক সম্পর্ক রয়েছে।”
 
তিনি খোলাখুলিভাবে বলেন, “প্রথম দিকে আমার এলাকার মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতিক্রিয়া আমার এই কাজের প্রতি মোটেও ইতিবাচক ছিল না। মানুষ আমাকে নিয়ে নানা ধরনের ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত এবং প্রশ্ন তুলত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যখন মানুষ আমার নিঃস্বার্থ সেবা, সততা ও সমর্পণ দেখল, তখন সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে গেল। আজ বিঠূরের প্রতিটি শিশুও আমাকে অত্যন্ত সম্মান ও স্নেহের চোখে দেখে।”
 
গত আট-দশ বছরে, যখন থেকে দেশে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব বেড়েছে, তখন থেকেই লাল মহম্মদ বাদশাহর কাহিনি ইন্টারনেটে দ্রুত ভাইরাল হয়ে উঠেছে। তাঁর এই অনন্য ভক্তি ও সেবাভাবকে মানুষ মুক্তকণ্ঠে প্রশংসা করেছে। ফেসবুক ও ইউটিউবে তাঁর ভিডিও দেখে মানুষ বিভিন্ন ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
 
এফ. এস. পরমার নামে একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, “যিনি মা গঙ্গার প্রকৃত সেবক, তিনি সত্যিই বাদশাহদেরও বাদশাহ।” অন্যদিকে মনোজ কুমারের মতে, শরীর জল দিয়ে, মন সত্য দিয়ে, বুদ্ধি জ্ঞান দিয়ে এবং আত্মা ধর্ম দিয়ে পবিত্র হয়। আশীষ শর্মা লিখেছেন, মাতৃভক্তিতেই প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে এবং তা মানুষের আচরণকে সম্পূর্ণ সাত্ত্বিক করে তোলে। রাজেন্দ্র চৌহান তাঁকে হৃদয় ও কর্ম, উভয় দিক থেকেই একজন প্রকৃত বাদশাহ বলে অভিহিত করেছেন।
 
লাল মহম্মদ
 
বকারে রজত নামে একজন ব্যবহারকারী প্রার্থনা জানিয়ে লিখেছেন, “আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘায়ু দান করুন এবং গঙ্গা মাইয়া আপনাকে সর্বদা নিজের কোলে নিরাপদে রাখুন।” পঙ্কজ থাপলিয়ালের মতে, গঙ্গা কোনো ধর্মীয় ইস্যু নয়, বরং এটি প্রতিটি মানুষের জীবনের জন্য এক জীবনদায়িনী নদী। সুনীতা কুমারী লাল মহম্মদকে ইতিহাসের মহান কবি রসখান ও রহিমের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যাঁরা মুসলমান হয়েও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পরম ভক্ত ছিলেন।
 
নিঃসন্দেহে সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু মানুষ তাঁর মুসলিম টুপি ও দাড়ি নিয়েও প্রশ্ন তোলে, কিন্তু লাল মহম্মদ এসব নেতিবাচক মন্তব্যকে একেবারেই গুরুত্ব দেন না। তিনি কোনো ধরনের বৈষম্য না করে প্রত্যেক মানুষকে আপন করে নেন।
 
বিঠূরের স্থানীয় বাসিন্দা ও বাইরে থেকে আসা ভক্তরা লাল মহম্মদকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করেন। তাঁরা স্নেহভরে বলেন, যখনই আপনি বিঠূরে আসবেন, যে কাউকে তাঁর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেই সে আপনাকে সরাসরি তাঁর কাছে পৌঁছে দেবে। বর্তমানে বিঠূরের বিখ্যাত রানি লক্ষ্মী ঘাটই লাল মহম্মদ বাদশাহর স্থায়ী ঠিকানায় পরিণত হয়েছে। তিনি সারাদিন এই ঘাটেই থাকেন এবং তাঁকে দেখতে আসা লোকেরাও সেখানেই উপস্থিত হন।
 
এই ঘাটের পাশেই বাঁধা থাকে তাঁর সেই নৌকাটি, যা তাঁর জীবনের প্রধান অবলম্বন। এই নৌকার সাহায্যেই তিনি গঙ্গার ঢেউয়ের ওপর ভেসে ভেসে প্রতিদিন নদীটিকে পরিষ্কার রাখার নিজের পবিত্র সংকল্প পূরণ করে চলেছেন।
 
লাল মহম্মদ বাদশাহর এই জীবনগাথা আমাদের এক সুন্দর বার্তা দেয় যে প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং মানবতার প্রকৃত সেবা কোনো জাতি বা ধর্মের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি প্রত্যেক প্রকৃত মানুষের সর্বপ্রথম ও পরম কর্তব্য। সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা সমগ্র মানবজাতির জন্য এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।