কর্ণেল সোফিয়া কুরেশি, উইং কমান্ডার ভ্যোমিকা সিং এবং পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রী সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথোপকথনের মুহুর্তে
নয়াদিল্লি
একটি জাতির প্রকৃত অগ্রগতি কেবল সংখ্যার হিসাব, জিডিপির রেখাচিত্র বা বার্ষিক বৃদ্ধির হারেই নির্ধারিত হয় না। দেশের আসল শক্তি নিহিত থাকে তার মানুষের স্বপ্নে, তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষায় এবং ভবিষ্যৎ গড়ার সাহসে। যে জাতি তার মেধাবী ও পরিশ্রমী নাগরিকদের বিশ্বমঞ্চে উঠে আসার সুযোগ দেয়, তাদের কণ্ঠকে বিশ্ব দরবারে শোনাতে পারে, সেই জাতিই ইতিহাসে নিজের স্থান করে নেয়।
ভারতের এমনই সাতজন ব্যক্তিত্বের কথা তুলে ধরা হলো, যাঁরা নিজেদের ক্ষেত্রে সমস্ত বাধা ভেঙে ভারতীয়দের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছেন:
কর্ণেল সোফিয়া কুরেশি, উইং কমান্ডার ভ্যোমিকা সিং এবং পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রী সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথোপকথনের মুহুর্তে
সোফিয়া কুরেশি ও ভ্যোমিকা সিং: সাহস ও ক্ষমতায়নের প্রতীক
‘অপারেশন সিন্দুর’ ভারতের জাতীয় উত্থানের পথে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। পাকিস্তানে অবস্থিত সন্ত্রাসী স্কুল, প্রশিক্ষণ শিবির ও লঞ্চ প্যাডে নিখুঁত সামরিক অভিযানের পাশাপাশি, এই অভিযানের মিডিয়া ব্রিফিং বিশ্বকে ভারতের এক নতুন রূপ দেখিয়েছে। কর্নেল সোফিয়া কুরেশি ও উইং কমান্ডার ভ্যোমিকা সিং, এই দুই নারী অফিসারের শান্ত, দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি নারীর ক্ষমতায়নের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
২০২৫ সালের মে মাসে ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর প্রেস ব্রিফিংয়ে নেতৃত্ব দিয়ে তাঁরা প্রমাণ করেছেন, ভারতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নারীদের নেতৃত্ব কতটা শক্তিশালী ও পরিপক্ব। সিগন্যালস কোরের কর্নেল সোফিয়া কুরেশি বিদেশি সামরিক দল নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতার জন্য পরিচিত, অন্যদিকে হেলিকপ্টার পাইলট উইং কমান্ডার ভ্যোমিকা সিং উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে উদ্ধার অভিযানের জন্য সুপরিচিত। দু’জনেই ভারতীয় সেনাবাহিনীতে পেশাদার উৎকর্ষ ও ‘নারী শক্তি’র প্রতীক।
মহাকাশচারী শুভাংশু শুক্লা
মহাকাশে শুভাংশু শুক্লা: ভারতের নতুন গর্ব
২০২৫ সালের জুন–জুলাই মাসে মহাকাশচারী শুভাংশু শুক্লা ইতিহাস সৃষ্টি করেন। তিনি অ্যাক্সিওম মিশন–৪ (Axe-4)-এর অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (ISS) পৌঁছে প্রথম ভারতীয় হিসেবে নতুন যুগের মহাকাশযাত্রার সূচনা করেন। ভারতীয় বায়ুসেনার এই অফিসার মিশনের পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় অংশ নেন। তাঁর এই অভিযান ভারতের মানব মহাকাশ কর্মসূচি ‘গগনযান’-এর পথে এক বড় পদক্ষেপ।
লখনউ, উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা শুভাংশু শুক্লা একজন সজ্জিত ফাইটার পাইলট। ৪১ বছর পর কোনো ভারতীয়ের মহাকাশযাত্রা দেশের প্রতিটি নাগরিককে গর্বিত করেছে। ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগোর উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরে তাঁর নিরাপদ অবতরণ জাতিকে আবেগে ভরিয়ে দেয়।
যদিও এই মিশনটি হিউস্টন-ভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা অ্যাক্সিওম স্পেস (Axiom Space) পরিচালনা করেছিল, তবুও এর মূল শক্তি ছিল আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। নাসা, ইসরো, ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি ও স্পেসএক্সের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন প্রাক্তন নাসা মহাকাশচারী পেগি হুইটসন। পোল্যান্ডের স্লাওশ উজনানস্কি-ভিসনিয়েভস্কি ও হাঙ্গেরির টিবর কাপুও এই ঐতিহাসিক যাত্রার সঙ্গী ছিলেন।
বানু মুশতাক
বানু মুশতাকের 'বুকার' জয়: সাহিত্যে ভারতের গৌরব
কর্ণাটকের খ্যাতনামা লেখিকা, আইনজীবী ও সমাজকর্মী বানু মুশতাক 'আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার' জিতে ইতিহাস গড়েছেন। তাঁর ছোটগল্প সংকলন হার্ট ল্যাম্প তাঁকে এই সম্মান এনে দেয় এবং তিনিই প্রথম কন্নড় ভাষার লেখক যিনি এই পুরস্কার পেলেন। বইটির অনুবাদ করেছেন দীপা ভাস্তি।
১৯৯০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে লেখা গল্পগুলিতে দক্ষিণ ভারতের মুসলিম নারীদের সংগ্রাম, সমাজের বৈষম্য ও প্রান্তিক মানুষের জীবন উঠে এসেছে। গ্রহণযোগ্যতার মুহূর্তে বানু মুশতাক বলেন, “এই বইয়ের জন্ম হয়েছে এই বিশ্বাস থেকে যে কোনো গল্পই ছোট নয়; মানব অভিজ্ঞতার বুননে প্রতিটি সুতোই পুরোটা বহন করে।”
ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে জাকির খানের স্ট্যান্ড-আপ শো
ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে জাকির খানের ঐতিহাসিক মুহূর্ত
২০২৫ সালের ১৭ আগস্ট নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে সম্পূর্ণ হিন্দিতে একক স্ট্যান্ড-আপ শো করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন জাকির খান। তিনিই প্রথম ভারতীয় কৌতুকশিল্পী যিনি এই আইকনিক মঞ্চে ‘সোল্ড আউট’ শো করেন। ইন্দোরে জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর জন্য এটি যেমন ব্যক্তিগত সাফল্য, তেমনই ভারতীয় কৌতুক ও দক্ষিণ এশীয় প্রতিনিধিত্বের জন্য এক গর্বের মুহূর্ত।
জাকির খানের কমেডি সহজ, মার্জিত ও হৃদয়ছোঁয়া। তিনি শুধু একজন কমেডিয়ানই নন, একজন দক্ষ সংগীতশিল্পীও।
শাহরুখ খান ও দিলজিৎ দোসাঞ্জ মেট গালায়
মেট গালায় শাহরুখ খান ও দিলজিৎ দোসাঞ্জ: ভারতীয় স্টাইলের বিশ্বজয়
২০২৫ সালের মেট গালায় প্রথম ভারতীয় পুরুষ অভিনেতা হিসেবে ইতিহাস গড়লেন শাহরুখ খান ও পাঞ্জাবি গায়ক-অভিনেতা দিলজিৎ দোসাঞ্জ। নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়ামে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন ইভেন্টে ‘কিং খান’ সব্যসাচী মুখার্জির নকশায় কালো রাজকীয় পোশাকে নজর কেড়েছেন।
অন্যদিকে দিলজিৎ দোসাঞ্জ তাঁর পাঞ্জাবি ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরেন। মহারাজা ভূপিন্দর সিং অফ পাতিয়ালার অনুপ্রেরণায় প্রভাবিত তাঁর পোশাক, প্রাবাল গুরুং-এর নকশায় তৈরি, ভারতীয় রাজকীয় ঐতিহ্য ও আধুনিক ফ্যাশনের এক অনন্য সংমিশ্রণ হয়ে ওঠে।
এই সাতজন ব্যক্তিত্ব শুধু নিজেদের ক্ষেত্রে সাফল্যের শিখরে পৌঁছাননি, তাঁরা বিশ্বমঞ্চে ভারতের আত্মবিশ্বাস, বৈচিত্র্য ও সম্ভাবনার উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে উঠেছেন।